প্রবা ডেস্ক
প্রকাশ : ০৪ জানুয়ারি ২০২৩ ১৮:২০ পিএম
আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০২৩ ১৫:৩৩ পিএম
উগ্রজাতীয়তাবাদী বৌদ্ধ ভিক্ষু উইরাথুকে জাতীয় পুরস্কার ও উপাধিতে ভূষিত করেন মিয়ানমারের সামরিক শাসক জেনারেল মিন অং হ্লাইং। ৩ জানুয়ারি রাজধানী নেপিদোতে। ছবি: সংগৃহীত
মিয়ানমার জান্তা সরকার মুসলিমবিদ্বেষী ও উগ্রজাতীয়তাবাদী এক বৌদ্ধ ভিক্ষুকে জাতীয় পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত করেছে। ২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর পরিচালিত ‘গণহত্যায়’ উইরাথু নামের ওই ভিক্ষু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
মঙ্গলবার (৩ জানুয়ারি) ব্রিটিশ ঔপনিবেশ থেকে মুক্তির ৭৫তম দিবস উপলক্ষে উইরাথুসহ আরও কয়েকশ ব্যক্তিকে সম্মানিত করেছে মিয়ানমার জান্তা সরকার। একই দিন সাত হাজারের বেশি বন্দিকেও মুক্তির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (৪ জানুয়ারি) ৭৫তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করে মিয়ানমার। দিবসটির আগের দিন মঙ্গলবার রাজধানী নেপিদোতে এক অনুষ্ঠানে সামরিক শাসক জেনারেল মিন অং হ্লাইং উইরাথুসহ কয়েকশ ব্যক্তিকে ‘থিরি প্যানচি’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এটি দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক জাতীয় পুরস্কার। মিয়ানমারের সার্বিক কল্যাণে অসাধারণ কাজ করার স্বীকৃতিস্বরূপ উইরাথুকে ওই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে মুসলিমবিদ্বেষী প্রচারণা চালিয়ে আসছেন উইরাথু। বিশেষ করে, রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিয়ে ঘৃণামূলক প্রচারণার জন্য তিনি বেশ কুখ্যাত। ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টাইম ম্যাগাজিন উইরাথুকে নিয়ে কাভার স্টোরি করে। এতে তাকে ‘দ্য পেস অব বুডডিস্ট টেরর’ তকমা দেওয়া হয়।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, ২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর যে গণনিপীড়ন হয়, তার মাঠ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন উইরাথু। জ্বালাও-পোড়াও ও ‘গণহত্যার’ মুখে রাখাইন ত্যাগ করে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অশ্রয় নেয়।
এদিকে বুধবারের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আগের দিন মঙ্গলবার ৭ হাজার ১২ জন বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে জান্তা সরকার। তবে সাধারণ ক্ষমায় যারা মুক্তি পেতে যাচ্ছেন, তারা কি সবাই রাজনৈতিক বন্দি না সাধারণ কয়েদি, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ভাষণ দেন সামরিক শাসক জেনারেল মিন অং হ্লাইং। এতে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশ বর্তমানের নানা ধরনের চাপ, সমালোচনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই কঠিন সময়ে কিছু আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক দেশ, সংগঠন ও ব্যক্তি আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, আমরা তাদের ধন্যবাদ জানাতে চাই।’
ইতিবাচক সহযোগিতা করায় জান্তার ধন্যবাদের তালিকায় চীন, ভারত, থাইল্যান্ড ও লাওসের পাশাপাশি বাংলাদেশের নামও রয়েছে।
২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি অং সান সু চি ও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট উইন মিন্টসহ মিয়ানমারের শীর্ষ রাজনীতিবিদদের গ্রেপ্তার করে দেশটির সেনাবাহিনী। ঘোষণা করে বছরব্যাপী জরুরি অবস্থা। আগের বছরের ডিসেম্বরে সম্পন্ন জাতীয় নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানায় সেনাবাহিনী। কিন্তু নিজেদের দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি তারা। অথচ ওই নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়েছিল সু চির দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি)।
গত ২২ ডিসেম্বর জাতিসংঘের ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদ মিয়ানমার নিয়ে একটি প্রস্তাব পাস করেছে। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের সদস্য হওয়ার পর মিয়ানমার নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের এটাই প্রথম প্রস্তাব। প্রস্তাবে সব ধরনের সহিংসতা বন্ধ ও রাজনৈতিকবন্দিদের মুক্তি দিতে জান্তা সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রস্তাবটি উত্থাপনের উদ্যোগ নেয় যুক্তরাজ্য। প্রস্তাবে তিন গুরুত্বপূর্ণ দেশ ভারত, চীন ও রাশিয়া ভোটদানে বিরত থাকে।
সামরিক অভ্যুত্থানের পরপরই মিয়ানমারের শহরগুলোতে জান্তাবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভ শহর থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। ক্রমশ কঠোর থেকে কঠোর হাতে বিক্ষোভ দমন শুরু করে সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা।
মিয়ানমার বিক্ষোভের তথ্যসংগ্রহকারী প্ল্যাটফর্ম অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনার্স (এএপিপি) গত মাসে জানায়, বিক্ষোভ শুরুর পর জান্তার বিভিন্ন বাহিনীর হাতে অন্তত ২ হাজার ৪৬৫ সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন তার দ্বিগুণ। আটক হয়েছেন ১৬ হাজারের বেশি, যাদের প্রায় ৩ হাজারকে সম্প্রতি সাধারণ মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
জান্তাবিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠী ইতোমধ্যে জাতীয় ঐক্য সরকার (নাগ) গঠন করেছে। তৈরি করেছে গণপ্রতিরক্ষা বাহিনী (পিডিএফ)। দেশটির প্রায় ২০টির মতো পুরোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে মিলে জান্তাবিরোধী জনযুদ্ধ করছে পিডিএফ। তাদের মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে জান্তা সরকার।