প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৯ মে ২০২৩ ২১:১৭ পিএম
প্রায় তিন দশক ধরে স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সহযোগিতার একটি সফল উদাহরণে পরিণত হয়েছিল আর্কটিক কাউন্সিল। এর আট সদস্যের মধ্যে রয়েছে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র। তারা এক জোট হয়ে পরিবেশগতভাবে স্পর্শকাতর এ অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তন গবেষণা এবং সামাজিক উন্নয়নে কাজ করেছে।
এখন দৃশ্যপট বদলে গেছে। ইউক্রেন আগ্রাসনের পর রাশিয়ার সঙ্গে কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে কাউন্সিল সদস্যরা। আগামী ১১ মে কাউন্সিলের সভাপতি পদে বসার প্রস্তুতি নিচ্ছে নরওয়ে। বিশেষজ্ঞরা এখন মেরু অঞ্চলের ওই সংস্থার কার্যক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। তারা বলছেন, আর্কটিক উপকূলের অর্ধেকেরও বেশি নিয়ন্ত্রণ করে এমন দেশের (রাশিয়া) সঙ্গে সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক না থাকার কারণে গোটা সংস্থাটির কার্যকারিতাই ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
অকার্যকর একটি আর্কটিক কাউন্সিলের কারণে ওই অঞ্চলের পরিবেশে এবং তাদের ৪০ লাখ বাসিন্দার ওপর প্রতিকূল প্রভাব পড়তে পারে। সেখানকার বাসিন্দারা এরই মধ্যে গলতে থাকা সমুদ্রের বরফের প্রভাবের মুখোমুখি হয়েছে। আর্কটিকের বাইরের দেশগুলোও ওই অঞ্চলের খনিজ সম্পদের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছে।
আর্কটিক কাউন্সিলের আট সদস্য হলোÑ ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, আইসল্যান্ড, সুইডেন, রাশিয়া, ডেনমার্ক, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র। অতীতে তাদের মূল কাজ ছিল পরিবেশগত সুরক্ষা ও সংরক্ষণ। এ ছাড়াও ওই অঞ্চলের আদিবাসীদের কথা বলার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করেছে কাউন্সিলটি। এটি কোনো ধরনের নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে কাজ করে না।
মস্কোর সঙ্গে সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্কের ইতি ঘটার কারণে বর্তমানে কাউন্সিলের হাতে থাকা ১৩০টি প্রকল্পের এক-তৃতীয়াংশ স্থগিত হয়ে গেছে। নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা বা বিদ্যমানগুলোকে পুনর্নবায়ন করা সম্ভব হবে না। পশ্চিম ও রাশিয়ার বিজ্ঞানীরা জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত গবেষণার ফলাফল এখন আর নিজেদের মধ্যে আদান-প্রদান করছেন না। এতে করে সম্ভাব্য অনুসন্ধান এবং উদ্ধার মিশন বা তেল উপচে পড়ার মতো ঘটনার ক্ষেত্রে সহযোগিতার পথ বন্ধ হয়ে গেছে।
মেইনের মার্কিন সিনেটর আঙ্গাস কিং বলেন, ‘এ বিষয়গুলো বিভিন্ন ইস্যুতে আর্কটিক কাউন্সিলের কাজ করার সক্ষমতায় বিঘ্ন ঘটাবে বলে উদ্বিগ্ন আমি।’
বিভক্ত অঞ্চল
বর্তমানে বাকি বিশ্বের তুলনায় প্রায় চার গুণ দ্রুতগতিতে উষ্ণ হচ্ছে আর্কটিক। উধাও হয়ে যাচ্ছে সমুদ্রের বরফ। অঞ্চলটির প্রাকৃতিক সম্পদে ভাগ বসাতে আগ্রহী রপ্তানি এবং অন্যান্য শিল্পের জন্য মেরু অঞ্চলের জলপথ খুলে যাচ্ছে। এসব সম্পদের মধ্যে রয়েছে তেল, গ্যাস, লোহা, সোরা ও বিরল খনিজ।
এসব ক্ষেত্রে দ্রুত যে পদক্ষেপগুলো নেওয়া প্রয়োজন তা রাশিয়া এবং আর্কটিকের অন্যান্য সদস্যের মধ্যে বিতণ্ডার কারণে সম্ভব হচ্ছে না। হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের আর্কটিক ইনিশিয়েটিভের সহপরিচালক জন হলড্রেন বলেন, নরওয়ের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আর তা হলো রাশিয়ার অনুপস্থিতিতে আর্কটিক কাউন্সিলের ভালো কাজগুলোকে যতটা সম্ভব, কীভাবে উদ্ধার করা যায়।’
রাশিয়ার দাবি, এটি তাদের ছাড়া সম্ভব নয়। রুশ আর্কটিক অ্যাম্বাসেডর নিকোলে করচুনভ জানান, কাউন্সিল দুর্বল হয়ে পড়ছে। এ ক্ষেত্রে রাশিয়া যে নিজস্ব পথ বেছে নিতে পারে, সে ব্যাপারেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
চলতি বছরের ২৪ এপ্রিল রাশিয়া আর্কটিক প্রশ্নে চীনের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। আর এর আগ দিয়ে ১৪ এপ্রিল চীন, ভারত, ব্রাজিল এবং দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিজেদের আর্কটিক স্থাপনার মাধ্যমে গবেষণার আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এ প্রসঙ্গে হোয়াইট হাউসের আর্কটিক স্টিয়ারিং কমিটির নির্বাহী পরিচালক ডেভিড বাল্টন বলেন, রাশিয়া আর্কটিকের বাইরের কিছু দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে চাইছে এবং এ বিষয়টি উদ্বেগের।’
এদিকে নরওয়ে জানিয়েছে, রাশিয়ার কাছ থেকে সভাপতিত্ব সরিয়ে তাদের দেওয়ার পথটি মসৃণ হবে বলে আশাবাদী তারা। বিশ্লেষকরাও মনে করছেন, নরওয়ে ভবিষ্যতে ফের রাশিয়াকে দলে টানতে ভূমিকা রাখতে পারবে। ড্যানিশ পার্লামেন্টে গ্রিনল্যান্ডের আইন প্রণেতা আজা শেমনিৎজ লারসেন বলেন, ‘ভবিষ্যতে আমি রাশিয়াকে ছাড়া আর্কটিক কাউন্সিল দেখি না। আমাদের ভিন্ন একটি সময়ের প্রস্তুতি নিতে হবে, যে সময়টিতে যুদ্ধ (ইউক্রেন যুদ্ধ) একদিন থেমে যাবে।’
সূত্র : রয়টার্স