ভেনেজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্প
বিবিসি
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
ভূমিকম্পের ধ্বংসস্তূপ ও সাংবাদিক নিকোল কোলস্টা। ছবি: বিবিসি
ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে যখন শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে, তখন সাংবাদিক নিকোল কোলস্টার নিজের বাড়িতেই ছিলেন। হঠাৎ পুরো অ্যাপার্টমেন্ট প্রচণ্ডভাবে কাঁপতে শুরু করে।
সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমি দেখছিলাম জানলাগুলো কাঁপছে। নিজেকে রক্ষা করার জন্য তখন আমার মাথায় কেবল একটাই বুদ্ধি এল—সামনের দরজা আর একটা পাথরের দেয়ালের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ানো।”
বৃহস্পতিবার মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে দুটি ভূমিকম্প শহরটিতে আঘাত হানে। প্রথমটির মাত্রা ছিল ৭.২ এবং দ্বিতীয়টি ছিল ৭.৫। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে ভেঙে পড়া ভবন এবং রাস্তায় আতঙ্কিত মানুষের ভিড় দেখা গেছে। তবে এখন পর্যন্ত হতাহতের সঠিক সংখ্যা বা ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি।
কোলস্টার বিবিসিকে বলেন, “এটি আমার জীবনে অনুভব করা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। কম্পন এত তীব্র ছিল যে আমার মনে হচ্ছিল পুরো ভবনটি আমার ওপর ভেঙে পড়বে।”
সাততলার অ্যাপার্টমেন্টে সেই দরজা আর দেয়ালের মাঝে বেশ কিছুক্ষণ কুঁকড়ে ছিলেন কোলস্টার। পরে প্রতিবেশীদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার চিৎকার শুনে তিনি নিচে নেমে আসেন।
কারাকাসের অন্যতম প্রধান এলাকা পালোস গ্রান্দেস, যা ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেখানকার বাসিন্দা কোলস্টার জানান, ভূমিকম্পের এক ঘণ্টা পরেও সবাই বাইরে অপেক্ষা করছে। যদি আবার আফটারশক হয়, সেই ভয়ে কেউ ভেতরে ঢুকছে না।
ভূমিকম্পটি যেদিন আঘাত হানে, সেদিন ভেনেজুয়েলায় ১৮২১ সালের কারাবোবো যুদ্ধের স্মৃতিবাহী জাতীয় দিবস হিসেবে সরকারি ছুটি ছিল। স্প্যানিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতা সিমোন বলিভারের ঐতিহাসিক জয়ের স্মরণে এদিন মানুষ ঘরেই অবস্থান করছিল।
আক্রান্ত এলাকা থেকে আসা ছবি ও ভিডিওতে দেখা গেছে, মানুষ ভয়ে কাঁদছে এবং রাস্তায় একে অপরকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিচ্ছে। কোলস্টার বলেন, “অনেকে প্রচণ্ড অসহায় বোধ করছেন কারণ তারা তাদের প্রিয় পোষা প্রাণীটিকে বাড়ি থেকে বের করে আনতে পারেননি।”
তিনি আরও জানান, অনেকে এই ভয়ে বিল্ডিংয়ের বেসমেন্ট থেকে গাড়ি বের করার চেষ্টা করছেন যে, পরবর্তী কম্পনে হয়তো গ্যারেজ ধসে পড়তে পারে। পাশেই একটি ভেঙে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে সাহায্যের জন্য মানুষের চিৎকার শোনা যাচ্ছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
পালোস গ্রান্দেসের আরেক বাসিন্দা মারিয়া এলিস জানান, ভূমিকম্পে তার অ্যাপার্টমেন্টের দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে।
বিবিসিকে তিনি বলেন, “বাইরে বৈদ্যুতিক খুঁটি উপড়ে পড়েছে। আমাদের এখানে এখন কোনো বিদ্যুৎ নেই, মোবাইলের সিগন্যালও কাজ করছে না।”
ভেনেজুয়েলার রাজধানীতে বড় ভূমিকম্পের ঘটনা এবারই প্রথম নয়। ১৯৬৭ সালে ৬.৬ মাত্রার এক ভূমিকম্পে কারাকাসে ২শ বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। সেবারও পালোস গ্রান্দেস এবং উচ্চবিত্ত এলাকা আলতামিরার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল।
তবে যারা ১৯৬৭ সালের সেই ভয়াবহতা দেখেছেন, তাদের কাছে আজকের ভূমিকম্পটি আরও বেশি শক্তিশালী মনে হয়েছে। ৫৬ বছর বয়সী কোরো মার্টিনেজ বলেন, “ভয়ানক এক শব্দ হয়েছিল। ঘরের সব জিনিসপত্র আছড়ে পড়ছিল, ফ্রিজের ভেতরের জগগুলোও উল্টে গিয়েছিল। আমি জীবনে এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হইনি।”
আশি বছর বয়সী পেনশনভোগী মারিয়া রোমেরো বলেন, “এই ভূমিকম্প ছিল বীভৎস, এমনকি ১৯৬৭ সালের ভূমিকম্পের চেয়েও ভয়ংকর।”