চলমান এল নিনোর ‘অত্যন্ত শক্তিশালী’ বা ‘সুপার এল নিনো’তে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা ৬৩ শতাংশ। ছবি: বিবিসি
বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে এল নিনো।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড এটমোসফিরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এনওএএ) নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “চলমান এল নিনো আরও শক্তিশালী হয়ে ‘সুপার এল নিনো’তে পরিণত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপপ্রবাহ, বন্যা, খরা এবং অন্যান্য চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি আরও তীব্র হতে পারে”।
এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের ক্রান্তীয় অঞ্চলে সংঘটিত একটি পর্যায়ক্রমিক জলবায়ুগত ঘটনা। এ সময় মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায় এবং বায়ুপ্রবাহের ধরনে পরিবর্তন আসে। এর প্রভাব বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ার ওপর পড়ে।
রেকর্ডকৃত সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো
এনওএএ এর ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টার জানিয়েছে, চলমান এল নিনোর ‘অত্যন্ত শক্তিশালী’ বা ‘সুপার এল নিনো’তে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা ৬৩ শতাংশ। এমনকি এটি ১৯৫০ সালের পর রেকর্ডকৃত সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোগুলোর একটি হতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। সংস্থাটি শতভাগ নিশ্চিত করেছে এল নিনো শরৎকাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে এবং শীতকালেও এর প্রভাব বজায় থাকার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি।
বিশেষজ্ঞদের বরাতে সিএনএন বলছে, কোনো এল নিনোকে ‘সুপার এল নিনো’ বলতে হলে মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অন্তত ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে হয়। বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বেশ কয়েকটি নির্ভরযোগ্য জলবায়ু মডেল বলছে, এবার সেই সীমা অনেকটাই অতিক্রম করতে পারে।
গত কয়েক মাস ধরে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর থেকে বিপুল পরিমাণ উষ্ণ পানি পূর্ব দিকে সরে যাচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রায় ৬০০ থেকে ১ হাজার ফুট নিচে থাকা এই উষ্ণ পানি ধীরে ধীরে ভেসে উঠে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল সংলগ্ন পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠে ছড়িয়ে পড়ছে। অতীতের শক্তিশালী এল নিনো ঘটনাগুলোর সময়ও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গিয়েছিল।
সুপার এল নিনো তুলনামূলকভাবে বিরল ঘটনা। সর্বশেষ এমন শক্তিশালী এল নিনো দেখা গিয়েছিল ২০১৫-১৬, ১৯৯৭-৯৮ এবং ১৯৮২-৮৩ সালে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এল নিনোর সময় সমুদ্র থেকে বিপুল পরিমাণ তাপ বায়ুমণ্ডলে স্থানান্তরিত হয়, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে আরও ত্বরান্বিত করে। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সৃষ্ট মানবসৃষ্ট উষ্ণায়নের সঙ্গে এই অতিরিক্ত তাপ যুক্ত হলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। ফলে আগামী বছরগুলোতে নতুন তাপমাত্রার রেকর্ড গড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
কোথায় কেমন প্রভাব পড়তে পারে
এল নিনোর কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্নধর্মী আবহাওয়া পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে শীতকালে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টিপাত হলেও উত্তরাঞ্চলে উষ্ণ আবহাওয়া বিরাজ করতে পারে।
একই সঙ্গে মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের কার্যক্রম বৃদ্ধি পেলেও আটলান্টিক মহাসাগরে হারিকেনের সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।
অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় খরা ও তাপপ্রবাহের ঝুঁকি বাড়তে পারে, যা দাবানল ও পানি সংকটের কারণ হতে পারে। ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মৌসুমি বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি তাপপ্রবাহ আরও তীব্র হতে পারে।
ক্যারিবীয় অঞ্চলেও খরার ঝুঁকি বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে বন্যা এবং কিছু অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী খরা দেখা দিতে পারে। দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন এলাকায় অতিবৃষ্টি, আবার কোথাও স্বাভাবিকের তুলনায় শুষ্ক আবহাওয়া বিরাজ করার সম্ভাবনা রয়েছে।
সামুদ্রিক পরিবেশ ও অর্থনীতিতে প্রভাব
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, শক্তিশালী এল নিনোর কারণে সমুদ্রে ব্যাপক সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে। এতে প্রবাল প্রাচীরের ক্ষয় ও ‘কোরাল ব্লিচিং’এর ঝুঁকি বাড়বে। একই সঙ্গে মাছের আবাসস্থল ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও এর প্রভাব উল্লেখযোগ্য হতে পারে। অতীতে দেখা গেছে, শক্তিশালী এল নিনোর ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি, খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার কারণে অনেক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে গেছে।
তবে জলবায়ুবিদরা বলছেন, প্রতিটি এল নিনো একরকম নয়। তাই কোথায় কতটা প্রভাব পড়বে, তা এখনই নির্দিষ্টভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে পৃথিবী বর্তমানে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি উষ্ণ। ফলে এই ‘সুপার এল নিনো’ কতটা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।