প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ১ ঘণ্টা আগে
ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরির প্রযুক্তিগত লাইসেন্স দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্টের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: আল জাজিরা
ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরির প্রযুক্তিগত লাইসেন্স দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্টের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
তবে যুদ্ধক্ষেত্রে এখন শুধু আকাশ প্রতিরক্ষা নয়, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নেটওয়ার্কভিত্তিক প্রযুক্তিই হয়ে উঠছে নতুন শক্তির কেন্দ্র।
রাশিয়ার ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের মজুত কমে যাওয়ার পর ইউক্রেনের জন্য এটি বড় স্বস্তির খবর।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা শুক্রবার এ তথ্য জানিয়েছে।
তুরস্কে বুধবার অনুষ্ঠিত ন্যাটো সম্মেলনে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প জানান, কিয়েভকে প্যাট্রিয়ট তৈরির অধিকার দেওয়া হবে।
ট্রাম্প বলেন, “একটি ছোট পাখি (গোপন সূত্র) আমাকে এ তথ্য দিয়েছে যে, আমরা তাদের প্যাট্রিয়ট তৈরির অধিকার দেব। আমরা তাদের দেখাব কীভাবে এটি তৈরি করতে হয়। এটি আসলে খুবই জটিল। তবে আপনারা দ্রুতই এর জটিলতা বুঝে নিতে পারবেন।”
তিনি আরও বলেন, “এভাবে আপনারা আর অভিযোগ করতে পারবেন না যে আমরা তাদের যথেষ্ট সহায়তা দিচ্ছি না।”
তবে কবে থেকে ইউক্রেনে এই উৎপাদন শুরু হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
জার্মানির ব্রেমেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নিকোলাই মিত্রোখিন মনে করেন, স্বল্পমেয়াদে ইউক্রেনের হাতে বড় পরিবর্তন আসবে না।
তবে তিনি মনে করেন, “যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার ইউক্রেনের নিজস্ব ব্যালিস্টিক ও প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির উন্নয়ন বা গতি অনেক বাড়িয়ে দিতে পারে।”
তার মতে, তুলনামূলক সহজ ও কম খরচের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা গড়ে তুলতে ইউক্রেন এক বছরেরও কম সময় নিতে পারে।
প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা শুধু ক্ষেপণাস্ত্র নয়; এর সঙ্গে থাকে উৎক্ষেপণ ইউনিট, রাডার ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। তাই পুরো সক্ষমতা গড়ে তোলা ইউক্রেনের জন্য বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ।
তবে যুদ্ধক্ষেত্রে বর্তমানে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনছে ড্রোন প্রযুক্তি।
খারকিভ অঞ্চলের যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনীয় ড্রোন অপারেটররা দূর থেকে রুশ সেনাদের শনাক্ত করে কয়েক মিনিটের মধ্যেই হামলা চালাচ্ছে। এতে প্রথাগত সম্মুখযুদ্ধের ধারণা দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক জামসটাউন ফাউন্ডেশনের সামরিক বিশ্লেষক পাভেল লুজিনের মতে, যুদ্ধ এখন “নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক যুদ্ধের” দিকে যাচ্ছে। অর্থাৎ সেনা, কমান্ডার ও অস্ত্র ব্যবস্থার মধ্যে তাৎক্ষণিক যোগাযোগের মাধ্যমে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
সেনা সংকট মোকাবিলায় ইউক্রেন স্থল রোবট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ড্রোন এবং স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে।
টারনোপিলভিত্তিক রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রোবোটিক কমপ্লেক্সেসের প্রধান ইহোর চাইকিভস্কি বলেন, “যদি আমাদের সেনার ঘাটতি না থাকত, তাহলে জেনারেলরা এখনও সৈন্যদের সম্মুখরেখায় পাঠাতেন।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা সম্মুখরেখায় যেতে চাইনি, পরিখায় মারা যেতে চাইনি। তাই আমরা স্থল রোবট ব্যবহার শুরু করেছি।”
অন্যদিকে, রাশিয়াও পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা ধরে রেখেছে। তবে মস্কো ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে বেশি গুরুত্ব দিলেও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় তুলনামূলক কম বিনিয়োগ করেছে। ফলে বিশাল ভূখণ্ড রক্ষা করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে।
ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক উপপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইহোর রোমানেনকো বলেন, “তাদের (রাশিয়ার) হাতে থাকা সরঞ্জাম দিয়ে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকরভাবে কাজ সামলাতে পারছে না।
“বিস্তৃত পরিসরের আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য তাদের আরও অনেক বেশি সরঞ্জাম দরকার।”
সম্প্রতি ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় সাইবেরিয়ার ওমস্কে রাশিয়ার একটি বড় তেল শোধনাগারের কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
জেলেনস্কিও বলেছেন, যুদ্ধের ভবিষ্যৎ ‘আকাশে’ নির্ধারণ হবে।
তবে ইউক্রেনের সাবেক সেনাপ্রধান ভ্যালেরি জালুঝনি সতর্ক করেছেন, শুধু পাল্টা হামলার মাধ্যমে চূড়ান্ত বিজয় সম্ভব নয়।
তার মতে, “এই হামলাগুলো ব্যয়বহুল, প্রযুক্তিগতভাবে কঠিন এবং শেষ পর্যন্ত পাল্টাপাল্টি আঘাতের রূপ নেয়।”
এদিকে রাশিয়ার পাল্টা হামলার ধ্বংসাত্মক ক্ষমতাও স্পষ্ট। কিয়েভে সাম্প্রতিক হামলায় ৬৮টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ৩৫১টি ড্রোন ব্যবহার করা হয়, যাতে ২৭ জন নিহত হন।
শান্তি আলোচনা নিয়েও অনিশ্চয়তা কাটেনি। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, ইউক্রেনের সাম্প্রতিক সাফল্য যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন করে যুদ্ধবিরতির আলোচনার দিকে আগ্রহী করতে পারে। তবে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কখন আলোচনায় ফিরবেন, তা এখনও অনিশ্চিত।
কিয়েভভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পেন্টার প্রধান ভলোদিমির ফেসেঙ্কো বলেন, “ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে শান্তি আলোচনার যুক্তি বদলানো দরকার।
“এখন ইউক্রেনের কাছ থেকে ছাড় আদায়ের বিষয়ে নয়, বরং যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা করা উচিত।”
যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে, ভবিষ্যতের লড়াই শুধু ট্যাংক ও কামানের নয়; বরং প্রযুক্তি, তথ্য, ড্রোন ও আকাশ নিয়ন্ত্রণের লড়াই।