জলবায়ুর পরিবর্তনে সংকটে কলোরাডো
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১১:৩৫ এএম
যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো নদী ১ হাজার ৪৫০ মাইল দীর্ঘ
ওয়াইমিং থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সাতটি রাজ্যের প্রায় চার কোটি মানুষকে পানি সরবরাহ করে থাকে ১ হাজার ৪৫০ মাইল দীর্ঘ কলোরাডো নদী। গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি খাতেও। কিন্তু গত দুই দশকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সংকটে পতিত হয়েছে এই নদী।
কলোরাডো নদীর প্রবাহ কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ। বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রতিডিগ্রি উষ্ণায়নে নদী সংকুচিত হবে ৯ শতাংশ করে। কখনও কখনও ‘আমেরিকার নীলনদ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। মানবদেহে রক্ত যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ততটা গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচেনা করা হয় এ নদীকে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বছরের পর বছর ধরে খরার প্রভাবে নদীর পানির স্তর ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। পানি কমে যাওয়ায় শুরু হয়েছে রাজ্যগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব, এমনকি রাজনৈতিক সংকট। এখন সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলোকে পানির ব্যবহার কমাতে হবে। কোন রাজ্য কতটুকু পানি ব্যবহার করবে তা নিয়ে চলছে দ্বন্দ্ব।
২০২১ সালে ওয়াশিংটন কলোরাডো নদী অববাহিকায় প্রথমবারের মতো পানির ঘাটতি ঘোষণা করেছিল। বর্তমানে কীভাবে নাটকীয়ভাবে পানির ব্যবহার কমানো যায় তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, কলোরাডো নদীর ওপরের (উজান) এবং নিচের অববাহিকার (ভাটি) সাতটি রাজ্য যদি উল্লেখযোগ্য হারে পানির ব্যবহার না কমায় তবে এই নদীর ওপর নির্ভরশীল যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম দুটি কৃত্রিম জলাধারÑ লেক পাওয়েল ও লেক মিডে পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাবে। আর সেটি হলে কলোরাডোর অববাহিকায় অবস্থিত সাতটি রাজ্য ওয়াইমিং, কলোরাডো, উটাহ, নিউ মেক্সিকো, আরিজোনা, নেভাদা এবং ক্যালিফোর্নিয়ার কৃষকরাসহ লাখ লাখ মানুষ বিপদে পড়বেন। কলোরাডোর পানির অধিকার সবচেয়ে বেশি ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের।
জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির স্বাদুপানিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ লিস মুলিন বার্নহার্ড আলজাজিরাকে বলেছেন, কলোরাডোর পানি আরও কমে গেলে কৃত্রিম জলাধার লেক মিড ও লেক পাওয়েলে পানি প্রবাহিত হতে পারবে না। বর্তমানে মৃতপ্রায় এই দুটি জলাধার কয়েকটি রাজ্যের জন্য অবিশ্বাস্যরকম গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, পশ্চিমের রাজ্যগুলো বিশেষ করে ক্যালিফোর্নিয়া দেশটির বেশিরভাগ অংশের জন্য ফলের ঝুড়ি বা রুটির ঝুড়ি হিসেবে পরিচিত। এই নদী সংকটে পতিত হওয়ায় সেচ ও পানির সম্পদের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, টেকসই নয় এমন কৃষিব্যবস্থা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে জটিল এই সংকটের সূত্রপাত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, পানি ব্যবহারকারীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খরচ কমাতে হবে, না হলে প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। জলাধার থেকে পানি সরবরাহের সক্ষমতা কমে যেতে পারে। এটি যে শুধু পানির ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে তা নয়, প্রভাব পড়বে বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও। বন্ধ হয়ে যাবে হাইড্রোপাওয়ার উৎপাদন, যা তাদের পশ্চিমের গ্রিডের স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলোর প্রায় বেশিরভাগই একমত যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিকভাবে নিম্ন অববাহিকার তিন অঙ্গরাজ্যকে পানি খরচ কমাতে হবে। সেগুলো হলোÑ আরিজোনা, ক্যালিফোর্নিয়া এবং নেভাডা। মূলত দশকের পর দশক ধরে ওই তিন অঙ্গরাজ্য বেশি পানি খরচ করে এ সংকটকে আরও ত্বরান্বিত করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে তর্ক বেধেছে মূলত ক্যালিফোর্নিয়াকে নিয়ে। নিম্ন অববাহিকার পানির সিংহভাগই আইনগতভাবে তাদের দখলে এবং তারা পানি খরচ কমাতে নারাজ। অন্তত যেভাবে অন্যরা চাইছে, সেভাবে কমাতে নারাজ।
এদিকে পানির খরচ কমানোর বিষয়টি নিম্ন অববাহিকার রাজ্যগুলোর মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার জন্য চলতি সপ্তাহে নদীসংশ্লিষ্ট সাত অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ছয়টি বাইডেন প্রশাসনকে অনুরোধ জানিয়েছে।
সংকটের সময় কারা পানির ভাগ পাবে, কারা পাবে না, কতটুকু কমাতে হবে, সে সম্পর্কিত শতবর্ষী পুরোনো একটি আইন রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু অঙ্গরাজ্যগুলো বলছে, জলবায়ু পরিবর্তন নদীকে এতটাই বদলে দিয়েছে যে, এখন আর ওই আইন মেনে পানি বণ্টন করা ঠিক হবে না।
বিদ্যমান পুরোনো ওই নিয়ম অনুযায়ী ক্যালিফোর্নিয়াকে কৃষি খাতে পানি খরচ কমাতে হবে সবার পরে। ফলে তারা নিজেদের বৈধ দাবি থেকে সরতে চাইছে না। এর বদলে তারা যে পাল্টা প্রস্তাবটি দিচ্ছে, সেটি বাস্তবায়ন করা হলে ফিনিক্স, টাসন এবং ১১টি আমেরিকান আদিবাসী গোষ্ঠী প্রায় সম্পূর্ণভাবেই কলোরাডো নদীর পানি থেকে বঞ্চিত হবে।
পলিটিকোর প্রতিবেদন বলছে, নদীকে ঘিরে অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের এই সংকট ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক প্রশাসনের রাজনৈতিক দুর্যোগ হয়ে দেখা দিয়েছে। কারণ এ লড়াইয়ের একদিকে রয়েছে ৩ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলারের অর্থনীতির এক অঙ্গরাজ্য, যার অর্থনীতির বড় অংশই কৃষি খাতনির্ভর। এ ছাড়াও ক্যালিফোর্নিয়া ডেমোক্র্যাটদের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
অন্যদিকে রয়েছে আরিজোনা। এ অঙ্গরাজ্যের ওপর নির্ভর করছে ডেমোক্র্যাটদের রাষ্ট্রীয় নির্বাচনের ইলেকটোরাল ভাগ্য। এ ছাড়া আরিজোনার সঙ্গে হাত মিলিয়েছে নিম্ন অববাহিকার অন্যান্য অঙ্গরাজ্য।
বর্তমানে দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে আরিজোনা ও ক্যালিফোর্নিয়া থাকলেও উচ্চ অববাহিকার রাজ্য ওয়াইমিং, কলোরাডো, উটাহ এবং নিউ মেক্সিকোর নিজ নিজ স্বার্থ রয়েছে এ লড়াই ঘিরে। চারটি রাজ্যই বর্তমানে আরিজোনার পক্ষে। তারাও পুরোনো আইনের সংস্কার চাইছে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নদী স্থায়ীভাবেই বদলে গেছে। বর্তমান আইনে নিম্ন অববাহিকায় যে পরিমাণ পানি বাধ্যতামূলকভাবে সরবরাহের কথা বলা আছে, সে পরিমাণ পানি ভবিষ্যতে সরবরাহ করতে হলে নিজেদের পানি ব্যবহারেই ব্যাপকভাবে লাগাম টানতে হবে তাদের। পলিটিকোর প্রতিবেদন বলছে, এ নিয়ে আরও বড় লড়াই চোখে পড়বে আগামী দুই বছরের মধ্যেই। সূত্র : পলিটিকো