বিবিসির বিশ্লেষণ
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১০ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ৩ ঘণ্টা আগে
মধ্যপ্রাচ্য এখন অনেক ক্ষেত্রেই বদলে যাচ্ছে, তবে সেটা ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর নীল নকশায় নয়, বদলে যাচ্ছে মোজতবা খামেনির ঈশারায়। কোলাজ: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ভেবেছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে জয়লাভ করলেই তারা মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে ফেলবেন। কিন্তু তাদের সেই ভাবনা এখন বুমেরাং হয়ে উঠছে।
তাদের প্রত্যাশা মতো ইরানকে হারানো যায়নি। বর্তমান পরিস্থিতি সেখানে দীর্ঘমেয়াদি ও ক্ষয়িষ্ণু সংকটের ঝুঁকি তৈরি করেছে। তার পরেও মধ্যপ্রাচ্য এখন অনেক ক্ষেত্রেই বদলে যাচ্ছে, তবে সেটা ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর নীল নকশায় নয়, বদলে যাচ্ছে মোজতবা খামেনির ঈশারায়।
তেহরানের বর্তমান শাসক গোষ্ঠী প্রমাণ করেছেন, তারা ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহুর ধারণার চেয়েও অনেক বেশি শক্তশালী। স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হিসাব-নিকাশ ভুল ছিল। ফলে তারা এখন যুদ্ধের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছেন। সর্বশেষ প্রমাণ হলো হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপাচে হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা। এটি ওয়াশিংটনের জন্য আরও একটি কড়া বার্তা যে, তেহরানের শাসকরা এখনও আমেরিকাকে আঘাত করার ক্ষমতা রাখেন।
পাশাপাশি ইরানের শাসকগোষ্ঠী এটাও প্রমাণ করেছেন যে, এই যুদ্ধে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে তারা যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত। ইরানের কাছে বিজয়ের অর্থ হলো নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা এবং পারস্য উপসাগরের সবচেয়ে কৌশলগত নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালি’র ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাথা।
গত ফেব্রুয়ারি থেকে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই নৌপথের দখল রয়েছে ইরানের হাতে। ফলে এই রুটের বাণিজ্য পুরোপুরি স্থবির হয়ে আছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার জেনারেলরা এখন যুদ্ধের সর্বশেষ সংযোজন হরমুজ প্রণালিতে এই হেলিকপ্টার হারানোর ধকল সামলে এমন একটি জবাব খোঁজার চেষ্টা করছেন, যা একই সঙ্গে আমেরিকার শক্তিও প্রদর্শন করবে আবার ধীরগতির নিষ্ফলা কূটনৈতিক পথকেও বাঁচিয়ে রাখবে।
এই ঘটনায় কপ্টারের ক্রু সদস্যরা কোনোক্রমে বেঁচে গেছেন। তারা নিহত হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া অনেক বেশি কঠোর হতো।
ট্রাম্প মূলত ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি করার জন্য মুখিয়ে আছেন। যাতে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া যায় এবং ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও পারমাণবিক পরিকল্পনা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার পথ তৈরি হয়।
এই যুদ্ধ খোদ আমেরিকার মাটিতেই জনপ্রিয়তা হারিয়েছে। এখন ট্রাম্প এমন একটি উপায় খুঁজছেন, যা তিনি নিজ দেশে ‘বিজয়’ হিসেবে প্রদর্শন করতে পারেন। তবে এই কাজটি ট্রাম্পের জন্য মোটেও সহজ হচ্ছে না।
ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু এখন যুদ্ধের সেই পুরনো ঐতিহাসিক সত্যেরই মুখোমুখি হয়েছেন, যেকোনো যুদ্ধ শুরু করা যতটা সহজ, একটি সুনির্দিষ্ট বিজয়ের মাধ্যমে তা শেষ করা ঠিক ততটাই কঠিন।
রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই নেতানিয়াহু যুক্তি দিয়ে আসছেন যে, ইসরায়েলের আসল শত্রু ফিলিস্তিন বা আরবরা নয়, বরং ইরান। তিনি পূর্ববর্তী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের রাজি করাতে না পারলেও ট্রাম্পের ক্ষেত্রে সফল হন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর থেকে নেতানিয়াহু ইসরায়েলিদের বলেন যে, আমেরিকার সমর্থনে তাদের সামরিক শক্তি শত্রুদের নিশ্চিহ্ন করবে এবং একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ এনে দেবে। কূটনীতি নয়, সামরিক শক্তিই ছিল তার একমাত্র সমাধান।
কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতা আজ ভিন্ন। গত সোমবার ট্রাম্প যখন তাকে বৈরুতে আক্রমণের পরিকল্পনা বাতিলের নির্দেশ দেন, তখন ইসরায়েলি কলামিস্ট বেন কাস্পিতের ভাষায়, নেতানিয়াহুকে দেখতে একটি ‘হাওয়া বের হওয়া ফুসকো বেলুনর’ মতো লাগছিল। সামরিক শক্তি দিয়ে পুরো অঞ্চলকে নিজের ইচ্ছাধীন করার যে কৌশল নেতানিয়াহু নিয়েছিলেন, তা স্পষ্টতই ব্যর্থ হয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে দ্রুত বিজয় আশা করেছিলেন। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী বন্দি করে নিউইয়র্কের জেলে ভরেছে এবং কারাকাসে নিজেদের পছন্দের উত্তরসূরি বসিয়েছে, ট্রাম্প ভেবেছিলেন ইরানের ক্ষেত্রেও সেই একই ফর্মুলা খাটবে।
কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরাশক্তি হওয়া সত্ত্বেও আমেরিকা ও ইসরায়েল আজ ভাবছে কোথায় ভুল হলো?
তারা ভেবেছিলেন নিষেধাজ্ঞা, দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত ইরান হয়তো ভেতর থেকে ভেঙে পড়বে। বিশেষ করে যখন তাদের মিত্র হামাস, হিজবুল্লাহ এবং সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন হয়েছে, তখন ইরানকে একা ভেবেছিলেন তারা।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ভেবেছিলেন সর্বোচ্চ নেতা ও তার শীর্ষ সহযোগীদের হত্যা করলেই হয়তো এই ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।
কিন্তু বিবিসি বলছে, দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে ক্রমাগত হুমকির মুখে টিকে থাকার জন্য ইরান নিজেকে যেভাবে প্রস্তুত করেছে এবং তাদের ধর্মীয় ও আদর্শিক বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে জাতীয় নিরাপত্তার যে দেয়াল তৈরি করেছে, তার গভীরতা বুঝতে ভুল করেছিলেন ট্রাম্প-নেতানিয়াহু।
এই যুদ্ধের ধাক্কা লেগেছে আমেরিকার মিত্র পারস্য উপসাগরীয় তেল সমৃদ্ধ দেশগুলোর গায়েও। এটি কেবল তাদের অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, বরং স্থায়িত্ব ও বিলিয়ন ডলারের যে বাণিজ্যিক স্বর্গ তারা গড়ে তুলতে চেয়েছিল, বর্তমান যুদ্ধ তাকে একটি মরীচিকায় পরিণত করেছে।
বর্তমান বাস্তবতায় তেহরান বিশ্বাস করছে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করার এই সক্ষমতাই তাদের দীর্ঘমেয়াদে আমেরিকা ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেবে।
ইসরায়েল ও আমেরিকার হামলায় নিহত পুরনো নেতাদের জায়গায় ইরানের যে নতুন নেতৃত্ব এসেছে, তারা আগের চেয়েও বেশি আদর্শিক এবং যেকোনো ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত।
ইরানের বর্তমান কৌশল হলো লেবাননের যুদ্ধকে পারস্য উপসাগরের সংকটের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া। এ ক্ষেত্রেও ইরান সফল হয়েছে।
গত মার্চ মাসে যখন হরমুজ প্রণালি বন্ধ করা হয়, তখন সতর্কবার্তা দেওয়া হয় যে জুন মাসের মধ্যে এটি না খুললে বিশ্ব অর্থনীতি ধসে পড়বে। জুনের এই সময়ে এসেও সেই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধই রয়েছে। কোনো বড় ধরনের কূটনৈতিক অলৌকিক ঘটনা ছাড়া এই সংকট অদূর ভবিষ্যতে কাটার কোনো সহজ লক্ষণ আপাতত দেখা যাচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য একটি চুক্তি নিয়ে আলোচনা কয়েক মাস পর্যন্ত চলতে পারে আবার এক সপ্তাহের মধ্যেও সমঝোতা হতে পারে। গতকাল বুধবার এমন মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।
সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স বলেন, আমার মনে হয় আমরা এমন একটি চুক্তির কাছাকাছি অবস্থানে আছি যা অর্থনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভালো হবে এবং একই সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টি কার্যকরভাবে মোকাবিলা করবে। এখনও চুক্তির কিছু কাজ বাকি রয়েছে এবং আমরা তা চালিয়ে যাব। মধ্যবর্তী নির্বাচন (মিডটার্ম) হওয়ার আগেই আমরা অনেক কিছু জানতে পারব। চুক্তি আগামী সপ্তাহেই হতে পারে, আবার কয়েক মাস পরেও হতে পারে।
ভ্যান্সের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ওয়াশিংটন প্রশাসন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী সমাধানের দিকে নজর দিচ্ছে। তবে আলোচনার অগ্রগতি সত্ত্বেও এখনও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চূড়ান্ত হওয়া বাকি রয়েছে।