প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০২৩ ১৯:৫৬ পিএম
আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০২৩ ২০:১৩ পিএম
বিক্ষোভকারীদের ফাঁসির প্রতিবাদে লন্ডনে গণজমায়েত। ৮ জানুয়ারি। ছবি : সংগৃহীত
ইরানে পুলিশি হেফাজতে মাহসা আমিনির মৃত্যুর প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলন ইতোমধ্যে সর্বাত্মক সরকারবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। চার মাস পূর্ণ হতে চললেও আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ আনতে পারেনি সরকার। এ অবস্থায় আন্দোলনকারীদের ফাঁসি কার্যকর শুরু হয়েছে। আন্দোলন করার দায়ে বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি দেওয়াকে ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস’ বলে বিবৃতি দিয়েছে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনার (ওএচইসিএইচআর) ভলকার তুর্ক।
মঙ্গলবার (১০ জানুয়ারি) এক বিবৃতিতে ভলকার তুর্ক বলেন, ‘সভায় বা বিক্ষোভে অংশ নেওয়া মানুষের মৌলিক অধিকার। এসব কিছুর কারণে বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি দিচ্ছে ইরান। এর মধ্যে দিয়ে দেশটি নিজেদের বিচারব্যবস্থার সঙ্গে অস্ত্রকে যুক্ত করছে। ফলে তা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের পর্যায়ে চলে যাচ্ছে।’
আলজাজিরার ও আল-মনিটরের প্রতিবেদনে বলা হয়, চলমান আন্দোলনে অংশ নিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর দুই সদস্যকে হত্যার দায়ে শনিবার (৭ জানুয়ারি) আরও দুজন বিক্ষোভকারীর ফাঁসি কার্যকর করেছে ইরান। তার আগে আরও দুজনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
সরকারি তথ্যমতে, চলমান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ১৭ ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ছয়জন রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবেন। বাকিরা পারবেন না।
তবে, নরওয়ের রাজধানী অসলোভিত্তিক ইরান হিউম্যান রাইটসের (আইএচইআর) তথ্যমতে, সোমবার (৯ জানুয়ারি) পর্যন্ত অন্তত ১০৯ ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। চলতি আন্দোলনে নিহত হয়েছেন অন্তত ৪৮১ জন বিক্ষোভকারী। নিহতদের ৬৪ জন শিশু। একই সময়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১৫ হাজারের বেশি। আর বিক্ষোভকারীদের হামলায় নিহত হয়েছেন নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর ৬৬ সদস্য।
রাফসানজানির মেয়েকে জেল
বিক্ষোভ নিয়ে প্রপাগান্ডা চালানো ও ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগে সোমবার মানবাধিকারকর্মী ফয়েজ হাশেমিকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে ইরানের একটি আদালত। ৬০ বছর বয়সি ফয়েজ হাশেমি দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট (১৯৮৯-৯৭) আকবর হাশেমি রাফসানজানির কন্যা।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর তেহরান থেকে ফয়েজ হাশেমিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ইরানের নিরাপত্তাকর্মীদের নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছেন। বেআইনি বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন। তার কাজকর্মে আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হচ্ছে।
তবে প্রাথমিক সাজার বিরুদ্ধে ফয়েজ হাশেমি আপিল করতে পারবেন বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবী নেদা শ্যামস।
আন্দোলনের সারসংক্ষেপ
গত ১৩ সেপ্টেম্বর তেহরান থেকে মাহসা আমিনি নামের এক কুর্দি তরুণীকে গ্রেপ্তার করে ইরানের নৈতিকতাবিষয়ক পুলিশ। যথাযথভাবে হিজাব না পরার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রেপ্তারের পরপরই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তিনি কোমায় চলে যান।
১৬ সেপ্টেম্বর আমিনিকে মৃত ঘোষণা করে পুলিশ। এরপর ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ইরানের প্রধান শহরগুলোয় বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে তা দাবানলের মতো ইরানের সব প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে।
স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণীরা মাথার স্কার্ফ খুলে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। রাস্তায় নেমে চুল কেটে, স্লোগানে স্লোগানে বাধ্যতামূলক হিজাবের প্রতিবাদ জানায়। আন্দোলন বড় হতে থাকে, ছড়িয়ে পড়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন মহলে। যুক্ত হতে থাকে নানা দাবি।
প্রবাসী ইরানিরাও নানাভাবে আন্দোলনের প্রতি সমর্থন ও সংহতি প্রকাশ করেন। নির্মমভাবে বিক্ষোভ দমনের অভিযোগে, ইরানের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও সংস্থার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। গত মাসে ইরানের বিক্ষোভে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল।