যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একক সিদ্ধান্তে কোনো দেশের ওপর যুদ্ধের বিভীষিকা চাপিয়ে দিতে পারবেন না প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
যুদ্ধের বারুদ আর ধ্বংসের দামামায় যখন বিশ্ববাসী উদ্বিগ্ন, ঠিক তখনই শান্তিপ্রিয় মানুষের মনে স্বস্তির সুবাতাস বয়ে আনল যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত।
একক সিদ্ধান্তে চাইলেই কোনো দেশের ওপর যুদ্ধের বিভীষিকা চাপিয়ে দিতে পারবেন না প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প; তার এই একচ্ছত্র সামরিক ক্ষমতায় এবার কড়া লাগাম পরিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ।
কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া যুদ্ধ ঘোষণার পথ বন্ধ করে দেওয়া এই প্রস্তাব পাসের ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে সংঘাত ও রক্তপাতের বদলে শান্তির সপক্ষে এক অনন্য বিজয় হিসেবেই দেখছেন শান্তিকামী বিশ্ববাসী। খবর দ্য গার্ডিয়ানের।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সংঘাত ঘিরে বহুমুখী মেরুকরণ ও উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। একদিকে ট্রাম্পের যুদ্ধক্ষমতা খর্ব হলো, অন্যদিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি অভিযোগ করেছেন, সামরিকভাবে ব্যর্থ হয়ে শত্রুরা এখন ইরানের ভেতরে বহুমুখী বিভাজন সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে।
এর পাশাপাশি, হরমুজ প্রণালি ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল চাপ ও হুমকি সত্ত্বেও ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখে চলেছে মধ্যপ্রাচ্যের নিরপেক্ষ দেশ ওমান।
ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক ধাক্কা
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একক ক্ষমতা খর্ব করতে যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে বুধবার গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবটি পাস হয়েছে। ২১৫-২০৮ ভোটে পাস হওয়া এই প্রস্তাব অনুযায়ী, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ট্রাম্প ইরান ইস্যুতে নতুন করে কোনো সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারবেন না, অন্যথায় তাকে বাধ্য হয়ে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘যুদ্ধ ক্ষমতা আইন’ অনুযায়ী, ৯০ দিনের বেশি সময় ধরে কোনো সংঘাত চললে প্রেসিডেন্টকে অবশ্যই কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হয়। ডেমোক্র্যাটদের আনা এই প্রস্তাবের পক্ষে ট্রাম্পের নিজ দলের চারজন বিদ্রোহী রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাও ভোট দিয়েছেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নিজ দলের একাংশের এই প্রকাশ্য অবস্থান ট্রাম্পের জন্য বড় ধরনের একটি রাজনৈতিক ধাক্কা। বর্তমানে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের জেরে জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্বজুড়ে তেলের দাম বাড়ছে। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে খোদ রিপাবলিকান শিবিরের মধ্যেই গভীর শঙ্কা কাজ করছে।
মোজতবা খামেনির সতর্কবাণী
যুক্তরাষ্ট্রের এই রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যেই ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি তার দেশবাসীকে সতর্ক করেছেন।
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির ৩৭তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া এক বিশেষ বার্তায় তিনি বলেন, সামরিক ক্ষেত্রে শোচনীয় পরাজয় ও ‘চূড়ান্ত আঘাত’ পাওয়ার পর শত্রুরা এখন ইরানের ভেতরে বিভাজন সৃষ্টির লক্ষ্যে বহুমুখী যুদ্ধের পথ বেছে নিয়েছে।
৮ মার্চ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মনোনীত হওয়ার পর থেকে জনসমক্ষে না আসা মোজতবা খামেনি তার এক্স অ্যাকাউন্টে এই বার্তা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, শত্রুরা এখন ইরানি জনগণের টিকে থাকার অদম্য ক্ষমতা ভেঙে দেওয়া এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তে বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা করছে।
তারা মানুষের মনে সন্দেহ, হতাশা, ভয় ও অবিশ্বাসের বীজ বপন করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদ ৮০ বছর ধরে ইসরায়েল নামে একটি সামরিক ঘাঁটি তৈরি করে রেখেছে এবং তারা অবৈধ ‘বৃহত্তর ইসরায়েলের’ পূর্ব সীমান্তে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন রাষ্ট্র ইরানের অস্তিত্ব কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের চাপ উপেক্ষা ওমানের
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষ দেশ ওমান হরমুজ প্রণালি ইস্যুতে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল চাপ উপেক্ষা করে চলেছে।
মাসকাট জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক আইন মেনে এই জলপথ পরিচালনার বিষয়েই কেবল তেহরানের সঙ্গে তাদের আলোচনা চলছে। তবে ওমানের এই অবস্থান নিয়ে গভীর সন্দেহ প্রকাশ করেছে ওয়াশিংটন।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ওমানের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। এমনকি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ওমানে বোমা হামলারও হুমকি দিয়েছেন। পরিবেশগত ক্ষতিপূরণ ও নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর ফি আরোপের জন্য পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি নামে ইরান যে সংস্থা তৈরি করেছে, ওমান গোপনে এতে সমর্থন দিচ্ছে বলে আশঙ্কা যুক্তরাষ্ট্রের।
ট্রাম্প নিজের বাঁধানো যুদ্ধ থামিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রকাশ্যে প্রবল আশাবাদী হলেও ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোর এই পরস্পরবিরোধী অবস্থান পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে একতরফা সামরিক অভিযান শুরু করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও তার মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র ইসরায়েল।
তবে তেহরানকে দ্রুত আত্মসমর্পণ করানোর যে ছক ওয়াশিংটন ও তেল আবিব কষেছিল, তা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ৮ এপ্রিল দুই পক্ষের মধ্যে প্রথমে ১৪ দিনের একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।
পরবর্তী সময়ে একটি স্থায়ী ‘শান্তি চুক্তির সম্ভাবনা’ তৈরি হওয়ার কথা জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়িয়ে দেন। তবে, সম্প্রতি যুদ্ধবিরতির মধ্যেই দুই পক্ষ পাল্টাপাল্টি হামলার অভিযোগ তুলেছে।