মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত
ওয়াশিংটনে চার দিনের আলোচনার পর ইসরায়েল, লেবানন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ১৪ দফার একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি সই হয়। ছবি: সংগৃহীত
ওয়াশিংটনে চার দিনের আলোচনার পর ইসরায়েল, লেবানন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ১৪ দফার একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি সই হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননের দুটি এলাকা থেকে তাদের সেনা প্রত্যাহার করে নেবে এবং জায়গাগুলো লেবাননের সামরিক বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করবে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। চুক্তিতে নিরাপত্তা, নিরস্ত্রীকরণ, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং লেবানন পুনর্গঠনে আন্তর্জাতিক সহায়তার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এদিকে চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে লেবাননে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। খবর আল জাজিরা/সিএনএনের।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরে এই ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি সই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়াচিল লাইটার এবং লেবাননের রাষ্ট্রদূত নাদা হামাদেহ। লেবাননের রাষ্ট্রদূত এই চুক্তিকে দেশের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা পুনরুদ্ধারের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। মার্কো রুবিও এই চুক্তিকে একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার শুরু হিসেবে উল্লেখ করে শান্তির জন্য এর গুরুত্ব তুলে ধরেন।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর নেতানিয়াহু এক ভিডিওবার্তায় জানান, লিটানি নদীর উত্তরের একটি এলাকা এবং দক্ষিণের আরেকটি এলাকা থেকে সেনা সরিয়ে নেওয়া হবে। লেবাননের যেসব জায়গায় এখন ইসরায়েলি বাহিনীর থাকার প্রয়োজন নেই, কেবল সেসব এলাকা থেকেই সেনা সরানো হচ্ছে। চুক্তিকে তিনি ইসরায়েলের বড় জয় এবং ইরানের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
তার মতে, হিজবুল্লাহ সম্পূর্ণ নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননের বাকি অংশে তাদের অবস্থান ধরে রাখবে। ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনাদের সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করতে হবে। এই আলোচনার জন্য লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। হিজবুল্লাহর সংসদ সদস্য হাসান ফাদাল্লাহ ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার তীব্র বিরোধিতা করেছেন।
চুক্তি অনুযায়ী, লেবাননের সেনাবাহিনী ধীরে ধীরে দেশটির নির্ধারিত ‘পাইলট জোনগুলোতে’ পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করবে। শুরুতে দুটি পাইলট জোনে এ ব্যবস্থা কার্যকর হবে। তবে উভয় পক্ষের সম্মতিতে পরবর্তী সময়ে আরও এলাকা এতে যুক্ত করা যেতে পারে।
চুক্তি মোতাবেক লেবানন সরকার রাষ্ট্রের বাইরে থাকা সব সশস্ত্র গোষ্ঠীর সম্পূর্ণ ও যাচাইকৃত নিরস্ত্রীকরণ নিশ্চিত করবে এবং শক্তি প্রয়োগে রাষ্ট্রে একক কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে। এতে মূলত হিজবুল্লাহকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
চুক্তিতে ইসরায়েল বলেছে, হিজবুল্লাহর মতো রাষ্ট্রের বাইরে থাকা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হুমকির অবসান হলে ভবিষ্যতে লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক উপস্থিতি বা অভিযান পরিচালনার প্রয়োজন থাকবে না। একই সঙ্গে লেবাননের ভূখণ্ডের প্রতি তাদের কোনো আঞ্চলিক দাবি নেই বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, লেবানন পুনর্গঠনে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহায়তা জোগাড়ে কাজ করবে যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তি ও নিরাপত্তা চুক্তির খসড়া তৈরিতে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনে কাজ করবে ইসরায়েল ও লেবানন।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, সহিংসতার চক্র ভাঙতে তারা উল্লেখযোগ্য সম্পদ বরাদ্দ দেবে। এর অংশ হিসেবে জাতিসংঘের সমন্বয়ে তাৎক্ষণিক ১০০ মিলিয়ন ডলারের মানবিক সহায়তা দেওয়া হবে। এছাড়া মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর বিদ্যমান কর্তৃত্ব ও বরাদ্দের আওতায় লেবাননের সেনাবাহিনীকে ৩ কোটি ডলারের বেশি অর্থ ফেরত দেবে বলেও জানানো হয়েছে।
চুক্তি উপেক্ষা করে ফের হামলা
চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র এক দিনের মাথায় আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দক্ষিণ লেবানন। শনিবার দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় কৌশলগত এলাকা নাবাতিহতে একটি ইসরায়েলি ড্রোন অত্যন্ত জোরালো হামলা চালিয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে চালানো এই আকস্মিক হামলাকে কেন্দ্র করে ওই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াটি আবারও বড় ধরনের অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
লেবাননের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, নাবাতিহ আল-ফাওকা এলাকার একটি জনাকীর্ণ মোড় ফারাহ অ্যামিউজমেন্ট পার্ক ইন্টারসেকশনকে নিশানা করে ইসরায়েলি ড্রোনটি আঘাত হানে।
হামলার পর তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির সম্পূর্ণ বিবরণ বা কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, আকস্মিক এই বিস্ফোরণের ফলে পুরো এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছোটাছুটি শুরু করে।