প্রবা ডেস্ক
প্রকাশ : ২৯ ডিসেম্বর ২০২২ ২০:৩৩ পিএম
আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০২৩ ১৯:৩৭ পিএম
কাজাখস্তানের আলমাতি শহরে একটি আন্তর্জাতিক দাবা প্রতিযোগিতায় হিজাব না পরে দ্বিতীয়বারের মতো অংশ নেন ইরানি নারী দাবাড়ু সারা খাদেমি। ২৮ ডিসেম্বর তোলা। ছবি : সংগৃহীত
ইরানি নারী দাবাড়ু সারা খাদেমি ফের হিজাব না পরে বুধবার কাজাখস্তানের একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছেন। কাজাখস্তানের আলমাতি শহরে সদ্যসমাপ্ত এফআইডিই ওয়ার্ল্ড র্যাপিড ও ব্লিটজ চেজ চ্যাম্পিয়নশিপে সোমবার হিজাব না পরে প্রথমবারের মতো অংশ নেন তিনি। সোমবার ২৬ ডিসেম্বর শুরু হয়ে টুর্নামেন্টটি বুধবার ২৮ ডিসেম্বর শেষ হয়।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, টুর্নামেন্টের প্রথম দিন সোমবার (২৬ ডিসেম্বর) একটি ইভেন্টে হিজাব না পরে অংশে নেন সরসাদত খাদেমলশারিহ ওরফে সারা খাদেমি। এরপর বুধবার আরেকটি ইভেন্টেও তিনি হিজাব না পরে অংশ নেন। ইন্টারন্যাশনাল চেজ ফেডারেশন ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে দাবায় খাদেমির অবস্থান ৮০৪।
ইরানি সংবাদমাধ্যম খবরভারজেশি ও ইতেমাদ খাদেমির স্কার্ফবিহীন খেলার ছবি প্রকাশ করেছে। তবে খাদেমির ইনস্টাগ্রাম পেজে এই রকম কোনো ছবি প্রকাশ করা হয়নি। অন্যদিকে ওই বিষয়ে জানতে খাদেমির সঙ্গে যোগাযোগ করে কোনো সাড়া পায়নি রয়টার্স।
হিজাব বা স্কাফ ইস্যুতে ইরানে চলমান আন্দোলনে ইতঃপূর্বে দেশটির নানান অঙ্গনের মানুষ বিভিন্নভাবে সমর্থন জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন টুর্নামেন্টে অংশ নিয়ে মাথায় স্কার্ফ না পরে চলমান আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন দেশটির অনেক নারী খেলোয়াড়। ইরানি নারী খেলোয়াড়দের স্কার্ফ পরিধান বাধ্যতামূলক।
গত অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ার এক প্রতিযোগিতায় ইরানি ক্লাইম্বার এলনাজ রেকাবি স্কার্ফবিহীন অংশ নেন। এরপর প্রতিযোগিতা শেষ হওয়ার আগেই তাকে দেশে ফেরত আনা হয়। বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানাতে ভিড় জমায় হাজারো তরুণ-তরুণী। দেশে ফেরার পর বাড়িতে যেতে না দিয়ে রেকাবিকে সপ্তাহখানেক গোপন স্থানে আটক রাখা হয়।
নভেম্বরে তেহরানে এক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে এক নারী তীরন্দাজ কৌশলে মাথা থেকে স্কার্ফ ফেলে দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এক ভিডিও দেখে মনে হয়, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই স্কার্ফ ফেলে দিয়েছেন। পর্যবেক্ষকদের ধারণা, আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানাতেই তিনি তেমনটি করেছেন।
সদ্যসমাপ্ত বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে নিজেদের প্রথম ম্যাচে জাতীয় সংগীত গাওয়া থেকে বিরত থাকেন ইরানের ফুটবলাররা। এটা বেশ আলোড়ন তৈরি করে। আন্দোলনে সংহতি জানাতে দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তারা তা করেন বলে জানা যায়। অবশ্য, পরবর্তী দুটি ম্যাচে চাপের মুখে তারা জাতীয় সংগীত গাইতে বাধ্য হন।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর তেহরান থেকে মাহসা আমিনি নামের এক কুর্দি তরুণীকে গ্রেপ্তার করে ইরানের নৈতিকতা বিষয়ক পুলিশ। যথাযথভাবে হিজাব না পরার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রেপ্তারের পরপরেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তিনি কোমায় চলে যান।
১৬ সেপ্টেম্বর আমিনিকে মৃত ঘোষণা করে পুলিশ। এরপর ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ইরানের প্রধান শহরগুলোয় বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে তা দাবানলের মতো ইরানের সব প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে।
স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণীরা মাথার স্কার্ফ খুলে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। রাস্তায় নেমে চুল কেটে, স্লোগানে স্লোগানে বাধ্যতামূলক হিজাবের প্রতিবাদ জানায়। আন্দোলন বড় হতে থাকে, ছড়িয়ে পড়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন মহলে। যুক্ত হতে থাকে নানান দাবি।
প্রবাসী ইরানিরাও নানাভাবে আন্দোলনের প্রতি সমর্থন ও সংহতি প্রকাশ করেন। নির্মমভাবে বিক্ষোভ দমনের অভিযোগে, ইরানের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও সংস্থার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। গত মাসে ইরানের বিক্ষোভে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল।
ইরানের বিকল্প সংবাদসংস্থা হারানা নিউজের তথ্য মতে, আন্দোলনে গত বৃহস্পতিবার (২২ ডিসেম্বর) পর্যন্ত ইরানের বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে অন্তত ৫০৭ বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। নিহতদের ৬৯ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক। আটক হয়েছে ১৫ হাজারের বেশি। আটকদের বিচার শুরু করেছে সরকার। ইতোমধ্যে দুজনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। আর বিক্ষোভকারীদের হামলায় নিহত হয়েছেন নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর ৬৬ সদস্য।