প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০২৩ ২২:৩৭ পিএম
আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০২৩ ২৩:০১ পিএম
রাজধানী ব্রাসিলিয়ার রবিবারের ঘটনা এখনও হজম করে উঠতে পারছে না অনেক ব্রাজিলিয়ান। তবে তাণ্ডবের এ কাণ্ড সহসাই ঘটেনি। এর আভাস মিলছিল বহু আগে থেকেই। বিশেষ করে সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে।
নিজের মেয়াদে বলসোনারো একাধিকবার ব্রাজিলের রাষ্ট্রীয় কাঠামোগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। হরহামেশাই সুপ্রিম কোর্টকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। দেশের সর্বোচ্চ আদালত রাজনৈতিকভাবে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে বলেও অভিযোগ ছুড়েছেন।
এমনকি গত বছরের অক্টোবরে জাতীয় নির্বাচনের আগে ভোটাভুটির প্রক্রিয়াকেও রেহাই দেননি। কোনো প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও ভোটিং ব্যবস্থায় জোচ্চুরি রয়েছে বলে আঙুল তোলেন তিনি।
ফলে মোটাদাগে বলসোনারো হয়তো এ দাঙ্গা বা হামলার পরিকল্পনা করেননি। কিন্তু সাবেক প্রেসিডেন্ট কোনোভাবেই এ থেকে নিজেকে আলাদা করতে পারেন না বলেই অভিমত বিশেষজ্ঞদের। কারণ তিনি যা যা বলেছিলেন, সেগুলোর প্রত্যক্ষ প্রভাব দেখা গেছে হামলার ঘটনায়। তার সমর্থকরা বেছে বেছে হামলা চালিয়েছে কংগ্রেস ভবন, সুপ্রিম কোর্ট এবং প্রেসিডেন্সিয়াল প্রাসাদে।
বিবিসি বলছে, নির্বাচনে হারের পর একদম নীরব হয়ে গিয়েছিলেন বলসোনারো। জনসম্মুখে পরাজয় স্বীকার করে নেননি। উল্টো বিজয়ী প্রার্থী লুইজ ইনাসিও লুলা দ্য সিলভার হাতে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা না বুঝিয়ে দিয়ে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায়। ফলে তার অনুগত সমর্থকদের ক্ষোভ আর প্রশমিত হয়নি।
কয়েক মাস ধরেই ব্রাজিলে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছিল। বলসোনারোর অনুগত সমর্থকরা আস্তানা গাড়ছিল দেশটির সামরিক বাহিনীর কার্যালয়গুলোর সামনে। সরাসরি সেনাবাহিনীকেই হস্তক্ষেপের জন্য অনুরোধ জানাচ্ছিল তারা।
গত বছরের ডিসেম্বরে এসে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায়। ব্রাসিলিয়ায় কেন্দ্রীয় পুলিশের প্রধান কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করে বলসোনারো সমর্থকরা। এ ছাড়াও বামপন্থি নেতা লুলার ক্ষমতাগ্রহণের আগে বোমা হামলার পরিকল্পনায় জড়িত থাকার দায়ে গ্রেপ্তার করা হয় আরেক সমর্থককে।
বিবিসির প্রতিবেদন বলছে, রবিবার যা ঘটেছে, তা আদতে ঘটার অপেক্ষায় ছিল মাত্র। অনেকেই আগে থেকেই আঁচ করেছিল এ ব্যাপারে।
কী নিয়ে এত ক্ষুব্ধ বলসোনারো সমর্থকরা
বিবিসির তথ্যানুসারে, বলসোনারো সমর্থকরা যতটা নিজেদের নেতার পরাজয় নিয়ে ক্ষুব্ধ, ঠিক ততটা লুলাকে নিয়েও ক্ষিপ্ত। তাদের দৃষ্টিতে বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুলা স্রেফ একজন দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি, যাকে ২০১৭ সালে দুর্নীতির দায়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল এবং ১৮ মাস এ অভিযোগে তার জেল খাটতে হয়েছিল।
বলসোনারো সমর্থকরা মনে করে, এ ধরনের ব্যক্তিকে কারগারেই মানায়, প্রেসিডেন্সিয়াল প্রাসাদে নয়। এ ছাড়াও লুলাকে তারা কমিউনিস্ট বলে মনে করে। তাদের ধারণা, এ ব্যক্তি ক্ষমতা পেলে ভেনিজুয়েলা বা কিউবার মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে ব্রাজিলে।
বলসোনারো সমর্থকদের এ ধারণা থেকে সরিয়ে আনার কোনো উপায় নেই বলে উল্লেখ করেছে বিবিসি। তাদের দৃষ্টিতে তারাও গণতন্ত্রের জন্যই লড়ছে।
ট্রাম্পের প্রভাব
ব্রাসিলিয়ার ঘটনায় ক্যাপিটল হিল দাঙ্গার মিল রয়েছে অনেক দিক থেকেই। দুই বছর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থকরা যখন ক্যাপিটল হিলে আক্রমণ করে বসে, তখন তারাও সেটিকে গণতন্ত্রের লড়াই হিসেবে দেখেছিল। সেবারের মতো ব্রাজিলের ঘটনার পেছনেও ট্রাম্পের কট্টর ডানপন্থি সমর্থকদের ভূমিকা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যেমন, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠভাজন এবং কট্টর ডান ঘরানার রাজনীতির সমর্থক স্টিভ ব্যানন গত বছরের অক্টোবরেই নিজের পডকাস্টে ব্রাজিলের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। প্রথম দফার ভোটের পর তিনি মন্তব্য করেন, গোটা বিষয়টিই সন্দেহজনক।
তখনও ব্রাজিলের নির্বাচনের ফলাফল জানার কোনো উপায় ছিল না। ব্যালটের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছিল দুই প্রার্থীর মধ্যে। কিন্তু সে কারণে বিন্দুমাত্র দমে যাননি ব্যানন। দূরে বসে পডকাস্টের মাধ্যমে সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে নির্বাচনী জালিয়াতির ভিত্তিহীন প্রচারণা চালিয়েছেন তিনি।
তার সেসব পডকাস্ট এপিসোড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার হয়েছে। রীতিমতো হ্যাশট্যাগ ব্রাজিলিয়ানস্প্রিং ব্যবহার করে হয়েছে সেগুলোর সঙ্গে।
বিবিসির প্রতিবেদন বলছে, একটা পর্যায়ে ব্রাজিলের নির্বাচনের ফলাফল সামনে এলো। বলসোনারো নিজেও সে ফলাফল অনেকটাই মেনে নিলেন। কিন্তু তারপরও ব্যাননকে থামতে দেখা গেল না।
ট্রাম্পের ক্ষেত্রে নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে ব্যানন যা করেছিলেন, তারই পুনরাবৃত্তি করলেন তিনি। নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলতে থাকলেন গোটা বিষয়টিকে। তার সঙ্গে যোগ দিলেন অন্য ট্রাম্প সমর্থকরাও।
রবিবারের দাঙ্গার পরও ব্যাননকে দেখা গেল একই রূপে। এমনকি ব্রাসিলিয়ার ভাঙচুরের ভিডিও যখন সামাজিকমাধ্যমে ঘুরপাক খাচ্ছে, তখন তিনি সামাজিকমাধ্যম গেটার-এ মন্তব্য করলেন, লুলা নির্বাচনে জালিয়াতি করেছে… ব্রাজিলিয়ানরা এটি জানে। এ ছাড়াও যারা ব্রাজিলের কংগ্রেস ভবনে ভাঙচুর চালাচ্ছে, তাদের ব্যানন অভিহিত করলেন মুক্তিকামী হিসেবে।
আরেক ট্রাম্প সমর্থক ও কট্টর ডানপন্থি আলি আলেক্সান্ডার বলসোনারো সমর্থকদের উদ্দেশে সামাজিকমাধ্যমে লিখলেন, যা যা প্রয়োজন করো। পাশাপাশি দাবি করলেন, ব্রাজিলের ভেতরে যোগসাজশ রয়েছে তার।
সব মিলিয়ে গোটা বিষয়টিকে বলসোনারো সমর্থকরা দাঁড় করল অস্তিত্বের সংকট হিসেবে। দাবি করল, কমিউনিস্ট নিয়ন্ত্রণের হাত থেকে দেশ বাঁচাতে নেমেছে তারা। ঠিক একই ঘরানার কথাবার্তা, যা ব্যবহার হতে দেখা গিয়েছিল দুই বছর আগে ক্যাপিটল হিল হামলার সময়।
ক্যাপিটল হিল হামলার ঘটনার তদন্ত কমিটিতে রয়েছেন মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের ডেমোক্র্যাট সদস্য জেমি রাসকিন। তিনিও এক টুইট বার্তায় ব্রাজিলের বিক্ষোভকারীদের ৬ জানুয়ারির ট্রাম্প দাঙ্গাকারীদের মতো ফ্যাসিস্ট হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ভূমিকা রেখেছে টুইটারও
টুইটারেরও কিছুটা ভূমিকা ছিল গোটা পরিস্থিতিতে। বিবিসির এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে বিষয়টি।
নির্বাচন-সম্পর্কিত গুজব ছড়ানোর দায়ে বেশ কিছু টুইটার অ্যাকাউন্ট নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু টুইটার কেনার পর ইলন মাস্ক সেগুলো আবার প্ল্যাটফর্মে ফিরিয়ে আনেন। রবিবার ব্রাজিলের ঘটনার সময় সক্রিয় ছিল সেগুলো।
এ ছাড়াও মাস্ক নিজেও অতীতে বলেছেন, টুইটারের ব্রাজিলীয় কর্মীরা রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট। তবে সে সময় বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।
অ্যামাজন ও লুলার অবস্থান
গোটা ঘটনায় ভূমিকা রেখেছে অ্যামাজন বনাঞ্চলও। ব্রাজিলের নতুন প্রেসিডেন্ট লুলা মাত্র এক সপ্তাহ আগেই নতুন পরিবেশ কর্মসূচি হাতে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন, যা অনেক দিক থেকেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় পরিবেশগত পরিকল্পনাগুলোর একটি।
তিনি এবং তার পরিবেশমন্ত্রী মারিনা সিলভা অ্যামাজনের বন উজাড় শূন্যে নামিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছেন এবং বিভিন্ন খাতে আদিবাসীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির কথা বলেছেন।
গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন বলছে, সবদিক থেকেই এ বিষয়গুলো ঐতিহাসিক পরিবর্তন। কারণ ৫০০ বছর আগে ইউরোপীয়দের ব্রাজিলে আসার সময় থেকেই দেশটির অর্থনীতি গড়ে উঠেছে বনাঞ্চল ধ্বংসের ওপর ভিত্তি করে এবং আদি বাসিন্দাদের চাপের মুখে রেখে।
এ কারণে বামপন্থি লুলার পরিবর্তনগুলোকে হুমকি হিসেবে নেন ব্রাজিলের কিছু অভিজাত। যাদের বেশিরভাগ শ্বেতাঙ্গ এবং বন উজাড়ের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িত।
বিষয়টি যে লুলা নিজেও জানেন, তা-ও স্পষ্ট হয়ে গেছে তার হামলার পরবর্তী বক্তব্যে। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট সেখানে বলেছেন, ধ্বংসলীলার সঙ্গে খনি শ্রমিক, গাছ কর্তনকারী এবং দুষ্ট কৃষি ব্যবসায়ীদের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে।
কোনো অভিযোগই এখনও প্রমাণিত হয়নি। কিন্তু হামলার ঘটনায় যে এ বিষয়টি কিছুটা হলেও ভূমিকা রেখেছে, তা সহজেই অনুমেয়।