প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০২৩ ১৯:০০ পিএম
২ জানুয়ারি সকালে ‘বিকট আওয়াজে’ ঘুম ভেঙে যায় যোশীমঠের বাসিন্দা প্রকাশ ভোটিয়ালের (৫২)। নিজের নতুন বাড়ির ১১ ঘরের মধ্যে ৯টির মধ্যেই ফাটল দেখতে পান তিনি। ঘাবড়ে গিয়ে ১১ সদস্যের পরিবার নিয়ে আশ্রয় নেন তুলনামূলকভাবে অল্প ক্ষতি হওয়া দুই ঘরে। তারপর থেকে সেখানেই থাকছেন তিনি।
উত্তর ভারতীয় প্রদেশ উত্তরাখন্ডের শহর যোশীমঠের হাজারো বাসিন্দার এখন বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটাই এ রকম। আতঙ্কে দিন কাটছে সবার।
ভোটিয়াল বলেন, ‘আমরা গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকি। অল্প আওয়াজেও আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। জরুরি প্রয়োজনে যাতে তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে আসতে পারি, সে প্রস্তুতি নিয়ে ঘুমাতে যাই।’
ভারতের সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, যোশীমঠ ধীরে ধীরে দেবে যাচ্ছে। উত্তর ভারতীয় প্রদেশ উত্তরাখন্ডের এই শহরের মোট বাসিন্দা ২০ হাজারের কাছাকাছি। হিমালয় এলাকার এই পর্বত শহরের অবস্থান দুই উপত্যকার মিলনস্থলে, মাটি থেকে ৬ হাজার ১৫১ ফুট ওপরে। পুরোটাই দাঁড়িয়ে বালু ও নুড়িপাথরের ওপর, শক্ত পাথুরে মাটিতে নয়।
শহরে মোট ভবনের সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার হাজার। এর মধ্যে ফাটল ধরেছে ৬৭০টিরও বেশি ভবনে। ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে স্থানীয় মন্দির এবং সরু পথও বাদ যায়নি। দুটি হোটেল এরই মধ্যে একে অন্যের গায়ে ঢলে পড়েছে। কোনো এক অজানা কারণে স্থানীয় খামার থেকে ক্রমাগত পানি বেরিয়ে আসছে।
বাড়তি ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো ভেঙে ফেলার তোড়জোড় শুরু হয়েছে এরই মধ্যে। প্রায় ৮০টি পরিবারকে নিজ ঘর থেকে নিকটবর্তী বিদ্যালয়, হোটেল এবং আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
দুর্যোগ সামাল দিতে একাধিক উদ্ধারকারী দল এবং হেলিকপ্টার সেখানে পৌঁছেছে। উত্তরাখন্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুশকার সিং ধামি বলেছেন, ‘জীবন বাঁচানো আমাদের মূল লক্ষ্য’।
কিন্তু ওই শহরের মানুষের জীবনপ্রণালির কারণে এটি বাস্তবায়ন করাটা অনেকটাই দুরূহ। যেমন ৫২ বছর বয়সী দিনমজুর দুর্গা প্রসাদ সাকলানির বাড়ি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তারা তার ১৪ সদস্যের পরিবারকে স্থানীয় এক হোটেলে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু স্থান সংকুলান সমস্যার কারণে আবারও সে ফিরে এসেছে নিজ বাড়িতেই। কাঠের মোটা গুঁড়ি দিয়ে দেবে যেতে থাকা ঘর বাঁচানোর চেষ্টায় ব্যস্ত এখন তার পরিবার।
কেন দেবে যাচ্ছে যোশীমঠ
যোশীমঠের এ সংকট নিয়ে অবাক হওয়ার মতো কিছু নেই। বহু আগে থেকেই এটি অনুমিত ছিল। সতর্কবার্তাও ছিল এ নিয়ে। ১০০ বছরেরও বেশি সময় আগে ভূমিকম্প থেকে সৃষ্ট ভূমিধসের মাটির ওপর গড়ে উঠেছে শহরটি। এখনও এর অবস্থান ভূকম্পন প্রবল এলাকাতেই।
এভাবে মাটি দেবে যাওয়া শুরু হতে পারে নানাবিধ কারণে। এসবের মধ্যে রয়েছে পৃথিবীর ক্রাস্টের (পাথরের বাইরে পাতলা বহিরাবরণ) নড়াচড়া। এটি ভূমিকম্পের কারণে হতে পারে।
সিংকহোল– তৈরি হলেও এ রকমটি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ভূগর্ভের অভ্যন্তরে প্রবাহিত পানির মাত্রা নিচে নেমে গিয়ে ওপরের পৃষ্ঠ স্তরকে ধসিয়ে দেয়।
মাটি দেবে যাওয়ার ঘটনায় ভূমিকা রাখতে পারে মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডও। যেমন মানুষ যদি অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করতে শুরু করে, তাহলেও সিংকহোল তৈরি হতে পারে।
ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভের তথ্যানুসারে, বিশ্বের ৮০ শতাংশেরও বেশি ভূমি দেবে যাওয়ার ঘটনা ঘটে বেশি পরিমাণে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের কারণে।
আপাতত যোশীমঠের এ কাণ্ডের জন্য দায়ী করা হচ্ছে মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডকেই। কয়েক দশক ধরে শহরটিতে কৃষিকাজের জন্য ভূগর্ভ থেকে পানি উত্তোলন করা হয়েছে। এতে করে মটির নিচের বালু ও পাথর দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
১৯৭৬ সালের শুরুর দিকেই সরকারি এক গবেষণায় বলা হয়, যোশীমঠ দেবে যাচ্ছে। এটি প্রতিহতে শহরে নির্মাণকাজে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কথাও বলা হয়। আরও বলা হয়, পর্যাপ্ত নিষ্কাশণব্যবস্থার অভাবে ভূমিধসের পথে হাঁটছে যোশীমঠ।
স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে দেওয়া হয়, ‘শহর গড়ার জন্য উপযুক্ত নয় যোশীমঠ।’
কিন্তু কেউ শোনেনি সে কথা। কয়েক দশক ধরে হাজারো তীর্থযাত্রী শহরে ভিড় জমিয়েছে। পর্বতারোহী পর্যটকরাও দলে দলে এসেছে। অনেক পানিবিদ্যুৎ প্রকল্পও গড়ে উঠেছে।
রাস্তা তৈরি হয়েছে, স্থাপনা গড়া হয়েছে। এককথায় যা যা মানা করা হয়েছিল তার সবই করেছে যোশীমঠ।