প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ০১:৩০ এএম
আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ০৯:০৪ এএম
ভূমিকম্পে স্বজনদের হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়া এক ব্যক্তি। ছবি : এএফপি
শতাব্দীর ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে তুরস্ক ও সিরিয়া। সোমবার পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে এ পর্যন্ত দেশ দুটিতে মৃত্যু ছাড়িয়েছে ৭ হাজার। আহত হয়েছেন ২০ হাজারের বেশি। ভবনের ধ্বংসস্তূপে আটকা পড়েছেন অসংখ্য মানুষ। তারা বাঁচার জন্য আর্তনাদ করছেন। তাদের কেউ কেউ মোবাইলে ভিডিও বার্তা, ভয়েস মেইল পাঠিয়ে সাহায্যের আবেদন জানাচ্ছেন। হিমাঙ্কের নিচে তাপমাত্রা, তুষার ও বৃষ্টির কারণে উদ্ধারকাজে বিঘ্ন ঘটায় তাদের জীবিত উদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়ছে। নিহতের সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। ইউনিসেফ বলছে, নিহতদের মধ্যে শিশুই রয়েছে কয়েক হাজার। তুরস্কের ১০টি প্রদেশে জরুরি অবস্থা জারি করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান।
তুরস্ক ও সিরিয়াজুড়ে চাপা পড়া ব্যক্তিদের খুঁজতে ও উদ্ধার করতে হাজার হাজার উদ্ধারকর্মী, দমকলকর্মী, চিকিৎসাকর্মী, সামরিক ও বেসামরিক লোকজন আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রিয়েসাস বলেছেন, ‘আমরা এখন সময়ের বিরুদ্ধে দৌড়াচ্ছি। প্রতিটি মিনিট, প্রতিটি ঘণ্টা কেটে যাচ্ছে আর জীবিতদের খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ হয়ে আসছে।’ তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চল এবং উত্তর সিরিয়ার বেশিরভাগ অংশজুড়ে উদ্ধার অভিযান চলছে। বেশ কয়েক হাজার উদ্ধারকর্মী কাজ করছেন। সেই সঙ্গে উদ্ধারকাজে যোগ দিতে বিভিন্ন দেশ উদ্ধারকর্মী পাঠানোর কথা ঘোষণা দিয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় রাত ১টা (স্থানীয় সময় রাত ১০টা) পর্যন্ত তুরস্ক ও সিরিয়ায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৭ হাজার ২৬৬। এর মধ্যে তুরস্কে ৫ হাজার ৪৩৪ ও সিরিয়ায় ১ হাজার ৮৩২। দুই দেশে আহত ছাড়িয়েছে ২০ হাজার। ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ৮ হাজারের বেশি মানুষকে। তুরস্ক সরকার ৩ লাখ ৮০ হাজার জনকে আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠিয়েছে। দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা বলেছে, তাদের কাছে ১১ হাজার ৩৪২টি ভবন ধসে পড়ার খবর রয়েছে, যার মধ্যে ৫ হাজার ৭৭৫টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
তুরস্কের দক্ষিণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোতে দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগ, তুষারপাত, বৃষ্টি, ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা, রাস্তায় গৃহহীন লক্ষাধিক লোকের অবস্থানÑ এসব কারণে উদ্ধার তৎপরতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
অন্যদিকে বিদ্রোহী-নিয়ন্ত্রিত উত্তর সিরিয়ার স্বেচ্ছাসেবক উদ্ধারকর্মীরা বলেছেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা লোকদের টেনে তোলার জন্য তাদের প্রয়োজনীয় জ্বালানি এবং অন্য জিনিসপত্রের অভাব রয়েছে। অসংখ্য লোক আটকা পড়ে আছে এবং জীবিতদের খুঁজে বের করতে তারা হিমশিম খাচ্ছেন। সিরিয়ার আলেপ্পোর উত্তর-পশ্চিমের এক শহর থেকে পাওয়া এক ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, ভবনগুলো ধসে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধুলোর বিশাল মেঘের মধ্য দিয়ে বাসিন্দারা পালিয়ে যাচ্ছে এবং চিৎকার করছে। ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত কিছু এলাকা সরকারি নিয়ন্ত্রণে নেই। তাই সেখানে চিকিৎসাসেবা এবং জরুরি সরবরাহের সুযোগ সীমিত। সিরিয়ার বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকায় কাজ করা একটি ত্রাণ সংস্থা হোয়াইট হেলমেট জরুরি সাহায্যের আহ্বান জানিয়েছে।
তুরস্কের পূর্ব আনাতোলিয়ার মালাতিয়া প্রাচীন নগরীর একটি। হাজার হাজার বছর ধরে এখানে মানুষের বসতি। সোমবারের ভূমিকম্পে এই অঞ্চলটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিবিসি টেলিভিশনের মালাতিয়া আঞ্চলিক সংবাদদাতা ইবরাহিম হাসকোলোগলু বলেছেন, ‘এখনও অনেক মানুষ ধ্বংসস্তূপে আটকা পড়ে আছে। তারা সাহায্য চেয়ে চিৎকার করছেন। তাকে এবং তার সহকর্মী অনেক সাংবাদিকের কাছে ভিডিও, ভয়েস মেইল করে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন।’
কাহরামানমারাসের গাজিয়ানতেপ ছিল ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল। এখানকার ধ্বংসস্তূপে আটকা পড়া মানুষদের খুঁজতে কংক্রিটের ভগ্নাংশ ও বিভিন্ন আসবাবপত্র হাত দিয়েই সরাতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। উদ্ধারকর্মীরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন এসব মানুষকে জীবিত বের করে আনতে। ধ্বংসস্তূপ থেকে ‘কেউ আছেন? শুনতে পাচ্ছেন?’ এমন অনেকের আর্তনাদ ভেসে আসছিল। কিন্তু সময় যত গড়াচ্ছে তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে।
তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলীয় হাতায়ে প্রদেশের রাজধানী আনতাকিয়া শহর। সিরীয় সীমান্তের কাছে এই শহরটিতে উদ্ধারকারীরা জীবিতদের সন্ধানে সারা রাত ও গতকাল সকাল পর্যন্ত চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। অনেকে ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে তীব্র শীতের মধ্যে অপেক্ষা করেছিলেন, তাদের বন্ধু বা স্বজনকে জীবিত পাওয়া যাবে এই আশায়। ভবনের একটি স্তূপের নিচে সাহায্যের জন্য একজন নারীর কণ্ঠস্বর শোনা গেছে বলে জানিয়েছেন রয়টার্সের সাংবাদিকরা। তারা একটি শিশুর মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেছেন।
ভূমিকম্প শুরু হলে উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ার ইদলিব শহরের বাসিন্দা সাংবাদিক মোহাম্মাদ কাজমুজ ভোরের আলো ফোটার আগেই পরিবার নিয়ে শহর ত্যাগ করেন। কাজমুজ বলেন, ‘সবাই ভবনে থাকা অবস্থাতে কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটা ভবন ধসে পড়তে দেখেছি। এর আগে গৃহযুদ্ধের সময় সিরিয়া ও রুশ সরকারের বোমা হামলার শিকার হয়েছিল এই ভবনটি। আশপাশের মানুষ আতঙ্কে সবকিছু রেখে বাসা থেকে এক কাপড়ে বেরিয়ে পড়েছিল রাস্তায়। মনে হচ্ছিল এ যেন কেয়ামত।’
আশপাশের ভবন থেকে মৃতদেহ সরানো ও উদ্ধারকাজে স্বেচ্ছাসেবক দলের সঙ্গে প্রায় ১২ ঘণ্টা কাজ করেছেন কাজমুজ। তীব্র শীতের পরও ইদলিবের টিকে থাকা ভবনগুলোতে ফিরতে ভয় পাচ্ছেন সেখানের বাসিন্দারা। মৃত ও আহতের সংখ্যা এত বেশি যে হাসপাতাল ও চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতেও আর রোগী নেওয়ার মতো অবস্থা নেই। তাদের বাঁচিয়ে তুলতে চিকিৎসকরাও হিমশিম খাচ্ছেন।
সিরিয়ার সীমান্তবর্তী শহর জিন্দিরেসের আলি বাতেল তার শহরকে বাঁচাতে অনুরোধ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমার পরিবার, সন্তানরা এখনও ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে আছে। ধ্বংসস্তূপের বিভিন্ন জায়গা থেকে সাহায্যের জন্য আর্তনাদ শোনা গেলেও তাদেরকে বাঁচানোরে মতো কেউ নেই, উদ্ধারের কোনো চেষ্টাই করা হচ্ছে না সেখানে।’
বেঁচে যাওয়া আরেক সিরীয় নাগরিক ওসামা আবদেল হামিদ বলেন, ‘ভূমিকম্পের সময় আমার পরিবার ঘুমাচ্ছিল। আমাদের ওপর দেয়াল ভেঙে পড়ে। তবে আমার ছেলে সেখান থেকে বের হতে পেরেছিল। বের হয়ে সে সাহায্যের জন্য চিৎকার করার পর আশপাশের মানুষ এসে উদ্ধার করে আমাদের।’
২ কোটি ৩০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত : তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। গতকাল তুরস্ক ও সিরিয়ায় ধসে পড়া ভবনগুলো পরিদর্শনে যান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা অ্যাডেলহেইড মার্শাং। এ সময় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
২৮ ঘণ্টা পর আরও একটি ভূমিকম্প : তুরস্কের মধ্যাঞ্চলে গতকাল নতুন একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানার খবর পাওয়া গেছে। তুরস্কের স্থানীয় সময় গতকাল সকাল ৮টা ৪৩ মিনিটে এই ভূমিকম্পটি হয়। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা বলছে, রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৫। সূত্র : বিবিসি, রয়টার্স, সিএনএন, আলজাজিরা ও গার্ডিয়ান।