প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০২৬ ১৯:৩৬ পিএম
আপডেট : ৩ ঘণ্টা আগে
পাকিস্তানের অর্থনীতি আবারও কঠিন চাপের মুখে পড়েছে। লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, উচ্চ সুদের হার এবং আমদানি-নির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে দেশটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংকটের দিকে এগোচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন অর্থনীতিবিদরা।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে পাকিস্তানের বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ৭ শতাংশে। এর আগে এপ্রিলে এই হার ছিল ১০ দশমিক ৯ শতাংশ, যা মার্চে ছিল ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। ফলে মূল্যস্ফীতি এখন দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান নির্ধারিত ৫ থেকে ৭ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার অনেক ওপরে অবস্থান করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, পরিবহন ব্যয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পচনশীল খাদ্যপণ্যের দাম প্রায় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় মূল্যস্ফীতি আরও ত্বরান্বিত হয়েছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, অপরিশোধিত তেল আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি এবং উচ্চ সুদের হার সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন অনেক দেশকেই প্রভাবিত করলেও পাকিস্তান তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ দেশটি জ্বালানি আমদানির ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল এবং দীর্ঘদিন ধরে ভারসাম্যহীন পরিশোধ-সামর্থ্য সংকটে ভুগছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সম্প্রতি স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান নীতিগত সুদের হার ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১১ দশমিক ৫০ শতাংশে উন্নীত করেছে। তবে অনেক অর্থনীতিবিদ এই সিদ্ধান্তকে ভুল রোগের ভুল চিকিৎসা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
তাদের মতে, যখন মূল্যস্ফীতি অতিরিক্ত চাহিদার কারণে সৃষ্টি হয়, তখন সুদের হার বাড়ানো কার্যকর হতে পারে। কিন্তু পাকিস্তানের বর্তমান মূল্যস্ফীতির মূল কারণ সরবরাহসংক্রান্ত সংকট। ফলে উচ্চ সুদের হার ব্যবসায়িক ঋণ গ্রহণ নিরুৎসাহিত করবে, উৎপাদন ব্যয় বাড়াবে এবং অর্থনীতিকে স্ট্যাগফ্লেশন—অর্থাৎ উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও নিম্ন প্রবৃদ্ধির যুগপৎ সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সরকারি ব্যয়ের বড় অংশ উন্নয়ন, কর্মসংস্থান বা জনকল্যাণে নয়; বরং ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধেই ব্যয় হচ্ছে। অন্যদিকে অনিশ্চয়তার কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার পরিবর্তে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে।
যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিছু স্বল্পসুদে অর্থায়ন কর্মসূচি চালু করেছে, তবুও অর্থনীতির প্রতি আস্থার অভাবে বেসরকারি খাত নতুন বিনিয়োগে এগিয়ে আসছে না। এর সঙ্গে আমদানি ও বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে বিভিন্ন বিধিনিষেধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি মুদ্রার অবমূল্যায়নের মাধ্যমে রপ্তানি বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু পাকিস্তানের বর্তমান সংকট মূলত সরবরাহ ব্যবস্থার ধাক্কা থেকে সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকট উৎপাদন এবং পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে।
সম্প্রতি শেহবাজ শরিফ বলেন, আঞ্চলিক সংঘাত শুরুর আগে পাকিস্তানের মাসিক তেল আমদানি ব্যয় ছিল প্রায় ৩০ কোটি মার্কিন ডলার। বর্তমানে তা বেড়ে ৮০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা গত দুই বছরে অর্জিত অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে কার্যত মুছে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারত ও থাইল্যান্ডের মতো কয়েকটি দেশ তেলের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা তুলনামূলকভাবে ভালোভাবে সামাল দিতে সক্ষম হলেও পাকিস্তানের সংকটের মূল কারণ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক অস্থিরতা নয়। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা, ঋণের চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং কাঠামোগত দুর্বলতা বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও গভীর করেছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, করব্যবস্থা, জ্বালানি খাত এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় সংস্কার না হওয়ায় পাকিস্তানের অর্থনীতি দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। দুর্বল প্রতিষ্ঠান, দুর্নীতি এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আধিপত্য দেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাদের মতে, পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে রাজস্ব ও মুদ্রানীতির মধ্যে কার্যকর সমন্বয়, অবকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় মূল্যস্ফীতির চাপ, নিম্ন প্রবৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা পাকিস্তানের উন্নয়নের সম্ভাবনাকে দীর্ঘদিন ধরে বাধাগ্রস্ত করবে।