প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৬ জুন ২০২৬ ১২:৪৯ পিএম
হোয়াইট হাউসের ইস্ট রুমে সংবাদ সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ফাইল ছবি/এপি
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য এক বড় রাজনৈতিক সংকট তৈরি করেছে।
যিনি নিজেকে ওয়াশিংটনের ক্ষমতাকেন্দ্রে প্রভাবশালী নেতা হিসেবে তুলে ধরতেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নিজের বিশেষ প্রভাবের কথা বলতেন, সেই নেতানিয়াহু কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছেই এতটা উপেক্ষিত এবং প্রকাশ্যে অপমানিত হলেন?
যিনি বহু বছর ধরে নিজেকে ইসরায়েলের ‘মিস্টার সিকিউরিটি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তিনি কীভাবে এমন এক পরিস্থিতি সামলাবেন, যেখানে ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয়ই লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের হামলা বন্ধের দাবি জানাচ্ছে!
বিরোধী নেতা ইয়াইর লাপিদ সোমবার নেসেটে বলেন, নেতানিয়াহুর সামনে এখন দুটি পথ- ‘হয় যুক্তরাষ্ট্রের মতো সবচেয়ে বড় মিত্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ানো, নয়তো ইসরায়েলের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে আত্মসমর্পণ করা।’
রবিবার বৈরুতে হামলার নির্দেশ দেওয়ায় নেতানিয়াহুর বিচক্ষণতা নিয়ে প্রকাশ্যে কঠোর সমালোচনা করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার সমালোচনা ইতোমধ্যেই নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও বিশ্লেষকদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
শুধু বিরোধী শিবির নয়, নেতানিয়াহুর নিজ দল লিকুদ ও তার জোটের কট্টর ডানপন্থী মন্ত্রীরাও এই যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গাভির সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘ট্রাম্পের এই চুক্তি আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। যে চুক্তি আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না, তার অংশীদার আমরা নই।’
লিকুদ দলের আইনপ্রণেতা এরিয়েল কালনারও বলেন, ‘ইসরায়েল নিজের নিরাপত্তার জন্য যা প্রয়োজন তাই করবে। মিত্রদের কাছ থেকে আমরা সেই বাস্তবতাকে বোঝার প্রত্যাশা করি। বন্ধুদের মধ্যেও মতবিরোধ হতে পারে, কিন্তু বিপদের সময় বন্ধুদের একে অপরকে বুঝতে হয়।’
সাবেক মোসাদ কর্মকর্তা ও ইরান বিশেষজ্ঞ সিমা শাইন বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র কেন এমন চুক্তি মেনে নিল, তা বোঝা কঠিন। এর মাধ্যমে ইরানকে লেবাননের ভবিষ্যৎ প্রভাবিত করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে এবং হিজবুল্লাহকে দেশটির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে টিকিয়ে রাখার পথ খুলে দেওয়া হয়েছে। এতে ইসরায়েলের নিরাপত্তা মহল কিংবা রাজনৈতিক নেতৃত্ব কেউই সন্তুষ্ট নয়।’
এত সমালোচনার মধ্যেও নেতানিয়াহু সোমবার রাতে জেরুজালেমে এক সংবাদ সম্মেলনে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘আমার প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ছিল ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা। প্রয়োজন হলে যা করার দরকার, আমরা তাই করব। ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হবে না।’ তবে তিনি স্বীকার করেন, কিছু বিষয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে তার মতপার্থক্য রয়েছে।
তার ভাষায়, ‘আমি আলোচনায় নিজের মতামত জানিয়েছি, কিন্তু আমাদের নিজস্ব স্বার্থও রয়েছে। প্রথমত, ইরান যেন পারমাণবিক হুমকি হয়ে না ওঠে। দ্বিতীয়ত, লেবাননে আমরা যে বাফার জোন তৈরি করেছি, প্রয়োজন হলে সেখানে থাকব।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইরান চাইছিল আমরা সরে যাই, কিন্তু তা হয়নি। কারণ আমি দৃঢ় অবস্থানে ছিলাম। আমাদের যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররাও সেই দৃঢ়তাকে সম্মান করে। একইভাবে আমাদের সামরিক স্বাধীনতাও বজায় রাখতে হবে। কেউ হামলা করলে বা হুমকি দিলে আমরা অবশ্যই জবাব দেব।’
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ভয়াবহ হামলার পর তিনি ইসরায়েলের নিরাপত্তা নীতি আরও আক্রমণাত্মক করেন। তার ধারণা ছিল, হুমকি সৃষ্টি হওয়ার আগেই তা ধ্বংস করতে হবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য বদলে দিতে হবে।
কিন্তু গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান চালিয়ে হাজারো মানুষের প্রাণহানি ঘটলেও হামাস এখনো অঞ্চলটির বড় অংশে নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে এবং নতুন করে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা ও গাজার নতুন প্রশাসনিক কাঠামোও এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
নতুন নিরাপত্তা কৌশলের ফলে ইসরায়েলি বাহিনী গাজা, লেবানন ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় অবস্থান করছে। যদিও এটি অনেক ইসরায়েলির কাছে জনপ্রিয়, তবে এতে সেনাবাহিনীর ওপর চাপ বেড়েছে এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথও স্পষ্ট নয়।
হিজবুল্লাহ ও ইরানের সঙ্গে একের পর এক সংঘাতেও ইসরায়েলের প্রধান প্রতিপক্ষগুলো পুরোপুরি দুর্বল হয়নি। বরং তেহরানে আরও কট্টর নেতৃত্ব ক্ষমতায় এসেছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে তাদের কৌশলগত গুরুত্বও বেড়েছে।
ফলে এখন ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষই যেন তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্রের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে।
ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ মনে করেন, ‘ইসরায়েলের ব্যর্থতা তাদের তেহরাননীতি নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে। আরও বাস্তবসম্মত ও সংযত অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘যদি ইসরায়েলের কোনো সামরিক পদক্ষেপ ওয়াশিংটনের কাছে এই চুক্তি নস্যাৎ করার চেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়তে হবে।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ওবামা প্রশাসনের সময়ের মতো এখন আর নেতানিয়াহুর পক্ষে কংগ্রেস বা যুক্তরাষ্ট্রের জনমতকে ব্যবহার করে হোয়াইট হাউসকে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই।
দীর্ঘদিন ধরে নেতানিয়াহু ভোটারদের বোঝাতে চেয়েছেন, তার নেতৃত্বই ইসরায়েলের নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় নিশ্চয়তা। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে সেই প্রতিশ্রুতি ক্রমেই বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ইরানে সরকার পরিবর্তন হলে হয়তো তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ও নির্বাচনী কৌশল নতুন গতি পেত। কিন্তু বাস্তবে তার নতুন নিরাপত্তা নীতি তাকে এমন এক অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে তাকে এখন শত্রুর নয়, বরং নিজের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রের সঙ্গে সংঘাত অথবা আপস- এই দুই কঠিন পথের একটিকে বেছে নিতে হতে পারে।
সূত্র: বিবিসি