প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৫ জানুয়ারি ২০২৩ ১৯:০৯ পিএম
প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিদেশি ঋণের বোঝা, অস্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিÑ প্রভৃতি কারণে চরম চাপের মুখে পড়েছে পাকিস্তানের অর্থনীতি। দেশটির বেশির ভাগ সরকারি দফতরে স্বাভাবিকভাবে কাজকর্ম চালানোর মতো অর্থ নেই। চরম অর্থাভাবে ভুগছে দেশটির রেল-পরিষেবাও। এ অবস্থায় ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য বিদেশি ঋণের ওপর ভর করা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না শাহবাজ শরিফের সরকারের সামনে। আর সেই পথ ধরে হাঁটতে গিয়ে বর্তমানে পাকিস্তানের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলার।
এই ঋণ থেকে চলতি অর্থবছরে দুই হাজার ১০০ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হবে পাকিস্তানকে। আর পরবর্তী তিন বছরে ফেরত দিতে হবে আরও ৬ হাজার ৯০০ কোটি ডলার। বিশ্লেষকেরা বলছেন, দুর্ভাগ্যজনক হলে সত্যি যে এই ঋণ শোধ করার মতো কোনো সম্পদ নেই পাকিস্তানের। সে ক্ষেত্রে তাদের কেবল একটাই পথ খোলা তা হলো একজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে অন্যজনকে শোধ করা। আর সেটি করলে পাকিস্তান আরও বেশি করে ঋণের মধ্যে ডুবে যেতে থাকবে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, পাকিস্তানকে ভেসে থাকতে হলে রপ্তানি বাড়ানোয় মনোনিবেশ করতে হবে। তাহলেই কেবল তারা নিজেদের আয় থেকে ধার শোধ দিতে পারবে। কিন্তু তার আগপর্যন্ত তারা ঝুঁকির মধ্যেই থাকবে। পাকিস্তান কীভাবে এই দুর্দশায় পৌঁছেছে, সেটা বোঝারও চেষ্টা করেছেন বিশ্লেষকরা। পাকিস্তান যখন আল-কায়েদা এবং আফগানিস্তানে তালেবানদের সঙ্গে সখ্যে জড়িয়ে পড়ে, তখন পশ্চিমাদের ঋণের বেশির ভাগই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এতে করে তাদের অর্থনীতিকে গতিশীল করার অন্যতম উৎসও বন্ধ হয়ে যায়।
এ কারণে, ২০০২ সালের পর প্রায় প্রতিবছরই পাকিস্তানের চলতি হিসাবে ঘাটতি দেখা গেছে, যা তারা রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্সের মাধ্যমে কাটিয়ে উঠতে পারেনি। আর এ কারণে প্রতিবছর পাকিস্তানের বিদেশি ঋণের পরিমাণ পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। ২০০২ সালের পর পাকিস্তান প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রাও আয় করতে পারেনি।
ফলে তাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একমাত্র উৎস হয়ে ওঠে বিদেশি ঋণ। এই ঋণ শোধের প্রচেষ্টায় যে পথ ধরে হেঁটেছে করাচি, সে পথে ঋণের বোঝা ক্রমেই বেড়েছে।
২০০৭-০৮ সালে দেশটির তৎকালীন শাসক জেনারেল মোশাররফের সরকারের সময় পাকিস্তানের চলতি হিসাবের ঘাটতি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। পরবর্তী সময়ে পিপিপি সরকারকে সেই ঘাটতি কমাতে হয়েছিল। ২০০৮ সালের পর পাকিস্তানের অর্থনীতি কোনোভাবেই ঠিকঠাক চলছিল না। তারা আইএমএফের কর্মসূচিতে ছিল না, তাই বিশ্ব তাদের ঋণ দিতেও ইচ্ছুক ছিল না।
পাঁচ বছর পার করার ২০১৩ সালে কিছুটা প্রাণসঞ্চার হয় পাকিস্তানের অর্থনীতিতে। তবে তখনও তারা বিদ্যুৎ ঘাটতির মধ্যে ছিল। এরপর দুটি জিনিস ঘটেছে। দেশটি আইএমএফের চুক্তিতে সাক্ষর করেছে এবং চীনের সঙ্গে অনেকগুলো চুক্তি করেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং অন্যান্য অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য তারা চীনের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছে। ঘাটতি মেটাতে তারা আন্তর্জাতিক বন্ড বাজার থেকে ঋণ নিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, চীনের কাছ থেকে ঋণ নেওয়াটা অবশ্য সঠিক কাজ ছিল, কারণ তাদের সত্যিই বিদ্যুৎ, রাস্তা ও গ্যাসের পরিকাঠামোর উন্নয়ন প্রয়োজন।
এরপর আবার অন্য সমস্যা দেখা দিয়েছে। সমস্যাটি হলো, যে বছরগুলোতে তারা বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা দ্বিগুণ করেছিল, তারা সেই পাঁচ বা তার পরবর্তী চার বছরে তাদের শিল্প উৎপাদন এবং রপ্তানি দ্বিগুণ করতে পারেনি। অর্থাৎ বাড়তি বিদ্যুৎ শিল্পপণ্য উৎপাদনে তেমন কোনো কাজে লাগেনি।
তাই আজ সেই ঋণ শোধের চাপ বাড়লেও পরিশোধের ক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি দেশটি। এর মানে এই নয় যে, বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন ভুল ছিল। এর মানে এই যে, তারা বিদ্যুতকে ভালোভাবে ব্যবহার করতে পারেনি। কারখানা স্থাপনের পরিবর্তে তারা বেশি করে শপিং মল এবং কমিউনিটি সেন্টারের মতো অনুৎপাদনশীল খাতে বিদ্যুতকে ব্যবহার করেছে।
এমনকি ওই পাঁচ বছরের মধ্যে একটি স্থির বিনিময়হারের ফলে রপ্তানি থেকে দেশটির জিডিপি ইতিহাসের সর্বোচ্চ নিম্নমুখী মোড় নিয়েছিল। বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ইউরোবন্ড থেকে ঋণ হিসেবে অর্থ নিয়ে ঘাটতি মেটাতে হয়েছিল পাকিস্তানকে।
২০১৮ সাল থেকে চলতি হিসাব এবং রাজস্ব ঘাটতির মধ্যে সমন্বয়ের চেষ্টা করাও হয়নি। তাই সরকার যখন ঘাটতিতে পড়েছে, তখন অর্থায়নের জন্য ঋণ নিয়েছে। কিন্তু যেহেতু স্থানীয় সঞ্চয়ে কোনো উদ্বৃত্ত নেই, তাই রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে বিদেশি ঋণ ছাড়া অন্য কোনো উপায়ও ছিল না।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য এখন চলতি ঘাটতি কমানোই যথেষ্ট নয়। বরং বড় ঋণ পরিশোধের সঙ্গে সঙ্গে তাদের রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে হবে। পাকিস্তান কীভাবে এই দুর্দশা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তরটি সহজ। সেটা হলো, চলতি হিসাবের ভারসাম্য আনতে রপ্তানি বাড়িয়ে ঋণ পরিশোধ করতে হবে এবং অর্থনৈতিক দক্ষতা উন্নত করতে সরকারি বিভিন্ন পরিষেবা সংস্থাগুলোকে বেসরকারিকরণ করতে হবে। তবে তা করার জন্য যে সাহস ও ঐকমত্য প্রয়োজন, তার জন্য শক্ত নেতৃত্বের অভাব রয়েছে।
এ ছাড়াও খুচরা ও পাইকারি বাণিজ্য, কৃষিজমির ওপর কর কমাতে হবে। এগুলো সবই কঠিন পদক্ষেপ, কিন্তু ঋণের জাল থেকে বেরিয়ে আসার জন্য এসব পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
সূত্র : ডন।