প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১০ এপ্রিল ২০২৩ ২৩:২২ পিএম
আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০২৩ ১১:৩৫ এএম
নোয়াম চমস্কি। ছবি : সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের বিশিষ্ট দার্শনিক, ভাষাতাত্ত্বিক ও বুদ্ধিজীবী নোয়াম চমস্কি আলজাজিরাকে সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। এতে তিনি মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক হামলা, ফিলিস্তিন-ইসরায়েল ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্রের বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ এবং জনপরিসরে ইসরায়েলের প্রতি জনগণের মনোভাব কীভাবে বদলেছে, তা নিয়ে কথা বলেছেন। দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটির দ্বিতীয় ও শেষার্ধের মূলকথা এখানে তুলে ধরা হলো।
আলজাজিরা : আপনি ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্টের সমালোচনা করে একবার বলেছিলেন ইসরায়েলকে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট শুধু ইহুদিদের সার্বভৌম রাষ্ট্র মনে করে। সব নাগরিকের রাষ্ট্র মনে করে না। অথচ ইসরায়েলে ইহুদি ছাড়াও অন্য ধর্মের মানুষ রয়েছে।
আরেকবার ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্টের প্রশংসাও করেছিলেন আপনি। কারণ ২০০০ সালে পশ্চিম তীরের কাৎসিরে ইহুদি বসতি নির্মাণের জন্য ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদকে অবৈধ ঘোষণা করেছিলেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। বর্তমানে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট নিয়ে আপনার সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গি কেমন?
চমস্কি : ইহুদিদের নিয়ে ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্টের আচরণ যথেষ্ট ভালো। কিন্তু ইসরায়েলে বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে তেমনটি নয়।
স্বয়ং ইহুদিদের বিষয়েও সুপ্রিম কোর্টের আচরণ নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। নিজেদের সুপ্রিম কোর্ট নিয়ে ইসরায়েলের আইন বিষয়ক সাংবাদিক মোশে নেগবির প্রধান সমালোচনা, প্রতিষ্ঠানটিতে দুর্নীতি হয়।
আমার চোখে ইসরায়েলি সুপ্রিম কোর্টের বড় দুর্বল দিক, তারা ফিলিস্তিনিদের জায়গায় বসতি নির্মাণের কোনো সমালোচনা করেন না। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য সব আন্তর্জাতিক আদালতই ইসরায়েলের বসতি নির্মাণকে অন্যায় মনে করেন। অথচ ইসরায়েল সরকারের অবৈধ বসতি নির্মাণকে নিয়মিতভাবে বৈধতা দিয়ে যাচ্ছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট।
হ্যাঁ, তারা বসতি নির্মাণ কাজ মাঝেমধ্যে স্থগিত রাখে। কিন্তু সাধারণভাবে বলতে গেলে বসতি নির্মাণ নিয়ে ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্টের রেকর্ড বেশ ভয়ংকর। দেশটির এই আদালতের ইতিহাসকে ইতিবাচক ও নেতিবাচকভাবে বিভক্ত বলা চলে।
আলজাজিরা : ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকট সমাধানে দ্বিরাষ্ট্রের পক্ষে আপনার সমর্থন রয়েছে। এখনও কি তাই মনে করেন?
চমস্কি : শোনেন, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান কীভাবে হতে পারে, তা নিয়ে এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ আলাপ হাজির হয়েছে। দ্বিরাষ্ট্র ও একরাষ্ট্র তত্ত্বের বাইরে গিয়ে এখন বৃহত্তর ইসরায়েল নামের একটি ধারণার কথা জোরেশোরে শোনা যাচ্ছে। এটা কিন্তু নতুন কিছু নয়। তলে তলে এটা ১৯৬৯ সালে শুরু হয়। এটার সার কথা- যে স্থানটাই ইসরায়েলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হবে, তা ধীরে ধীরে ফিলিস্তিনিশূন্য করা হবে।
তবে হ্যাঁ, গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও নাবলুসের মতো যেসব শহরে অনেক বেশি ফিলিস্তিনি থাকেন, তাদের হয়তো টার্গেট করা হবে না। কারণ নাবলুসের মতো শহরকে বৃহত্তর ইসরায়েলে নেওয়া হলে অন্তত সেই শহরে ইহুদিরা সংখ্যালঘু হয়ে পড়বে। আর ইসরায়েল এটা কখনও সহ্য করবে না।
আগে প্রান্তে করা হলেও ১৯৯০ সাল থেকে পশ্চিম তীরের অনেক গভীরে বসতি নির্মাণ করছে ইসরায়েল। পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতি মালে আদুমিমের অধিকাংশ ১৯৯০ সালেই তৈরি করা হয়েছে। সেখানে সরকারি অর্থায়নে এমন সব বিলাসী ও নিরাপদ ভিলা তৈরি করা হয়েছে, যা সাধারণের কল্পনার বাইরে।
মালে আদুমিম থেকে কোনো ইহুদি রাস্তায় কোনো ফিলিস্তিনিকে দেখা ছাড়াই তেল-আবিবে পৌঁছতে পারবেন। এর অর্থ হলো, এমনভাবে বসতিটা নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে আসা-যাওয়ার পথে কোনো ফিলিস্তিনিকে চোখে না পড়ে। মানে পুরো বসতিটা ফিলিস্তিনিশূন্য করা হয়েছে।অথচ একসময় সেখানে অনেক ফিলিস্তিনি পরিবার থাকত। তাদের অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছে।
আসলে ফিলিস্তিনের যেসব অঞ্চল বৃহত্তর ইসরায়েলে নেওয়া হবে, সেগুলো নিয়ে বিশেষ পরিকল্পনা অনেক আগেই করা হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মিল থাকলেও একেকটা অঞ্চল নিয়ে আবার আলাদা পরিকল্পনাও রয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে পশ্চিম তীর ও জেরুসালেমের কথা বলা যায়। পশ্চিত তীরে যতটা নির্মম ও সহিংসভাবে বসতি নির্মাণ করা হয়েছে, জেরুসালেমে তেমনভাবে হয়নি। এখানে অনেক ধীরে , ধাপে ধাপে হয়েছে এবং হচ্ছে। তবে কিছুটা হলেও আশার কথা হলো, বৃহত্তর ইসরায়েলের পেছনে আন্তর্জাতিক কোনো সমর্থন নেই। এখনও পর্যন্ত দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের প্রতিই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় সমর্থন রয়েছে।
কিন্তু ইসরায়েল ফিলিস্তিনে এত বিশাল বিশাল বসতি নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়িত করেছে যে, দ্বিরাষ্ট্র কীভাবে সম্ভব হবে তা বলা বেশ শক্ত। দিনে দিনে তা আরও কঠিন হচ্ছে। এজন্যই মধ্যপ্রাচ্যের আধুনিক ইতিহাস বিষয়ক মার্কিন অধ্যাপক ইয়ান লাস্টিকের মতো পণ্ডিতেরা একরাষ্ট্র ধারণায় জোর দিচ্ছেন। কিন্তু এটাও বেশ গোলমেলে। ধরুন ফিলিস্তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রে ইহুদিদের সংখ্যালঘু হয়ে থাকতে হবে। এটা কি সম্ভব? এটা ভাবাই যায় না।
৫০ বছরের ইতিহাস আমলে নিলে বৃহত্তর ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার ধারণাটি আপনার কাছে পরিষ্কার হবে। ১৯৭০ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলে দ্বিরাষ্ট্র সমাধান নিয়ে বিতর্ক হয়। এটা নিয়ে একটি প্রস্তাবও পাস হয়। ইসরায়েল ওই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে।
আলজাজিরা : পোলিশ-আমেরিকান ইহুদি রাব্বি (ধর্মগুরু) আব্রাহাম জোশুয়া হেশেল নবীর (পয়গম্বর) সংজ্ঞায়িত করেছেন একজন যন্ত্রণাকাতর ব্যক্তি হিসেবে, তার আত্মা ও জীবন যা বলে সেটা তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং এর জন্য তিনি অন্তহীন যন্ত্রণায় ভোগেন। তবে মানুষের নীরব দীর্ঘনিঃশ্বাস সম্পর্কেও তিনি যথেষ্ট ওয়াকিবহাল।
ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল নিয়ে যেহেতু আপনার মতের কিছুটা বৈপরীত্য রয়েছে, তাই আপনিও নিজেকে নবী গোত্রীয় মনে করেন কি?
চমস্কি : না, কেন আমি নবী হতে যাব। এই শব্দটির উৎপত্তি সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু জানা যায় না। তবে বর্তমানে যাদের বিদ্রোহী বুদ্ধিজীবী বলা হয় তাদের সঙ্গে আগে যাদের নবী বলা হতো তাদের বেশ মিল রয়েছে। ক্ষমতাসীনরা নবীদের সমাজ বা রাষ্ট্রচ্যুত করে মরুভূমিতে বিতাড়িত করত।
আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে নবী শব্দ দিয়ে যা বোঝাত তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে। বর্তমান বিদ্রোহী বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে নবী চরিত্রের কিছু মিল থাকলেও এখন আমরা সম্পূর্ণ একটা নতুন বিশ্বে বসবাস করি।
আলজাজিরা : আচ্ছা, আপনার বাড়িতে ইসরায়েল বা ফিলিস্তিনের কোনো দৃষ্টিগ্রাহ্য স্মারক আছে কি? থাকলে আপনার কাছে তার অর্থ কী?
চমস্কি : আমার কাছে একটি দৃষ্টিগ্রাহ্য স্মারক আছে। ১৯৮৭ সালে ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ফিলিস্তিনিদের গণজাগরণ বা ইনতিফাদার সময় আমি পশ্চিম তীরের কালান্দিয়া শরণার্থী শিবিরে ছিলাম। তখন সেখানে কারফিউ জারি করেছিল ইসরায়েল। কিছু ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে পেছনের রাস্তা দিয়ে কারফিউ অমান্য করে আমি কালান্দিয়া শরণার্থী শিবিরে পৌঁছাই। সেখানে ঘরে আবদ্ধ ও আটকা মানুষদের সঙ্গে কথা বলি।এমন সময় একটা ক্যানেস্টারের দিকে আমার চোখ যায়। তা আমি কুড়িয়ে নিই। আমার ধারণা এটা একটা কাঁদুনে গ্যাসের ক্যানেস্টার। হামলার সময় ইসরায়েলি সেনারা এটা ফেলে গেছে। এটা আমার কাছে কঠোরতা, নৃশংসতা ও দমনের প্রতীক।
ইসরায়েল অধিকৃত ফিলিস্তিনি অঞ্চলগুলোয় আজ থেকে ৫০ বছর আগে যে মাত্রায় নিপীড়ন চলত, এখন তা অনেক গুণ বেড়েছে। প্রতিদিনই ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েল সরকারের নানান ধরনের নিপীড়নের শিকার হচ্ছে।
অবরুদ্ধ গাজাকে আপনি কী বলবেন? উপত্যকাটিতে ২০ লাখের বেশি মানুষ থাকে। তাদের খাদ্য, পানীয় কোনো কিছুই পর্যাপ্ত নয়। কিন্তু তারা ওই উপত্যকার বাইরে যেতে পারে না। এটাকে কারাগার ছাড়া আর কী বলা যায়! আধুনিক ইতিহাসে এ ধরনের অপরাধ খুব কম আছে।
সিরিয়ার কাছ থেকে দখল করে নেওয়া গোলান মালভূমির কথাই ধরুন। এটাকে বিশ্বের প্রায় কোনো দেশই ইসরায়েলের বলে স্বীকার করে না। এটা নিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলের নিষেধাজ্ঞাও ছিল। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন তা উল্টে দিয়েছে।
সূত্র : আলজাজিরা