আল জাজিরার বিশ্লেষণ
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার জেরে ইরানে নতুন করে বিমান হামলা চালানোর ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার জেরে ইরানে নতুন করে বিমান হামলা চালানোর ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হরমুজ দিয়ে চলাচলকারী সাইপ্রাসের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ এমভি জিএফএস গ্যালাক্সিতে হামলার পর তারা এ সপ্তাহে তৃতীয় দফায় ইরানে হামলা চালায়।
অন্যদিকে হামলার জবাবে ইরান আবারও হরমুজ বন্ধ করে দিয়েছে। দেশটির ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত হরমুজ বন্ধ থাকবে।
হামলার জবাবে জর্ডান, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান।
পাল্টাপাল্টি হামলায় দুই দেশের মধ্যকার সমঝোতা চুক্তি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। এই অবস্থায় যুদ্ধ আবার সর্বাত্মক আকার ধারণ করতে যাচ্ছে।
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বার্তা সংস্থা আল জাজিরা ইরান যুদ্ধ নিয়ে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
তাতে বলা হয়েছে, যুদ্ধে এ মুহূর্তে কৌশলগত দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরান বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
কৌশলগত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান দ্য কিলওয়েন গ্রুপের চেয়ারম্যান হারলান উলম্যান আল জাজিরাকে বলেছেন, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রকে কৌশলগতভাবে কঠিন অবস্থায় ফেলেছে।
সাবেক এই আমেরিকান নৌ-কর্মকর্তা বলেন, একেবারে শুরু থেকেই এটা অস্পষ্ট ছিল যে, এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত লক্ষ্য কী ছিল। অনেকেই প্রশ্ন করছেন, ইরান যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্র আসলে কী অর্জন করতে চেয়েছিল?
উলম্যানের মতে, সামরিক শক্তি অনেক বেশি হলেও তাকে কৌশলগত সাফল্যে পরিণত করার ক্ষেত্রে কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ক্ষমতা অনেক শক্তিশালী। কিন্তু তারা কি ইরানের ওপর এত চাপ প্রয়োগ করতে পারবে যে, ইরান তার নীতি বা মনোভাব বদলে ফেলবে? আমার মনে হয়, সেটা সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে কৌশলগতভাবে ইরানই তুলনামূলক ভালো অবস্থানে আছে। কারণ ইরানকে শুধু এটুকু বলতে হবে যে, আমরা হরমুজ বন্ধ করে দেব। আমরা উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর হামলা চালাব। এতেই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে মূলত আকাশপথে হামলা চালানো ছাড়া তেমন কোনো কার্যকর উপায় নেই। কিন্তু এতে এমন কোনো ফল পাওয়া যাচ্ছে না, যা দুই পক্ষের কারও জন্যই কল্যাণকর।
উলম্যান সতর্ক করে বলেন, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তার মতে, বিশ্ব অর্থনীতি এই পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রস্তুত নয়। বিশ্বে ব্যবহৃত মোট জ্বালানির প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ দিয়ে পরিবহন করা হয়। যদি এই পথ এক দিন, এক সপ্তাহ, এক মাস বা আরো দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর ভয়াবহ প্রভাব পড়বে।
ইরান অনুরোধ জানায়নি
ইরানের অনুরোধে আলোচনা চালিয়ে যেতে সায় দিয়েছেন বলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে দাবি করেছেন, ইরান তা নাকচ করে দিয়েছে।
দেশটির দাবি, তেহরান ওয়াশিংটনের কাছে কোনো আলোচনা চায়নি। তবে যুদ্ধবিরতির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে কাতারের এক মধ্যস্থতাকারী নিজ উদ্যোগে ইরান সফর করেছেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই অভিযোগ করেন, নতুন সামরিক হামলা, অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং ইরানের তেল রপ্তানির লাইসেন্স বাতিলের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ধারাবাহিকভাবে যুদ্ধবিরতির সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘন করছে। ‘প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে প্রতিশ্রুতি’Ñএই নীতিতেই ইরান অটল থাকবে। যুক্তরাষ্ট্র সমপর্যায়ের পদক্ষেপ না নিলে তেহরানও কোনো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবে না। কাতারের মধ্যস্থতাকারী তেহরানের অনুরোধে নয়, নিজ উদ্যোগে ইরান সফরের আবেদন করেন। মাশহাদে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কাতারের প্রতিনিধিদের কাছে ইরান তার অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।
ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ইরানের হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধবিরতি কার্যত শেষ হয়ে গেছে।
তবে তিনি একই সঙ্গে বলেন, আলোচনা অব্যাহত থাকবে এবং মধ্যস্থতাকারীরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছেন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের জন্য দায়ী করেছেন।