প্রবা ডেস্ক
প্রকাশ : ০৫ জানুয়ারি ২০২৩ ১৬:৩৮ পিএম
আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০২৩ ১৭:০১ পিএম
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লা আলি খামেনি। ছবি: সংগৃহীত
ফ্রান্সের ব্যঙ্গাত্মক সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন শার্লি এবদো সম্প্রতি ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও আরও কিছু ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতার কার্টুন প্রকাশ করেছে। এসব কার্টুন অবমাননাকর মন্তব্য করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে তেহরান। ডেকে পাঠিয়েছে ইরানে নিয়োজিত ফরাসি রাষ্ট্রদূত নিকোলাস রোচেকে।
বুধবার (৪ জানুয়ারি) ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেন আমির-আব্দুল্লাহিয়ান এক টুইটে লেখেন, ‘একটি ফরাসি প্রকাশনী ইরানের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতাদের অবমাননাকর ও অশোভন কিছু কার্টুন প্রকাশ করেছে। যারা এটা করেছে, তাদের ফল ভোগ করতে হবে। এর কঠিন জবাব দেওয়া হবে। ফরাসি সরকারকে আমরা সীমা অতিক্রম করতে দেব না। তারা যে পথ বেছে নিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে ভুল পথ।’ তবে ইরান কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে তা জানাননি ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর টুইটের পর বুধবার ইরানে নিয়োজিত ফরাসি রাষ্ট্রদূত নিকোলাস রোচেকে তলব করে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র নাসের কানানি বলেন, ‘বাকস্বাধীনতার অজুহাতে অন্য মুসলিম দেশ বা জাতির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অপমান করার কোনো অধিকার ফ্রান্সের নেই। একটি ফরাসি প্রকাশনী অগ্রহণযোগ্য যে আচরণ করেছে, ফরাসি সরকারের কাছে তার ব্যাখ্যা চায় ইরান। আশা করি, ফরাসি সরকার ক্ষতিপূরণমূলক পদক্ষেপ নেবে।’
শার্লি এবদোর অবস্থান
বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শার্লি এবদো জানায়, ইরানে কুর্দি তরুণী মাহসা আমিনির মৃত্যুতে যে আন্দোলন শুরু হয়, তা ইতোমধ্যে তিন মাস পার করেছে। সরকারের দমন-পীড়ন সত্ত্বেও বিভিন্ন মাত্রায় আন্দোলন এখনও অব্যাহত রয়েছে। আন্দোলন সংশ্লিষ্ট পাঁচ শতাধিক সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছে ইরানের বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনী। চলমান এ আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানাতেই আমরা ইরানের কিছু নেতাদের কার্টুন প্রকাশ করেছি।
শার্লি এবদোর আলোচিত সংখ্যাটার সম্পাদকীয়তে লেখা হয়, ইরানের নারী-পুরুষ তাদের স্বাধীনতা রক্ষায় ধর্মতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছেন। এজন্য তাদের জীবন বিপন্ন হচ্ছে। সংগ্রামরত এসব মানুষের প্রতি সংহতি প্রকাশ করতেই আমরা ইরানি নেতাদের কিছু কার্টুন প্রকাশ করেছি। এসব কার্টুনে ধর্মতন্ত্রের কর্তৃত্বকে যথাযথভাবে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।
ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহের যে সংখ্যায় ইরানি নেতাদের কার্টুন প্রকাশ করা হয়েছে, সে উপলক্ষে একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করে বিতর্কিত ওই ম্যাগাজিন।
ম্যাগাজিনটি ২০১৫ সালে হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর কিছু কার্টুন প্রকাশ করে চরম সমালোচিত হয়। ওইসব কার্টুন প্রকাশের কিছু দিন পর শার্লি এবদোর প্যারিসের কার্যালয়ে হামলা হয়। এতে ম্যাগাজিনটির কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাসহ ১২ জন নিহত হন। আহত হন আরও ১১ জন।
৭ জানুয়ারি শার্লির কার্যালয়ে হামলার আট বছর পূর্ণ হবে। এই বর্ষপূর্তি উপলক্ষেই মূলত সর্বশেষ সংখ্যাটা করা হয়েছে। এতে ইরানি নেতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের আরও অনেকগুলো কার্টুন রয়েছে।
চলমান আন্দোলন
গত ১৩ সেপ্টেম্বর তেহরান থেকে মাহসা আমিনি নামের এক কুর্দি তরুণীকে গ্রেপ্তার করে ইরানের নৈতিকতাবিষয়ক পুলিশ। যথাযথভাবে হিজাব না পরার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পরপরই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তিনি কোমায় চলে যান।
১৬ সেপ্টেম্বর আমিনিকে মৃত ঘোষণা করে পুলিশ। এরপর ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ইরানের প্রধান শহরগুলোয় বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে তা দাবানলের মতো ইরানের সব প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে।
স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণীরা মাথার স্কার্ফ খুলে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। রাস্তায় নেমে চুল কেটে, স্লোগানে স্লোগানে বাধ্যতামূলক হিজাবের প্রতিবাদ জানায়। আন্দোলন বড় হতে থাকে, ছড়িয়ে পড়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন মহলে। যুক্ত হতে থাকে নানান দাবি।
প্রবাসী ইরানিরাও নানাভাবে আন্দোলনের প্রতি সমর্থন ও সংহতি প্রকাশ করেন। নির্মমভাবে বিক্ষোভ দমনের অভিযোগে ইরানের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও সংস্থার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। গত মাসে ইরানের বিক্ষোভে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল।
ইরানের বিকল্প সংবাদসংস্থা হারানা নিউজের তথ্য মতে, আন্দোলনে গত বৃহস্পতিবার (২২ ডিসেম্বর) পর্যন্ত ইরানের বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে অন্তত ৫০৭ বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। নিহতদের ৬৯ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক। আটক হয়েছে ১৫ হাজারের বেশি। আটকদের বিচার শুরু করেছে সরকার। ইতোমধ্যে দুজনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। আর বিক্ষোভকারীদের হামলায় নিহত হয়েছেন নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর ৬৬ সদস্য।