যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলা
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি। ছবি: রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরুর পর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
এর প্রভাবে ইতিহাসের অন্যতম বড় জ্বালানি সরবরাহ সংকটে থাকা বৈশ্বিক বাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে।
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্স জানিয়েছে, মঙ্গলবারের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র-সমন্বিত রুট ব্যবহার করে কোনো বড় জাহাজ তাদের স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা (এআইএস) চালু রেখে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেনি।
ওমান উপকূল ঘেঁষা নৌপথেও শনাক্তযোগ্য জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ৭ জুলাই থেকে ১০ হাজার ডেডওয়েট টনের (ডিডব্লিউটি) বেশি কোনো জাহাজ তথাকথিত ‘সাউদার্ন হাইওয়ে’ দিয়ে এআইএস চালু রেখে চলাচল করেনি। তবে অন্তত দুটি জাহাজ ট্র্যাকিং ব্যবস্থা বন্ধ রেখে প্রণালিটি অতিক্রম করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সামুদ্রিক তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান উইন্ডওয়ার্ড জানিয়েছে, বুধবার ও বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত মাত্র পাঁচটি জাহাজকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে দেখা গেছে।
অথচ সোমবার এই সংখ্যা ছিল ৪৫টি। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই নৌপথে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩০টি জাহাজ চলাচল করত বলেও দাবি করেছে উইন্ডওয়ার্ড।
যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস তাদের সর্বশেষ হুমকি মূল্যায়নে জানিয়েছে, জাহাজ চলাচলের এই অস্বাভাবিক কমে যাওয়া উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে নৌপরিবহন প্রতিষ্ঠানগুলোর সতর্ক অবস্থানের প্রতিফলন।
এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের কৌশলগত ও কূটনৈতিক বিষয় নিয়ে কাজ করা ইয়োকোসুকা কাউন্সিল অন এশিয়া প্যাসিফিক স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক জন ব্র্যাডফোর্ড বলেন, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিকল্প বন্দর ও নৌপথ ব্যবহারের দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
তিনি বলেন, “পারস্য উপসাগর, হরমুজ প্রণালি এবং ওমান উপসাগর পর্যন্ত জাহাজে হামলা চালানোর সক্ষমতা রয়েছে ইরানের।”
এর ফলে পুরো অঞ্চলের নৌপরিবহন ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়।
পরে ইরান দাবি করে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে তারা বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, জর্ডান ও ইরাকে থাকা আমেরিকান ঘাঁটিতে আঘাত হেনেছে।
তেলের বাজারে চাপ বাড়ার শঙ্কা
হরমুজ প্রণালির অস্থিরতার মধ্যেও শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল।
ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেল ৭৬ দশমিক ৩৭ ডলারে অবস্থান করছিল, যা আগের দিনের তুলনায় প্রায় অপরিবর্তিত।
তবে বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, সংঘাত দীর্ঘ হলে তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
কানাডার টরন্টোভিত্তিক টিডি সিকিউরিটিজের পণ্য কৌশল বিভাগের বৈশ্বিক প্রধান বার্ট মেলেক বলেন, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার প্রত্যাশা থেকে কিছুটা স্বস্তি পেলেও নতুন সংঘাতের প্রভাব সামনে আরও স্পষ্ট হতে পারে।
তিনি বলেন, “এর ফলে গ্রীষ্মকাল পর্যন্ত ব্রেন্টের দাম ১০ থেকে ১৫ ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে। কারণ তেল ও পরিশোধিত পণ্যের মজুত কমে যাওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হবে।”
সিঙ্গাপুরভিত্তিক স্পার্টা কমোডিটিজের জ্যেষ্ঠ তেল বাজার বিশ্লেষক জুন গোহ বলেন, অপরিশোধিত তেলের তুলনায় পরিশোধিত জ্বালানি পণ্য, বিশেষ করে ডিজেল, বেশি চাপের মুখে রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের শোধনাগারে সরবরাহ কমে যাওয়া এবং ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার কিছু শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ডিজেলের বাজারে সংকট বাড়ছে বলে জানান তিনি।
এশিয়ার শেয়ারবাজারে উত্থান
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক রাতারাতি ০ দশমিক ৮ শতাংশ বাড়ার পর শুক্রবার এশিয়ার প্রধান শেয়ারবাজারগুলোও ঊর্ধ্বমুখী ছিল।
জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক সকালের লেনদেনে ১ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক বেড়েছে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ এবং হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচক বেড়েছে ১ দশমিক ৪ শতাংশ।