প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২০ জানুয়ারি ২০২৩ ১১:৫৬ এএম
আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২৩ ১১:৫৬ এএম
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে জেনারেল সের্গেই সুরোভিকিন।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় গত ১১ জানুয়ারি ইউক্রেনে যুদ্ধরত রাশিয়ান বাহিনীর নেতৃত্বে পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে। দপ্তরটি জানায়, চিফ অব দ্য জেনারেল স্টাফ ভ্যালেরি গেরাসিমভ এখন থেকে ইউক্রেন যুদ্ধের নেতা।
মাত্র তিন মাস আগে এই পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন জেনারেল সের্গেই সুরোভিকিন। তখন গেরাসিমভকে ডেপুটি পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, নেতৃত্বের এই রদবদল ক্রেমলিনের হতাশার বিষয়টি স্পষ্ট করেছে।
সুরোভিকিন মস্কোর কমান্ডার এবং ইউক্রেনীয় যোদ্ধাদের দ্বারা অন্যতম দক্ষ হিসেবে স্বীকৃত একজন সামরিক কর্মকর্তা। তিনি বিচ্ছিন্ন শহর খেরসনকে ধরে রেখেছিলেন এবং পরবর্তীতে সেখান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করাতে পুতিনকে রাজি করাতে সক্ষম হয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, সীমিত হতাহতের মধ্য দিয়ে খেরসন থেকে সেনা প্রত্যাহারের কঠিন অভিযানও সুন্দরভাবে পরিচালনা ও সম্পন্ন করেছিলেন এই সুরোভিকিন।
ইউক্রেন যুদ্ধে অন্য একটি ফ্ল্যাশপয়েন্ট ছিল বাখমুত শহর, যেখানে তীব্র লড়াই চলছিল। শহরটি একীভূতকরণে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে নির্মম বোমাবর্ষণও চালিয়েছিলেন সুরোভিকিন। উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয়দের ভড়কে দিয়ে আরও বেশি শরণার্থীকে ইউরোপে পাঠানো। এ ক্ষেত্রেও তুলনামূলকভাবে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি, যদিও পুতিনের প্রত্যাশার বিপরীতে তা যথেষ্ট ছিল না। সুরোভিকিনের সতর্ক দৃষ্টিভঙ্গি যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয় আনতে পারেনি। কারণ তার নির্মমতার বিপরীতে ইউক্রেনীয় সেনারা প্রতিরোধের ইচ্ছা হারায়নি।
সুরোভিকিনের ওপর শেষ খড়গটি নেমে আসে মূলত ইংরেজি নববর্ষের দিন। সেদিন মাকিভকার বাইরে একটি ব্যারাকে ইউক্রেনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় রাশিয়ার শত শত রিজার্ভ সেনা নিহত হয়। এই হামলা ঠেকানো আসলে সুরোভিকিনের সরাসরি দায়িত্ব ছিল না। বরং এটি রাশিয়ার সেনা কর্মকর্তাদের অযোগ্যতার বিষয় ছিল। কিন্তু ওই ব্যর্থতার বিপরীতে মুখরক্ষার জন্য পুতিনের একজন বলির পাঁঠা প্রয়োজন ছিল। এ ক্ষেত্রে পুতিন সুরোভিকিনকেই বেছে নেন। এই ঘটনাটি ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়ার নোংরা রাজনীতির চিত্রই যেন তুলে ধরেছে।
রাশিয়ার রাজনীতিতে পুতিনই সর্বেসর্বা। কোনো ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানকে উৎসাহিত করা বা চাপে রাখার ক্ষেত্রে পুতিনকে মহান সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীর ভূমিকায় দেখা হয়।এ ক্ষেত্রে প্রত্যেককে তার অনুগ্রহ চাইতে হবে এবং তিনি তার ক্ষমতা বজায় রাখার জন্য কাকে পুরস্কৃত করবেন এবং কাকে শাস্তি দেবেন, সেটা একান্তই তার বিষয়।
সুরোভিকিনকে যৌথ বাহিনীর কমান্ডার করা হয়েছিল। কিন্তু পুতিন কখনোই তাকে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সমর্থন দেননি। যে কারণে তার কমান্ডের অধীনে সব বাহিনীকে একীভূতভাবে পরিচালনা করার অনুমতি তার ছিল না। তাই চেচেন শক্তিশালী রমজান কাদিরভের ব্যক্তিগত সেনা এবং ইয়েভজেনি প্রিগোজিনের অধীনে ওয়াগনার ভাড়াটে সেনাবাহিনীর ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না সুরোভিকিনের। এটি যুদ্ধক্ষেত্রে তার সফলতা লাভের সম্ভাবনাকে ক্ষুণ্ন করেছে এবং এর জন্য তাকেই শুধু মূল্য দিতে হয়েছে।
ইউক্রেন যুদ্ধে ‘পুতিনবাদ’-এর একটি সমস্যাযুক্ত দ্বিতীয় দিক সবার সামনে এসেছে। এ সমস্যা মূলত পুতিনের স্বৈরতান্ত্রিকতাকেন্দ্রিক। পুতিনেরর বন্ধু এবং তার সব সিদ্ধান্তে ‘হ্যাঁ’বলা চাটুকারের দল পুতিনকে এমন একজন রূপান্তরকারী নেতা হিসেবে গড়ে তুলেছে যে, ভালো সবকিছুর কৃতিত্ব চলে যাচ্ছে পুতিনের পকেটে, আর ব্যর্থতার জন্য দায়ী করা হয় অন্য কাউকে।
প্রকৃতপক্ষে পুতিনের প্রত্যাশা যত বেশি অবাস্তব, পুতিন ঠিক তত বেশি চাপের মধ্যে আছেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, গত সপ্তাহে দেশটির বিশ্বস্ত শিল্পমন্ত্রী ডেনিস মান্টুরভকে বিমানের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে বিলম্বের জন্য প্রকাশ্যে তিরস্কার করা হয়েছিল। মান্টুরভ যখন ভয়ংকর বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন, তখন পুতিন তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘আপনি কি বুঝতে পারছেন না আমরা কোন পরিস্থিতিতে আছি? এটি এক মাসের মধ্যে করা দরকার, তার পরে নয়।’
একইভাবে পুতিনের মনে হয় সুরোভিকিনের কাছে অবাস্তব প্রত্যাশা ছিল। এ রকম প্রত্যাশার কারণ তার কোনো অর্থপূর্ণ সামরিক অভিজ্ঞতা নেই এবং আধুনিক যুদ্ধের জটিলতা সম্পর্কে সামান্য জ্ঞানও নেই। তার প্রমাণ মিলেছে বাস্তবতা বিচার না করে সুরোভিকিনকে দোষারোপ করার মধ্য দিয়ে। সুরোভিকিন বহাল থাকাকালীন নতুন যুগ্ম কমান্ডারের অধীনে তিনজন ফিল্ড কমান্ডারের একজন হলেন জেনারেল গেরাসিমভ।
যদিও অফিসিয়াল নিয়ম হলো, যেহেতু এটি সুরোভিকিনের পদত্যাগ ছিল না, তাই তার ভূমিকার তার চেয়ে সিনিয়র কমান্ডারের নিয়োগ প্রয়োজন ছিল। পরিহাসের বিষয় হলো, সুরোভিকিনের স্থলে গেরাসিমভের নিয়োগ দেখা গেল। পুতিনের সমর জ্ঞান থাকলে তিন বুঝতেন যে, জেনারেল স্টাফ প্রধানের পক্ষে মাঠের ভূমিকায় কৃতিত্ব রাখা অস্বাভাবিক বিষয়।
রাশিয়ানরা এ বছরের শুরুতে নতুন আক্রমণ শুরু করার পরিকল্পনা করেছে। ওই পরিকল্পনা মোতাবেক ফ্রন্টলাইনের পরের সারিতেই ১ লাখ ৫০ হাজার সংরক্ষিত সেনাদের রাখছে তারা। এটি একটি বড়মাপের শক্তি হতে চলেছে। কিন্তু ইউক্রেনীয়রাও বসে নেই। তারাও পুনরায় সংঘটিত হয়েছে। পশ্চিমা অস্ত্রের নতুন সরবরাহে সজ্জিত হয়ে তারা রাশিয়ানদের উল্লেখযোগ্য ঠেকাতে সক্ষম করে তুলেছে নিজেদের। এমতাবস্থায় গেরাসিমভের ক্যারিয়ার এখন পুতিনের উচ্চ আশা পূরণে ব্যর্থ না হওয়ার ওপর নির্ভর করছে।
এটি বিশ্বাসযোগ্য যে, মস্কো বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কোকে যুদ্ধে যোগদানের জন্য চাপ দেওয়ার চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যেই রাশিয়ার বাহিনীর সঙ্গে যৌথ মহড়াও শুরু করেছে তারা। কিন্তু লুকাশেঙ্কো স্পষ্টতই সরাসরি যুদ্ধে জড়িত হতে খুব অনিচ্ছুক। কারণ যুদ্ধে জড়ালে সবকিছুর আগে নিজ দেশেই চাপের মুখে পড়বেন তিনি।
যদিও গেরাসিমভের নিয়োগকেও সমন্বয়ের উন্নতির একটি উপায় হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, কিন্তু কাদিরভ বা প্রিগোজিনের সঙ্গে সখ্য ত্যাগ না করলে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিবর্তন আসবে না বলেই ধারণা সামরিক বিশ্লেষকদের। প্রিগোজিন ইতোমধ্যেই গেরাসিমভের প্রতি তার অবজ্ঞাও স্পষ্ট করেছেন এবং এক্ষেত্রে ক্রেমলিনের কাছ থেকে কোনো ধাক্কাই লাগেনি তার গায়ে।
সুতরাং গেরাসিমভ হলেন সর্বশেষ এবং সর্বোচ্চ প্রোফাইল অফিসার, যাকে এমন একটি কাজ দেওয়া হয়েছে, যা তিনি কখনোই অর্জন করতে পারবেন না, যদি না পুতিন রাজনৈতিক ঝুঁকি নিতে এবং তাকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করতে ইচ্ছুক না হন। যতক্ষণ পুতিন তার জেনারেলদের পূর্ণ সমর্থন না দেবেন, ততক্ষণ গেরাসিমভ সফল হতে পারবেন না, এটাই সত্যি। তবু রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর এই সিনিয়র অফিসার যদি ব্যর্থ হন, তবে সর্বাধিনায়ক ভ্লাদিমির পুতিনের ওপর চূড়ান্ত দায় চাপানো দেশটির জনগণের পক্ষে কঠিন হবে। কারণ একটাই, সেটা হলো পুতিন রাশিয়ার ‘মহান সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী’!
সূত্র : আলজাজিরা।