প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৫ জানুয়ারি ২০২৩ ১৯:৫৯ পিএম
আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০২৩ ২১:০০ পিএম
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরকার ইসরায়েলের বিচারব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর প্রস্তাব করেছে। প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ১৪ জানুয়ারি তেল-আবিবে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেন। ছবি : সংগৃহীত
ইহুদিবাদী রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংগঠনগুলোর উল্লম্ফনের অভাব নেই। অধিকৃত জেরুজালেম ও পশ্চিমতীরে নিপীড়ন, মানবাধিকার লঙ্ঘন ডাল-ভাত। প্রতিবেশী দেশগুলোয় নিয়মিত প্রকাশ্য ও গুপ্ত হামলা একটি নিয়মিত ঘটনা। এসব সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র গণতান্ত্রিক দেশ ইসরায়েল। এখন সেই ইসরায়েল পড়েছে এক গভীর সংকটে।
গত ১ নভেম্বরের জাতীয় নির্বাচনে দেশটির পার্লামেন্ট নেসেটের ১২০ এর মধ্যে ৬৪টি আসন পায় প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামি নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি এবং দলটির মিত্র উগ্রজাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় পার্টিগুলো। দুই সপ্তাহ আগে এই ব্লকটি নতুন সরকার গঠন করে।
নতুন সরকারে আইনমন্ত্রী করা হয় লিকুট পার্টির ইয়ারিভ লেভিনকে। আর জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী করা হয় চরম ডানপন্থি পার্টি জিয়ুশ পাওয়ার পার্টির নেতা ইতামার বেন-জিভিরকে। ক্ষমতাগ্রহণের পর তারা উভয়ে দেশটির বিচার বিভাগকে ঢেলে সাজানোর ঘোষণা দেন।
বিরোধীদের বিক্ষোভ
বিচার বিভাগ সংস্কারের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলে দুই সপ্তাহ ধরে ছোট ছোট অনেকগুলো বিক্ষোভ হয়েছে। সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ হয়েছে শনিবার (১৪ জানুয়ারি)। শনিবার জেরুজালেম, হাইফা ও তেল-আবিবে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়।
আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শনিবার তেল-আবিবের হাবিমা স্কয়ারে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেন। তারা নেতানিয়াহু-বিরোধী স্লোগান দেন। গণতন্ত্র রক্ষার আহ্বান জানান।
আসফা স্টাইনবের্গ নামের এক বিক্ষোভকারী বলেন, ‘তারা (নেতানিয়াহু জোট) ইসরায়েলি গণতন্ত্রকে ধ্বংস করতে চায়। এজন্য বিচারব্যবস্থার পেছনে লেগেছে। কিন্তু ইসরায়েলি গণতন্ত্রকে রক্ষায় আমরা শেষ পর্যন্ত আন্দোল করে যাব।’
সংস্কার প্রস্তাবে কী আছে
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ ইসরায়েলের উগ্রপন্থি রাজনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরে দেশটির বিচারব্যবস্থা সংস্কারের কথা বলে আসছেন। নতুন সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা ওইসব দাবি নিয়ে সম্প্রতি একটি সংস্কার প্রস্তাব প্রকাশ করেন।
প্রস্তাবে বলা হয়, সুপ্রিম কোর্টের কোনো রায় বদলে দেওয়ার অধিকার পার্লামেন্টের থাকতে হবে। বিচারক ও বিচারপতি নিয়োগে পার্লামেন্টের কথাই চূড়ান্ত হবে।
বিরোধীদের শঙ্কা
বিরোধীদের দাবি, ইসরায়েলি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী রাখতে বিচার বিভাগকে শাসন ও আইন বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও স্বাধীন রাখতে হবে। রাজনীতিবিদদের এমন ক্ষমতা দেওয়া যাবে না, যাতে করে তারা সুপ্রিম কোর্টের কোনো রায়ের ওপর খবরদারি করতে পারেন।
দেশটির প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়ার ল্যাপিদ ও উপপ্রধানমন্ত্রী বেনি গ্যান্টজসহ উদারপন্থি রাজনীতিবিদরা নিয়াহু সরকারের বিচার বিভাগ সংস্কার প্রস্তাবের বিরোধী। দেশটির বর্তমান প্রধান বিচারপতি (বিচার বিভাগের প্রেসিডেন্ট) এসথার হায়াতসহ একঝাঁক সাবেক প্রধান বিচারপতি ও সংবিধান বিশেজ্ঞদের একটা বড় অংশও প্রস্তাবিত সংস্কার প্রস্তাবের বিরোধী।
বৃহস্পতিবার (১২ জানুয়ারি) হাইফায় এক অনুষ্ঠানে এসথার হায়াত বলেন, ‘আমাদের বিচারব্যবস্থার ওপর এটা একটা নজিরবিহীন আক্রমণ। এমন করে তারা আমাদের বিচারব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করছেন, মনে হচ্ছে যেন বাইরের কোনো শক্র আমাদের হামলা করছে। আইনমন্ত্রী যে সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন, তার উদ্দেশ্য আমাদের বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা ঠিক করা নয়, বরং বিচারব্যবস্থাকে ধ্বংস করা।’
সংস্কার প্রস্তাবের উদ্দেশ্য
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গণমাধ্যম আল-মনিটরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দুর্নীতির অভিযোগে ২০১৯ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে দোষী সাব্যস্ত করেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। মামলাটি চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে। এরপর থেকে মূলত বিচারব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর কথা জোরেশোরে বলতে শুরু করেন নেতানিয়াহু।
আলোচিত সংস্কার প্রস্তাবের মাধ্যমে নেতানিয়াহু নিজের বিরুদ্ধে চলমান মামলার গতি উল্টে দিতে পারবেন, শুধু তাই নয়। বরং মামলাটি গায়েব করে দিতে পারবেন বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের হুঁশিয়ারি
আল-মনিটরের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে এই পর্যন্ত ইহুদিরা তিনবার রাষ্ট্র নির্মাণ করতে পেরেছে। প্রথম তৈরি করা রাষ্ট্র খ্রিস্টপূর্ব ৫৮৬ সালে ব্যাবিলনের রাজার হাতে ধ্বংস হয়। দ্বিতীয়বার ধ্বংস হয় ৭০ খ্রিস্টাব্দে রোমানদের হাতে । অর্থাৎ, আগের দুবার ইহুদি রাষ্ট্র ধ্বংস হয়েছিল বিদেশি শক্তির হাতে।
এবার বিচারব্যবস্থা নিয়ে যে সংকট মাথাচাড়া দিয়েছে, তা অত্যন্ত ভয়ংকর। এটার মধ্য দিয়ে ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল ধ্বংসের দিকে পা বাড়াচ্ছে। অর্থাৎ ইতিহাসের তৃতীয় ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল বিদেশি কোনো শক্তি নয়, বরং ঘরের শত্রুদের হাতে ধ্বংস হতে যাচ্ছে।
তবে আলমনিটরের হুঁশিয়ারি দূরদর্শী হলেও, আপাত এতটা আতঙ্কিত হওয়ার কারণে নেই বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
সূত্র : আল-মনিটর, আলজাজিরা।