প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৩ এপ্রিল ২০২৩ ১০:৩৫ এএম
পানির নিচে পর্যাপ্ত অক্সিজেন না পেয়ে মারা যাচ্ছে জলজ প্রাণীরা। ছবি : সংগৃহীত
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে একের পর এক বিপুল পরিমাণ জলজ প্রাণীর মরদেহ ভেসে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংকটের মধ্যে এমন ঘটনা চিন্তায় ফেলে দিয়েছে বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদদের। তারা বলছেন, জলজ প্রাণীদের গণমৃত্যুর পেছনে বৈশ্বিক উষ্ণতা অনেকটা দায়ী।
তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও মানুষের অন্যান্য কর্মকাণ্ডে সমুদ্রের উপরিভাগে ক্ষতিকর শৈবালের পরিমাণ বাড়ছে। এটি হার্মফুল অ্যালগাল ব্লুম নামে পরিচিত। এর কারণে পানির নিচে পর্যাপ্ত অক্সিজেন না পেয়ে মারা যাচ্ছে জলজ প্রাণীরা। এ ছাড়া প্লাস্টিক দূষণ ও সমুদ্রে চলা বাণিজ্যিক জাহাজের কারণে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্তন্যপায়ী সামুদ্রিক প্রাণীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার সমুদ্রে হঠাৎ করেই ক্ষতিকর সামুদ্রিক শৈবালের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে। এসব শৈবালের কারণে উত্তর-পূর্ব ফ্লোরিডার উপকূলে বিপুল পরিমাণ মরা মাছ ভেসে আসছে। গত বছরের গ্রীষ্মেও একই কারণে সান ফ্রান্সিসকোর সমুদ্রে বিপুল পরিমাণ মাছ মারা যায়।
সামুদ্রিক বাতাসের কারণে সমুদ্রের গভীরের পুষ্টিসমৃদ্ধ পানি ওপরে উঠে এলে অ্যালগাল ব্লুম ঘটে। এটি এমন বিষ তৈরি করে, যা সামুদ্রিক মাছ ও পাখিকে মেরে ফেলে। এর কারণে মানুষও অসুস্থ হয়ে যেতে পারে। এসব শৈবালের কারণে পানির নিচের জলজ গাছপালা সূর্যের আলো থেকে বঞ্চিত হয়। এতে সামুদ্রিক মাছ অক্সিজেনের অভাবে পড়ে মারা যায়।
এ ছাড়া প্লাস্টিকদূষণের কারণে বিপুল পরিমাণ সামুদ্রিক প্রাণী মারা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ৮০ লাখ টন টন প্লাস্টিক সমুদ্রে প্রবেশ করছে। এর মধ্যে পরিত্যক্ত মাছ ধরা সরঞ্জাম রয়েছে ৬ লাখ ৪০ হাজার টন। এসব জালে জড়িয়ে মারা যাচ্ছে অনেক প্রাণী। পাশাপাশি প্লাস্টিক খেয়ে ও প্লাস্টিক ব্যাগের মধ্যে আটকা পড়েও মৃত্যু হচ্ছে সামুদ্রিক প্রাণীদের। বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর এক লাখ সামুদ্রিক প্রাণীর মৃত্যু ঘটছে প্লাস্টিক খাওয়ার কারণে অথবা প্লাস্টিকে পেঁচিয়ে।
দ্য এনভায়রনমেন্টাল প্রটেকশন এজেন্সির (ইপিএ) মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের গভীরের পানি ওপরে উঠে আসার ঘটনা বাড়বে। এতে পশ্চিমের উপকূলজুড়ে অ্যালগাল ব্লুমের ঘটনাও বাড়বে। বাড়বে অন্যান্য ক্ষতিকর শৈবালের পরিমাণও। বিষাক্ত নীলচে-সবুজ শৈবাল উষ্ণ পানিতেই বেশি হয়।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়বে ঝড়বৃষ্টি। আর অতিরিক্ত ঝড়বৃষ্টি মাটি থেকে বেশি পরিমাণে পুষ্টি উপাদান সাগরে চলে যাওয়ার কারণেও শৈবালের পরিমাণ বাড়বে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নিউজিল্যান্ডের পূর্ব উপকূলে সামুদ্রিক অর্চিন, স্টারফিশ, ক্রেফিশসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর মরদেহ ভেসে আসে। ধারণা করা হচ্ছে, দক্ষিণ গোলার্ধের গ্রীষ্মকালীন ঝড়ের সময় ক্ষতিকর শৈবাল বাড়ার কারণেই এমনটা ঘটেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়তে থাকা খরার কারণে মিঠাপানিও শৈবালের ঝুঁকিতে রয়েছে। গত কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের মিঠাপানির হ্রদে এমন শৈবালের আক্রমণ বহুবার ঘটেছে। অ্যালগাল ব্লুম মানুষের দ্বারাও হতে পারে। জার্মান গবেষকদের মতে, গত গ্রীষ্মে জার্মানি এবং পোল্যান্ডের সীমানা বরাবর বয়ে চলা ওডার নদীতে একটি বিরল সোনালি শৈবালের কারণে বিপুল পরিমাণ মাছ মারা যায়।
গত বছরের জুনে নিউজিল্যান্ডের উপকূলে শত শত ছোট পেঙ্গুইন মৃত অবস্থায় ভেসে উঠেছিল। তখন স্থানীয় সংরক্ষণ কর্মকর্তারা বলেছিলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পেঙ্গুইনদের আরও গভীর এবং ঠান্ডা জলে চলে যেতে বাধ্য করছে। এতে তাদের বাসস্থান, বংশবৃদ্ধি এবং খাবার খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে গভীর সমুদ্রে শিকারি প্রাণীদের মুখে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সবচেয়ে বিপদে পড়েছে অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় দ্বীপ রাজ্য তাসমানিয়ার কিছু সামুদ্রিক প্রাণী। ক্রমবর্ধমান তাপ থেকে বাঁচতে কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই তাদের। কারণ দক্ষিণে রয়েছে দক্ষিণ গোলার্ধের বরফের পানি।
গবেষকরা দেখতে পেয়েছেন, সাধারণ সামুদ্রিক ড্রাগনের (ফিলোপটেরিক্স টেনিওলাটাস) সংখ্যা গত এক দশকে ৫৭ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে স্টারফিশ ও সামুদ্রিক অর্চিনের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে। গত বছরের একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, আগামী ৩০০ বছরের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সামুদ্রিক প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। কারণ সমুদ্র অতিরিক্ত তাপ শোষণ করছে। এতে করে নিজের বাসস্থানেই জীবন্ত রান্না হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতিতে পড়েছে সামুদ্রিক প্রাণীরা। ছয় দশক আগে সমুদ্রের তাপ রেকর্ড করা শুরু হয়। ২০২১ সালে সমুদ্রগুলো সর্বাধিক তাপ শোষণ করেছে।
এই শীতে বিশ্বের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তিমি এবং ডলফিনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এক ডজনেরও বেশি হাম্পব্যাক তিমি এবং বেশ কয়েকটি ব্যাপকভাবে বিপন্ন উত্তর আটলান্টিকের রাইট তিমি ডিসেম্বর এবং মার্চের শুরুর মধ্যে উত্তর ক্যারোলিনা থেকে নিউইয়র্ক পর্যন্ত সমুদ্রসৈকতে বা কাছাকাছি আটকা পড়েছিল। আটটি ডলফিনও সম্প্রতি নিউ জার্সির উপকূলে ভেসে এসেছে।
নিউ জার্সির কর্মকর্তারা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের তাপমাত্রা এবং পানির রসায়নের পরিবর্তন ঘটছে। এতে তিমিরা যে মাছগুলোকে খায় তারা সৈকতের কাছে চলে আসছে। এতে তাদের খোঁজে আসা তিমিদের জাহাজের সঙ্গে সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়ছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন বলছে, জাহাজের আঘাতের কারণে অনেক তিমির মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া উপকূলের কাছে থাকা বায়ুবিদ্যুতের প্রকল্পও তিমিদের মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
চলতি মাসে অস্ট্রেলিয়ার ডার্লিং-বাকা নদীতে বন্যা ও গরম আবহাওয়ার কারণে হাজার হাজার মাছ মারা গেছে। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা এবং সাম্প্রতিক বন্যার কারণে অক্সিজেনের অভাবের কারণে লাখ লাখ মাছ মারা গেছে। সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের জলজ প্রাণী স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ জয় বেকার এটিকে একটি ‘ব্ল্যাক ওয়াটার ইভেন্ট’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে বন্যার ফলে প্রচুর জৈব উপাদান নদীতে প্রবেশ করেছে। পাশাপাশি তীব্র উষ্ণ বায়ু নদীতে অক্সিজেনের পরিমাণ কমিয়ে ফেলেছিল। কর্মকর্তাদের মতে, উষ্ণ তাপমাত্রায় বেঁচে থাকার জন্য মাছের আরও অক্সিজেন প্রয়োজন। বেকারের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই এমন বন্যা ও বাতাসের উষ্ণ তাপমাত্রার ঘটনা বাড়ছে।
সূত্র : ওয়াশিংটন পোস্ট