প্রবা ডেস্ক
প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২২ ১১:২৭ এএম
আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২২ ১৩:৩৫ পিএম
মিখাইল গর্বাচেভ
সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বশেষ নেতা মিখাইল গর্বাচেভ মারা গেছেন। ৯১ বছর বয়সে স্থানীয় সময় মঙ্গলবার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
‘শান্তিপূর্ণ’ভাবে স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটনানোর জন্য যেমন বিশ্বে এক পক্ষ তথা পশ্চিমাদের কাছে তিনি নন্দিত, তেমনি রাশিয়ায় সমাজতন্ত্রের পতন ঘটনোর জন্য আরেক পক্ষের কাছে তিনি নিন্দিত। তার মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসসহ বিশ্বনেতারা।
বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, মস্কোর সেন্ট্রাল ক্লিনিক্যাল হাসপাতাল এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘মারাত্মক ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভুগে গতকাল সন্ধ্যায় গর্বাচেভ মারা গেছেন।’
কয়েক বছর ধরে গর্বাচেভের স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছিল। তিনি হাসপাতালে যাওয়া-আসার মধ্যেই ছিলেন। গত জুনে তিনি কিডনির অসুস্থতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। তবে তার মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
এক সময়ের কমিউনিস্ট নেতা গর্বাচেভের হাত দিয়েই রাশিয়ায় সমাজতন্ত্রের পতন হয়েছিল। আবার ওই পতনের মধ্য দিয়ে বিশ্বে স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটেছিল। এক কারণে তিনি সমানভাবে আলোচিত ও সমালোচিত নেতা।
গর্বাচেভ ১৯৮৫ সালে রুশ কমিউনিস্ট পার্টির সর্বোচ্চ নেতা ও রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন। তিনি বিশ্বের জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নকে উন্মুক্ত করে দেন এবং কিছু বিষয় সংস্কার করেন।
গর্বাচেভ মূলত পেরেস্ত্রোইকা ও গ্লাসনস্ত নামে উদারীকরণের দুই কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন। এগুলো রাশিয়ায় সমাজতন্ত্রের পতন ত্বরান্বিত করেছিল বলে সমালোচকরা অভিযোগ করে থাকেন।
পুরোধা কমিউনিস্ট নেতা ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের গড়া সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯১ সালে ভেঙে পড়লে আলাদা আলাদা ১৫টি জাতিরাষ্ট্র গড়ে ওঠে। সেখান থেকেই আজকের রাশিয়ার যাত্রা শুরু হয়েছে।
পরাশক্তি থেকে রাশিয়াকে দুর্দশাগ্রস্ত দেশের কাতারে নিয়ে আসার জন্য অনেক রুশ এখনও গর্বাচেভকে ক্ষমা করতে পারেন না।
সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত ইউক্রেনে নিযুক্ত তৎকালীন কর্মকর্তা ভ্লাদিমির রোগভ বলেন, গর্বাচেভ ‘ইচ্ছাকৃতভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি ঘটিয়েছেন’। ওই ঘটনার জন্য তাকে অনেকেই ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে গণ্য করেন।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৮৯ সালে চেকস্লোভাকিয়া ও হাঙ্গেরিতে কমিউনিস্টবিরোধী বিক্ষোভ দমনে সোভিয়েত সেনা না পাঠানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের সঙ্গে নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি করে স্নায়ুযুদ্ধ অবসানের পথ তৈরির জন্য তার প্রশংসা করেন পশ্চিমারা।
পশ্চিমা বিশ্বে এই সোভিয়েত নেতাকে সংস্কারের স্থপতি হিসেবে দেখা হয়। তিনি ১৯৯১ সালে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেনসহ পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে চলা স্নায়ুযুদ্ধের অবসানে ভূমিকা রাখেন। পূর্ব ও পশ্চিমের সম্পর্কে ব্যাপক পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা রাখায় তাকে ১৯৯০ সালে শান্তিতে নোবেল দেওয়া হয়।
১৯৮৪ সালে মিখাইল আন্দ্রোপভের মৃত্যু হলে গর্বাচেভকেই সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদকের পদে ভাবা হচ্ছিল। কিন্তু ওই সময়ে সেই পদে আসেন কনস্তানতিন চের্নেনকো। তিনি পরের বছর মারা গেলে ওই পদে আসীন হন গর্বাচেভ।
৫৪ বছরের গর্বাচেভ ছিলেন তখন পার্টির প্রতাপশালী পলিটব্যুরোর সর্বকনিষ্ঠ সদস্য। আর তিনিই রুশ কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম সাধারণ সম্পাদক, যার জন্ম হয়েছে রুশ বিপ্লবের পর।
পরিপাটি গর্বাচেভকে সত্যি তার পূর্বসূরিদের সঙ্গে মেলানো কঠিন ছিল। আর তার স্ত্রী রাইসার চালচলন ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্টলেডিদের মতো।
সোভিয়েত পতনের পর নিজেও ক্ষমতা হারান গর্বাচেভ। পরে পশ্চিমা দেশগুলোতে বক্তৃতা দিয়েই সময় পার করতেন তিনি। ১৯৯৯ সালে লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে স্ত্রী রাইসা গর্বাচেভের মৃত্যুতে অনেকটাই ভেঙে পড়েন তিনি।
১৯৯৬ সালে পরিবর্তিত রাশিয়ায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন গর্বাচেভ, তবে ভোট পেয়েছিলেন মোটে ৫ শতাংশ।
রাশিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের এক সময় কড়া সমালোচক ছিলেন গর্বাচেভ। তবে ২০১৪ সালে পুতিনের নির্দেশে যখন ক্রিমিয়া দখল করে মস্কো, তখন তার পক্ষেই ছিলেন তিনি। গত বছর গর্বাচভের ৯০তম জন্মদিনে তাকে আবার প্রশংসায় ভাসিয়েছিলেন পুতিন।
জাতিসংঘ মহাসচিব বলেছেন, গর্বাচেভ ‘ইতিহাসের গতিপথ পাল্টে দিয়েছেন’। তার মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও।
গর্বাচেভকে মস্কোর নভোদেভিচি সমাধিক্ষেত্রে তার স্ত্রী রাইসার পাশে সমাহিত করা হবে। এ সমাধিক্ষেত্রে রাশিয়ার প্রথিতযশা বহু ব্যক্তিকে সমাহিত করা হয়েছে।
প্রবা/এইচকে /এসআর