প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ০৮:৩৯ এএম
আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের একটি দলের প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণায় বলা হয়েছে, ফিডব্যাক লুপসের কারণে পৃথিবীর জলবায়ুর বর্তমান অবস্থার স্থায়ী পরিবর্তনের ভয়াবহ আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ।
ফিডব্যাক লুপস হলো চক্রাকার শৃঙ্খলা বিক্রিয়া, যেখানে একটি পরিবর্তন পুনরায় একই ধরনের পরিবর্তনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যেমন দাবানলের কারণে গাছের কার্বন বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে। এই কার্বনের কারণে পৃথিবী আরও উত্তপ্ত হয়। ফলে আরও বেশি দাবানল ঘটে। চক্রবৃদ্ধি হারে ঘটতে থাকে।
আরেকটি উদাহরণ হলো, বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলছে। এতে করে বরফাচ্ছাদিত এলাকা সংকুচিত হচ্ছে এবং ক্রমাগত বরফের নিচে থাকা সমুদ্রের পানি সূর্যের তাপের সংস্পর্শে আসছে। আর সমুদ্রের কালো পানি সাদা বরফের তুলনায় অনেক বেশি তাপ শোষণ করে। এর ফলে আরও বেশি করে বরফ গলছে।
আবার হিমবাহের বরফ গলে যাওয়ার কারণে হিমবাহের হ্রদগুলোর পানি উপচে মানুষের বসবাসের জায়গাগুলোতে বন্যার সৃষ্টি করে।
ইতোমধ্যে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, অ্যান্টার্কটিকার বরফ মারাত্মক হারে কমছে। চলতি বছরে অ্যান্টার্কটিকার গ্রীষ্ম মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই বরফাচ্ছাদিত এলাকা আরও বেশি সংকুচিত হবে।
বিজ্ঞান সাময়িকী ওয়ান আর্থে গত শুক্রবার প্রকাশিত আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের ওই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে বর্তমানে জলবায়ু সংক্রান্ত ৪১টি ফিডব্যাক লুপ রয়েছে। এর মধ্যে ২৭টি ফিডব্যাক লুপ বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য দায়ী।
যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্যের এক্সেটার ইউনিভার্সিটি এবং জার্মানির পটসডাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চের বিজ্ঞানীদের ওই দলটি গবেষণার সময় প্রচুর সংখ্যক জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত ফিডব্যাক লুপ খুঁজে পাওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
ওরেগন স্টেট ইউনিভার্সিটির ইকোলজির অধ্যাপক গবেষণার প্রধান লেখক উইলিয়াম রিপল সিএনএনকে বলেন, বন ধ্বংস হয়ে যাওয়া, জলাশয়গুলো শুকিয়ে যাওয়া এবং পারমাফ্রস্ট (আর্কটিক অঞ্চলের বরফজমাট মাটি) গলে যাওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। এর প্রভাব সম্ভবত এতটাই ব্যাপক যা সঠিকভাবে নিরূপণ করা কঠিন।
তিনি বলেছেন, ‘আমাদের সর্বোত্তম জ্ঞান অনুসারে, এটি জলবায়ু ফিডব্যাক লুপের সবচেয়ে বিস্তৃত তালিকা। এসব ফিডব্যাক লুপ জলবায়ু মডেলগুলোতে সম্পূর্ণরূপে বিবেচিত হয়নি।’
গবেষকরা বলেছেন, জলবায়ু-সংক্রান্ত ফিডব্যাক লুপগুলো পরোক্ষভাবে একে অপরকে প্রভাবিত করতে পারে, যা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলবে এবং জলবায়ু সংকটের প্রভাবকে আরও ত্বরান্বিত করবে।
উদাহরণস্বরূপ অ্যান্টার্কটিকা ও সাইবেরিয়ার তুন্দ্রা অঞ্চলের মাটিকে ঢেকে রেখেছে বরফের স্তর। এটি গলে যাওয়ায় সেখানকার মাটি আরও গরম হচ্ছে এবং শুষ্ক পরিস্থিতি তৈরি হতে সাহায্য করছে, যা দাবানল সৃষ্টির পরিবেশ তৈরি করছে। রিপল বলেন, এই আন্তঃসংযোগ জলবায়ু পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট প্রভাবগুলোর পূর্বাভাস দেওয়া চ্যালেঞ্জিং করে তোলে।
আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো এই ফিডব্যাক লুপগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের লাল রেখা বা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলোতে (টিপিং পয়েন্ট) আঘাত করতে পারে। যেমন আর্কটিকের বরফ গলা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় এটি শেষ পর্যন্ত গ্রিনল্যান্ডের আইস শিট ধসিয়ে দিতে পারে।
রিপল এক বিবৃতিতে বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের এসব প্রভাব হঠাৎ শক্তিশালী হয়ে উঠলে তা এটাই প্রমাণ করবে যে এটি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
সম্প্রতি একটি গবেষণা প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে সিএনএনের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে প্রাক-শিল্প যুগের চেয়ে দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতার সীমা অতিক্রম করার ৫০ শতাংশ আশঙ্কা রয়েছে।
এক্সেটার ইউনিভার্সিটির ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড আর্থ সিস্টেম সায়েন্সের চেয়ারম্যান ও গবেষণার সহ-লেখক টিম লেন্টন বলেন, জটিল জলবায়ু ব্যবস্থায় ফিডব্যাক লুপের তীব্রতা সম্পর্কে আমাদের বোঝা প্রয়োজন।
পটসডাম ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও সহ-লেখক জোহান রকস্ট্রম বলেন, ইতোমধ্যেই দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের একাধিক সীমা অতিক্রম করার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে ফিডব্যাক লুপ আমাদের নিরাপদ জলবায়ু গড়ে তোলার সব প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দেবে।
গবেষকরা গ্রহ-উষ্ণায়ন ও দূষণ অতিদ্রুত ব্যাপক হারে কমানোর পাশাপাশি জলবায়ু ফিডব্যাক লুপগুলোতে গবেষণা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
রিপল বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধে আমাদের উদ্যোগ নিতে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তবে আমরা মানুষেরা যদি এখন শুধু মৌলিক চাহিদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারকে অগ্রাধিকার দিয়ে অর্থপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করি, তবে ক্ষতি সীমিত করা এখনও সম্ভব হতে পারে।
সূত্র : সিএনএন