নিবন্ধ
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২১ জুন ২০২৩ ২২:০৬ পিএম
আপডেট : ২১ জুন ২০২৩ ২২:০৭ পিএম
জো বাইডেন ও মোদি । ছবি : সংগৃহীত
ওয়াশিংটন এখন মোদির জন্য লাল গালিচা বিছিয়ে দিচ্ছে। ২০০৫ সালে তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল ওয়াশিংটন। মোদির নেতৃত্বাধীন রাজ্য গুজরাটের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন ওই পদক্ষেপ নেয়। এরপর ২০১৪ সালে মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন।
মোদি এখনও এতটাই বিতর্কিত যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের দলের ৭৫ জন সিনেটর এবং হাউস রিপ্রেজেন্টেটিভ তার কাছে আবেদন করেছেন, যাতে মোদির সঙ্গে আলোচনার সময় ভারতে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়টি উত্থাপন করা হয়। এ নিয়ে মঙ্গলবার (২০ জুন) বাইডেনকে ওই চিঠি লেখেন মার্কিন আইনপ্রণেতারা।
প্রকৃতপক্ষে মোদির অধীনে মানবাধিকার এবং গণতন্ত্রের অবক্ষয়ের ইস্যুগুলোকে বাদ ও বাইডেনকে ভণ্ডামির জন্য অভিযুক্ত হতে হবে। যদিও উভয় অভিযোগই
মোদির দাবি অনুযায়ী মিথ্যা। তবে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণ এবং চীনের প্রভাব মোকাবিলায় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ছাড় দিতে বাধ্য হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
মোদিকে সম্মান জানাতে ওয়াশিংটন হিসাব কষছে। এখানে ভারতীয় গণতন্ত্রের পতনের প্রশ্ন নেই। যদিও মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, মোদি ও তার হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টির অধীনে সংখ্যালঘু মুসলিমদের প্রতি বৈষম্য আরও বেড়েছে। সাংবাদিকরা বলছেন, তাদের মুখ বন্ধ করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিরোধী রাজনীতিকরা বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন।
বিরোধী দলের সাবেক নেতা, ভারতের প্রতিষ্ঠাতার উত্তরাধিকারী রাহুল গান্ধীকে ‘মোদি’ নামটিকে অপমান করার জন্য দুই বছরের কারাদণ্ডের সাজার আদেশ দেওয়া হয়। ফলস্বরূপ তাকে সংসদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। পাশাপাশি আগামী বছর নির্বাচনের আগে কার্যকরভাবে রাজনীতি থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। রাহুল বর্তমানে সাজার বিরুদ্ধে আপিল করেছেন।
যদিও ভারতের এই ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দেশটির কাছাকাছি দেশগুলোর চেয়ে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে আছে। সেটাই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বেশি উদ্বেগের বিষয়। গণতন্ত্র পর্যবেক্ষণ সংস্থা ফ্রিডম হাউস ভারতকে ‘আংশিকভাবে স্বাধীন’ হিসেবে মূল্যায়ন করেছে। তবে এটিকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের তকমা দিয়েছে সংস্থাটি। আর ভারতের প্রতিবেশী চীনকে ‘মুক্ত নয়’ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি ফ্রিডম হাউস চীনের শাসনব্যবস্থাকে স্বৈরাচারী শাসন হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা ক্রমাগত দমনমূলক হয়ে উঠেছে। আর উত্তরে রাশিয়াকেও ‘মুক্ত নয়’ বলে মূল্যায়ন করা হয়েছে। ফ্রিডম হাউস রাশিয়াকে স্বৈরাচারী রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেছে যেখানে ক্ষমতা প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের হাতে কেন্দ্রীভূত।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিঙ্কেন সাম্প্রতিক এক বক্তৃতায় বলেছেন, ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বড় ও জটিল দেশ। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার জন্য (যা যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য) উভয় দেশকেই কাজ করতে হবে। তবে তিনি উপসংহারে বলেছিলেন, এই অংশীদারত্বের গতিপথ অস্পষ্ট এবং এটি প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভরা।
মোদির শাসনের আরও অস্বস্তিকর দিকগুলো নিয়ে বাইডেন পুরোপুরি চোখ বন্ধ করে থাকবেন না। কর্মকর্তারা বলছেন, বাইডেন ভারতের মানবাধিকারের রেকর্ড এবং গণতন্ত্রের পিছিয়ে যাওয়ার বিষয়টি উত্থাপন করবেন। তবে সেটা মোটেই জোরালো হবে না। কারণ সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে মানবাধিকার নিয়ে কঠোর হওয়ায় দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের তোয়াক্কা না করে প্রকাশ্যে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়েছে।
দুই নেতার আলোচ্যসূচিতে যোগ হবে ভিন্নমতের আরেকটি বিষয় রাশিয়া। ইউক্রেন সংকটকে ব্যবহার করে রাশিয়ার কাছ থেকে ছাড়ে ব্যাপক হারে তেল কিনেছে ভারত। প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধ শুরু হওয়ার বছর অর্থাৎ ২০২২ সালে ভারত রাশিয়ার তেল কেনা ১০ গুণ বাড়িয়েছিল। বাইডেন রাশিয়া থেকে তেল এবং অস্ত্র কেনার বিষয়েও মোদিকে চাপ দেবেন। তাকে রাশিয়া থেকে এসব কেনাকাটা কমানোর অনুরোধ করবেন।
বাইডেন মূলত ভারতকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কাছে আনার এবং রাশিয়া থেকে দূরে সরানোর চেষ্টা করবেন।
মোদিকে ভারতের অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতা বাড়াতে হবে। কয়েক কোটি মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে এনেছে ভারত, তবে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার প্রতিবেশী চীনের তূলনায় অনেক কম। দেশটিতে বিশ্বের কিছু ধনকুবের থাকলেও ভারত বিশ্বের সবচেয়ে বেশিসংখ্যক দরিদ্র মানুষের আবাসস্থল।
মোদি ও ভারতকে জীবনযাত্রার মান বাড়াতে হবে। তবেই তারা নিজেদের সত্যিকারের সফল বলে গণ্য করতে পারবে। এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক দেশটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এ ছাড়া কেবল যুক্তরাষ্ট্র নয়, প্রতিপক্ষ চীনকে মোকাবিলায় মোদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও শক্তিশালী সামরিক সম্পর্ক চান, সেই প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। বাইডেন প্রশাসন তথাকথিত কোয়াডকে পুনরুজ্জীবিত করেছে। কোয়াড হলো প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরের শক্তিগুলোর ওয়াশিংটন-নেতৃত্বাধীন ব্লক : অস্ট্রেলিয়া, জাপান, ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে, দুই দেশের মধ্যে ইতিহাস তৈরির সম্পর্কের একটি নতুন সূচনা চিহ্নিত করতে পারে– যার সুদূরপ্রসারী ফল রয়েছে।
(লিখেছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক কলামিস্ট ফ্রিদা ঘিটিস। তিনি সিএনএনের একজন সাংবাদিক। সিএনএনে সাপ্তাহিক কলাম লেখেন। এ ছাড়া ওয়াশিংটন পোস্ট ও ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স রিভিউয়েরও একজন সাপ্তাহিক কলামিস্ট)