প্রবা ডেস্ক
প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৬:২৮ পিএম
আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৭:৫১ পিএম
২০২০ সালে যুদ্ধে জড়ায় আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান। ফাইল ফটো
আবারও বড় ধরনের সীমান্ত সংঘর্ষে জড়িয়েছে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান। সীমান্ত নিয়ে ২০২০ সালের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর চিরবৈরী দুই দেশের মধ্যে এটিই সর্বশেষ সংঘাত। ওই যুদ্ধে আজারবাইজানের বহু সেনা নিহত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
তবে নতুন করে সংঘর্ষের জন্য উভয়পক্ষই পরস্পরকে দায়ী করছে বলে জানায় কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা।
আর্মেনিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আজারবাইজানের স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাত ১২টা ৫ মিনিটে গোরিস, সোক ও জেরমুক শহরে আর্মেনিয়ার সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে ‘ব্যাপকমাত্রায় গোলাবর্ষণ’ শুরু করে। এ সময় বাকু ড্রোনের পাশাপাশি কামান ও ভারী অস্ত্রেরও ব্যবহার করে। এর প্রতিক্রিয়াতেই ইরেভান জবাব দিয়েছে বলে জানানো হয় বিবৃতিতে।
অন্যদিকে আজারবাইজানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আর্মেনিয়াকে দাশকেসান, কেলবাজার ও লাচিন জেলার সীমান্তের কাছে ‘বড় ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড’ পরিচালনার জন্য অভিযুক্ত করেছে।
আজারবাইজানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, এসব অঞ্চলে তাদের সেনা ঘাঁটিতে মর্টারের হামলা হয়েছে। এতে তাদের সেনারা হতাহতের শিকার হয়েছেন। তবে সংখ্যাটি নির্দিষ্ট করে জানানো হয়নি।
আজারবাইজানের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ থামাতে সোমবার দুই দেশ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। তবে এর কিছুক্ষণ পরেই তা ভেস্তে চলে যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, স্থানীয় সময় সোমবার সকাল ৯টায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হলেও তা বেশি সময় স্থায়ী হয়নি।
এ দুই বিবদমান অঞ্চলের মধ্যে প্রধান মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্র রাশিয়া। মস্কো নেতৃত্বাধীন যৌথ নিরাপত্তা চুক্তি সংস্থার সদস্য আর্মেনিয়া সে সূত্রে দেশটি রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্রও বটে।
অন্যদিকে, সংঘর্ষের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
এ বিষয়ে সোমবার এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন বলেন, আমরা আগেই স্পষ্ট করেছি যে এ সংকটের কোনো সামরিক সমাধান হতে পারে না। তাই আমরা অবিলম্বে সব ধরনের সামরিক শত্রুতা বন্ধ করার আহ্বান জানাচ্ছি।
আজারবাইজানের কৌশলগত মিত্র তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু বলেন, অবিলম্বে আর্মেনিয়ার উসকানি দেওয়া বন্ধ করা উচিত। এর পরিবর্তে আজারবাইজানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা ও সহযোগিতার দিকে মনোনিবেশ করা উচিত।
মঙ্গলবারের সংঘর্ষের পর উভয়পক্ষকেই সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্ব নেতারা
এর আগে বিতর্কিত নাগোর্নো-কারাবাখ অঞ্চল দখলে নেওয়ার জন্য ২০২০ সালে যুদ্ধে লিপ্ত হয় এ দুই দেশ। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকে আর্মেনিয়া-আজারবাইজান সীমান্তে প্রায়ই সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়।
গত সপ্তাহেই আজারবাইজানের সীমান্ত হামলায় আর্মেনিয়ার এক সেনা নিহত হয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
আগস্টে আজারবাইজান জানায়, ইরেভানের সেনাদের আক্রমণে তাদের একজন সেনা নিহত হয়েছেন। একই সময়ে কারাবাখ সেনাবাহিনী জানায়, তাদের দুই সেনা নিহত হয়েছেন এবং এক ডজনেরও বেশি আহত হয়েছেন।
আজারবাইজানে অবস্থিত আর্মেনিয়ার জনবহুল ছিটমহল নাগোর্নো-কারাবাখ অঞ্চল নিয়ে এ দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র দুটি যুদ্ধে জড়িয়েছে। ১৯৮০ সালের শেষদিকে প্রথম সংঘর্ষ শুরু হয়। যখন উভয় দেশই সোভিয়েত শাসনের অধীনে ছিল। তখন আর্মেনিয়ার সেনারা নাগোর্নো-কারাবাখের নিকটবর্তী অঞ্চলের কিছু অংশ দখলে নিয়ে নেয়।
তবে এ অঞ্চলটি আন্তর্জাতিকভাবে আজারবাইজানের ভূখণ্ড হিসেবে স্বীকৃত, কিন্তু এখানে বাস করে বিপুলসংখ্যক আর্মেনীয় জনগণ। প্রথমবারের ওই যুদ্ধে প্রায় ৩০ হাজার লোক নিহত হন।
২০২০ সালে দ্বিতীয়বারের যুদ্ধে আজারবাইজান সেই অঞ্চলগুলো আবারও নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়। রাশিয়ার মধ্যস্থতায় শেষ হয় ছয় সপ্তাহব্যাপী ওই যুদ্ধ। এতে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার মানুষ প্রাণ হারায়।
এরপর এ অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি চুক্তি সম্পাদনের জন্য উভয় দেশের নেতারা বেশ কয়েকবার বৈঠক করেছেন।
এপ্রিল ও মে মাসে ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যস্থতায় দুই দেশের নেতাদের আলোচনা হয়। এতে আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ এবং আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান ভবিষ্যতের শান্তি চুক্তির বিষয়ে ‘আগাম আলোচনা’ করতে সম্মত হন।
আর্মেনিয়া সরকারের তথ্য মতে, প্রধানমন্ত্রী পাশিনিয়ান মঙ্গলবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং ইইউর প্রেসিডেন্ট চার্লস মিশেলের সঙ্গে সর্বশেষ সংঘর্ষের বিষয়ে পৃথকভাবে ফোনালাপ করেছেন।
মিশেল বলেন, উত্তেজনা আরও ছড়িয়ে পড়ার আগে তা রোধে পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত ইইউ। এ অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এ ঘটনাকে প্রধানমন্ত্রী পাশিনিয়ান আজারবাইজানের সশস্ত্র বাহিনীর ‘উসকানিমূলক, আক্রমণাত্মক কর্মকাণ্ডের’ বলে উল্লেখ করে এর নিন্দা জানান। তিনি এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে যথাযথ প্রতিক্রিয়া জানানোর আহ্বান করেন।
প্রবা/এনএস/এমজে