ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্প
ভেনেজুয়েলার লা গুয়াইরা রাজ্যের কারাবালাদায় একটি ধসে পড়া ভবন থেকে জীবিতদের খুঁজে বের করতে স্বেচ্ছাসেবক ও উদ্ধারকারীরা কাজ করছেন। ছবি: এএফপি
ভয়াবহ ভূমিকম্পের প্রায় এক সপ্তাহ পরেও ভেনেজুয়েলার লা গুয়াইরাসহ বিভিন্ন স্থানে উদ্ধার তৎপরতা চলছে। কিন্তু ভারী যন্ত্রের অভাবে উদ্ধার তৎপরতা ব্যাহত হচ্ছে। সরকারের ভূমিকা নিয়েও চলছে ক্ষোভ।
লা গুয়াইরাসহ বিভিন্ন স্থানে বহু মানুষ খালি হাতে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে স্বজনদের খুঁজে চলেছেন।
গত সাত দিনে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৯৪৩ জনে পৌঁছেছে। তবে ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো আটকা পড়ে আছেন অসংখ্য মানুষ।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তাদের জীবিত উদ্ধারের আশা ক্ষীণ হয়ে আসছে। এর সঙ্গে ওষুধ ও হাসপাতালের কর্মী সংকট সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ভূমিকম্প বিধ্বস্ত অঞ্চলগুলোতে ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমে সহায়তার জন্য দেশটিতে ৯০০ জনেরও বেশি সামরিককর্মী মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
এদিকে, ভেনেজুয়েলায় শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পের আঘাতে ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ২০ ফুট ওপরে উঠে গেছে প্রতিবেশী ক্যারিবিয়ান দেশ ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগোর দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের একাংশ।
এছাড়া, শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে উত্তর আমেরিকার দেশ মেক্সিকোয়। খবর বিবিসি/ রয়টার্স।
যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন কমান্ডের কমান্ডার জেনারেল ডনোভান জানান, গত সপ্তাহের প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পের পর মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে আমেরিকান বাহিনী অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছে। তারা স্থানীয় বিমানবন্দর এবং বিমান ও নৌ সম্পদ সচল করতে ভেনেজুয়েলাকে সহায়তা করছে।
তার ভাষ্য, সামরিক বাহিনী ভেনেজুয়েলার আকাশে অন্তত ৪ থেকে ৫টি ‘এমকিউ-৯ রিপার’ড্রোন মোতায়েন করেছে। ড্রোনগুলো এবং মায়ামিতে অবস্থিত ১টি ফিউশন সেল যৌথভাবে ভেনেজুয়েলা কর্তৃপক্ষকে আকাশ থেকে গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর এই পদক্ষেপকে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নাটকীয় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কারণ গত ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করতে নিউ ইয়র্কে উড়িয়ে নেওয়ার জন্য একটি আকস্মিক সামরিক অভিযান চালিয়েছিল আমেরিকান বাহিনী। মাদুরো অবশ্য তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
গত বুধবার ভেনেজুয়েলায় এক মিনিটেরও কম সময়ের ব্যবধানে ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে হাজার হাজার ভবন ধসে পড়ে এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েন অসংখ্য মানুষ।
ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেস মঙ্গলবার জানিয়েছেন, এ দিন পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা ১৯৪৩ জনে দাঁড়িয়েছে। আর কয়েক হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন প্রায় ১৬ হাজার মানুষ।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা, ইউএনএইচসিআর মঙ্গলবার জানিয়েছে, ওই এলাকায় খাদ্য সংকট প্রকট, মৌলিক পরিষেবা ভেঙে পড়েছে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। সংস্থাটি এক বিবৃতিতে জানায়, সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার কারণে স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে।
তিন বছরের শিশু উদ্ধার: ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্পের ছয় দিন পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে তিন বছর বয়সী এক শিশুকে জীবিত উদ্ধারের খবর জানিয়েছে জর্ডানের একটি উদ্ধারকারী দল।
শিশুটিকে উদ্ধারের সময় ধারণ করা ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, উদ্ধারকারীরা শিশুটিকে ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে উদ্ধার করে আনার পর উল্লাস করছেন।
দেশটির অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্টের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ছেলে শিশুটির নাম ক্লিয়েবার মোরান। তাকে লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্যে একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ শিশুটির উদ্ধারকে আশার একটি মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
সমালোচনার মুখে সরকার
বিপর্যয় সামাল দিতে দেরি করায় ভেনেজুয়েলা সরকার তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। প্রথম দিনগুলোতে বাসিন্দারা হাত, কোদাল ও দড়ি দিয়ে স্বজনদের খোঁজার চেষ্টা করেন।
পরবর্তীতে শনিবার থেকে রাষ্ট্রীয় টিভিতে প্রদর্শিত ভিডিও ফুটেজে ভারী নির্মাণ যন্ত্রপাতি দিয়ে উদ্ধার কাজ চালাতে দেখা গেছে।
সরকারের ধীর প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল ডনোভান জানান, কারাকাস মূলত গত কয়েক দশকের দুর্বল নেতৃত্বের খেসারত দিচ্ছে, যা দেশটির পরিকাঠামোকে প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছে। এর সঙ্গে ওষুধ ও হাসপাতালেরকর্মী সংকট সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
২০ ফুট উপরে ওঠে গেছে ত্রিনিদাদ: ভেনেজুয়েলায় শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পের আঘাতে ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ২০ ফুট ওপরে উঠে গেছে প্রতিবেশী ক্যারিবিয়ান দেশ ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগোর দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের একাংশ। দ্বীপরাষ্ট্রের অনেক জায়গায় ফাটল দেখা দিয়েছে বলেও দেশটির সংবাদমাধ্যম ডেইলি এক্সপ্রেসকে জানিয়েছেন উপকূলের বাসিন্দারা।
বিরল এ ভূ-প্রাকৃতিক পরিবর্তনে বিপর্যস্ত ভূমির ধ্বংসাবশেষে মারা গেছে শত শত সামুদ্রিক প্রাণী। আটকাও পড়েছে হাজার হাজার।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দ্বীপের কিছু অংশ যে মাটির কয়েক ফুট ওপরের দিকে উঠে এসেছে; এলাকাটি পরিদর্শন করে তা দেখেছেন তাদের প্রতিনিধিরা। শত শত মৃত মাছ, কাঁকড়া, ঝিনুক এমনকি স্টিংরে মাছ (শাপলা পাতা বা হাউশ মাছ) ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে। সমুদ্র সৈকতের কিছু অংশে তৈরি হয়েছে ছোট ছোট জলাশয়ও।
স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সকালে প্রথম এ পরিবর্তন চোখে পড়ে বলে দ্যা এক্সপ্রেসকে জানিয়েছেন উপকূলীয় অঞ্চলটির বাসিন্দা কামাল বাইকেরান।
ত্রিনিদাদের এ এলাকার নিচেই রয়েছে টেকটনিক প্লেটস। ক্যারিবিয়ান প্লেট ও দক্ষিণ আমেরিকান প্লেট। ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্প আঘাত হানায় এখানের প্লেটগুলোতেও আসে পরিবর্তন। তাল হারিয়ে কিছুক্ষণের জন্য নড়েচড়ে বসে ভূমি। আকস্মিক এ গতিতে সেখানকার ভূ-পৃষ্ঠ সরে যাওয়ার কারণে ওপরে উঠে আসে উপকূল।
ভূতাত্ত্বিক জেভিয়ার মুনান জানিয়েছেন, কোনো ‘স্লাম্প’ বা ভূমিধসের প্রক্রিয়া পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠার কারণেই সম্ভবত এই ঘটনাটি ঘটেছে। ভূমিধসের সময় পাহাড়ের ঢাল বেয়ে যেমন নিচে নেমে আসে পাথরের বিশাল বড় বড় চাঁই, ভূমিকম্পে ঠিক সেভাবেই নিচে নেমে গেছে সমুদ্রও।
ভূমিকম্পে কাঁপল মেক্সিকো
শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল উত্তর আমেরিকার দেশ মেক্সিকো। রিখটার স্কেলে এই কম্পনের মাত্রা ছিল ৬।
ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল এল প্রোগ্রেসো থেকে দক্ষিণ-দক্ষিণ-পশ্চিমে। তাৎক্ষণিকভাবে হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
টিআরটি ওয়ার্ল্ড বলছে, এল প্রোগ্রেসো থেকে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণ-পশ্চিমে ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল বলে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে।
ভূমিকম্পটি ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে আঘাত হানে।