আল জাজিরার বিশ্লেষণ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবারও উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ায় দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক টিকবে কি না, তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবারও উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ায় দুই দেশের শান্তি উদ্যোগ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
গত মাসে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে যে কূটনৈতিক অগ্রগতির আশা তৈরি হয়েছিল, সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় তা অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।
এর ফলে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) টিকবে কি না, তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
আমেরিকান সংবাদ মাধ্যম সিএনএনকে বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ওয়াশিংটন এখনও কূটনৈতিক পথকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তবে পরিস্থিতি প্রয়োজন হলে সামরিক পদক্ষেপ নিতেও প্রস্তুত রয়েছে মার্কিন বাহিনী। একই দিনে আরব সাগরে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনে যুদ্ধবিমানগুলোকে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে এবং পাইলটদের মহড়া চালাতে দেখা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের এই অবস্থানের ইঙ্গিত পরে আরও স্পষ্ট করেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে শুক্রবার তিনি লেখেন, ইরান আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র তাতে সম্মতি দিয়েছে।
তবে একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ওয়াশিংটন তেহরানকে জানিয়ে দিয়েছে যে আগের যুদ্ধবিরতির অধ্যায় শেষ হয়েছে।
চলমান উত্তেজনার মধ্যেও সমঝোতা স্মারকটি পুরোপুরি ভেঙে পড়বে বলে মনে করছেন না বিশ্লেষকরা।
ব্রিটিশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান রুসির জ্যেষ্ঠ গবেষক মাইকেল স্টিফেনস আল জাজিরাকে বলেন, যথাযথ কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হলে এই সমঝোতা এখনও কার্যকর রাখা সম্ভব। সেজন্য উভয় পক্ষকেই উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা চালাতে হবে।
স্টিফেনসের মতে, বর্তমান সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো— কোনো পক্ষই অপর পক্ষের অবস্থান বা যুক্তি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে না। তার ভাষায়, অচলাবস্থা কাটিয়ে কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে হলে কোনো এক পক্ষকে উদ্যোগী হয়ে সমাধানের পথ খুলতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সমঝোতা স্মারকের কাঠামো ও শর্তাবলির কারণেই বর্তমান সংঘাত অনেকটাই অনুমিত ছিল। তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চুক্তির শুরুতে ইরান কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা নিশ্চিত করেছিল। পরে যুক্তরাষ্ট্র সেসব সুবিধার কিছু অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। সংকটের মধ্যেও একটি ইতিবাচক দিকের কথা উল্লেখ করেন স্টিফেনস।
তার পর্যবেক্ষণ, এত উত্তেজনা সত্ত্বেও বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা যায়নি।
স্টিফেনসের ভাষ্য, তেলের বাজারে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া না হওয়ার অর্থ হলো বিনিয়োগকারী ও বাজারসংশ্লিষ্টরা এখনও বিশ্বাস করছেন, কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ রয়েছে। তাদের ধারণা, পরিস্থিতি হয়তো দীর্ঘমেয়াদি পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাতে গড়াবে না।
গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি সই করে। সেই চুক্তির অংশ হিসেবে ইরান বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপদে চলাচলের ব্যবস্থা করতে রাজি হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা সিবিএস নিউজকে বলেছেন, কিছু কঠোরপন্থী মানুষ ‘ভুল পথে’ গিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজে গুলি চালিয়ে আলোচনা বিফলের চেষ্টা করছে। একজন কর্মকর্তার ভাষ্য, ইরানিরা আবার আলোচনায় ফিরে এসে বলেছে, “আমরা ভুল করে ফেলেছি। আসুন আলোচনা চালিয়ে যাই।”
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা শুক্রবার ব্রিফিংয়ে বলেছেন, আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরানের নেতৃত্বকে একটি বার্তা পাঠানো হয়েছে। একাধিক সংবাদ মাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ‘হরমুজ প্রণালী খোলা আছে এবং তারা বাণিজ্যিক জাহাজে গুলি করা বন্ধ করবেÑ এমন একটি বিবৃতি চাওয়া হয়েছে ইরানের পক্ষ থেকে।
ইরানজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর দুই দিনব্যাপী বিমান হামলার পর এই ঘোষণা করলেন ট্রাম্প। স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, এবারের হামলায় অন্তত ১৪ জন নিহত এবং আরও বহু মানুষ আহত হয়েছে। ইরানও পাল্টা হামলা চালিয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলোর মার্কিন ঘাঁটিতে।
ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি শেষ করার ঘোষণার পর দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক আবার তলানিতে গিয়ে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে আবার পূর্ণমাত্রায় আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।