× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পাল্টা জবাব দিচ্ছে ইরান, অনিশ্চিত পথে মধ্যপ্রাচ্য

প্রবা প্রতিবেদন

প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০২৬ ২২:৪৭ পিএম

আপডেট : ০২ মার্চ ২০২৬ ২২:৫৭ পিএম

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও তার স্ত্রীর মৃত্যু এবং একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ১৬৮ জন শিক্ষার্থীসহ অন্তত ৫৫৫ জন নিহতের ঘটনায়, প্রতিশোধ নিতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং কাতার, কুয়েত ও সৌদির জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বর্ষণ করেছে ইরান ও তার মিত্ররা। ছবি: সিএনএন

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও তার স্ত্রীর মৃত্যু এবং একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ১৬৮ জন শিক্ষার্থীসহ অন্তত ৫৫৫ জন নিহতের ঘটনায়, প্রতিশোধ নিতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং কাতার, কুয়েত ও সৌদির জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বর্ষণ করেছে ইরান ও তার মিত্ররা। ছবি: সিএনএন

ইরানের রাজধানী তেহরানসহ গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে গত শনিবার সকাল থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও তার স্ত্রীর মৃত্যু এবং একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ১৬৮ জন শিক্ষার্থীসহ অন্তত ৫৫৫ জন নিহতের ঘটনায় পুরো মধ্যপ্রাচ্য এখন এক ভয়াবহ যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এই হামলার প্রতিশোধ নিতে ইরান ও তার মিত্ররা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং কাতার, কুয়েত ও সৌদির জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বর্ষণ করায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে, যার ফলে ইউরোপে গ্যাসের দাম একলাফে প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অভিযানকে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ আখ্যা দিয়ে একে ‘অনন্ত যুদ্ধ’ না করার প্রতিশ্রুতি দিলেও পেন্টাগন আরও প্রাণহানির আশঙ্কা করছে। অন্যদিকে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি সরাসরি যুদ্ধে অংশ না নিয়ে শুধুমাত্র রক্ষণাত্মক কাজে তাদের ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের ১২টি দেশে ছড়িয়ে পড়া এই সংঘাত কেবল মানাবিক বিপর্যয়ই ডেকে আনেনি, বরং গত কয়েক দশকের স্থিতিশীলতা ভেঙে দিয়ে পুরো অঞ্চলকে এক অনিশ্চিত ও দীর্ঘমেয়াদী সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। 

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা সোমবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর তেল আবিবের কার্যালয় এবং হাইফার গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। ইরানি বার্তা সংস্থা ফারস জানিয়েছে, এই অভিযানে তাদের অত্যাধুনিক ‘খাইবার’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে। বিবিসি জানিয়েছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা বেইত শেমেশ এলাকা পরিদর্শন করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।  

আল জাজিরা ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছে ইরান, যেখানে যৌথ বাহিনীর হামলায় এ পর্যন্ত অন্তত ৫৫৫ জন নিহত হয়েছেন। আর খামেনির আহত স্ত্রী মানসুরেহ খোজাস্তেহ-ও চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন বলে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলে ১০ জন এবং আরব আমিরাত, কুয়েত ও বাহরাইনে আরও ৫ জন বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া লেবাননে ১৩ জন এবং ইরাকে ২ জন নিহত হওয়ার পাশাপাশি এই অঞ্চলে অন্তত ৪ জন মার্কিন সামরিক সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। কাতার, ওমানসহ বিভিন্ন দেশে কয়েকশ মানুষ আহত হয়েছেন। এ প্রতিবেদন লেখার সময় কুয়েতে মার্কিন দূতাবাসসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান শহরগুলোতে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া যায়, যা উল্লেখ করে ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ফন দার লিয়েন এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। 

জেরুজালেমে নিযুক্ত আন্তর্জাতিক সাংবাদিকরা একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ নিশ্চিত করেছেন। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, তারা আকাশপথে আসা অনেকগুলো ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে। তবে পাল্টা জবাব হিসেবে ইসরায়েল তেহরানে আরও বিস্তৃত পরিসরে বিমান হামলা শুরু করেছে। ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের দাবি, তারা বৈরুতে এক নিখুঁত অভিযানে হিজবুল্লাহর গোয়েন্দা সদর দপ্তরের প্রধান হোসেন মাকলেদকে হত্যা করেছে।

পেন্টাগনে এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছেন, ইরানে এই সামরিক অভিযান কোনো দীর্ঘমেয়াদী বা ‘অনন্ত যুদ্ধে’ রূপ নেবে না। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অধীনে আমরা এই যুদ্ধ শেষ করছি।” হেগসেথের মতে, অভিযানের মূল লক্ষ্য ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার, নৌবাহিনী ও পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করা।

এদিকে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আগামী ৪-৫ সপ্তাহ এই অভিযান চলতে পারে। খামেনির মৃত্যু নিয়ে দম্ভোক্তি করে ট্রাম্প বলেন, “খামেনি আমাকে মারার দুইবার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তার আগেই আমি তাকে মেরেছি।” 

এই সংঘাত কেবল ইরান এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কুয়েতে কুয়াশাচ্ছন্ন পরিস্থিতির মধ্যে ‘ভুলবশত’ কুয়েতি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। এতে মার্কিন বাহিনীর নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৪ জনে দাঁড়িয়েছে। 

উপসাগরীয় দেশগুলো—সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান এবং বাহরাইন—এখন এক চরম বাস্তবতার মুখোমুখি। তারা যুদ্ধ থামাতে লবি করলেও ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র এখন তাদের আকাশসীমায়। ওমান উপকূলে বিস্ফোরক বোঝাই নৌকা দিয়ে তেলের ট্যাংকারে হামলায় ক্রু নিহত হওয়ার ঘটনা এবং সৌদি আরবের রাস তানুরা তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলার চেষ্টা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। 

সংঘাতের তীব্রতা দেখে লেবানন সরকার একটি নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম হিজবুল্লাহর সমস্ত সামরিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন এবং তাদের অস্ত্র হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছেন। হিজবুল্লাহর অবস্থানগুলোতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় লেবাননে এখন পর্যন্ত ৩১ জন নিহত হয়েছেন।

কাতারের জ্বালানি উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে এর তীব্র প্রভাব পড়েছে। ইউরোপে গ্যাসের দাম গত কয়েক দিনে ৫০ শতাংশ বেড়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি গ্যাস সমন্বয় সভার ডাক দিয়েছে। এদিকে হরমুজ প্রণালী বন্দের প্রভাবে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে ব্যারেল ৭১ ডলারের ওপর লেনদেন হচ্ছে।   

ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা নাজাফি দাবি করেছেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের নাতাঞ্জ পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রধান রাফায়েল গ্রোসি জানিয়েছেন, পারমাণবিক স্থাপনায় বড় ধরনের কোনো আঘাতের আলামত এখন পর্যন্ত তাদের পর্যবেক্ষণে আসেনি।

ইরানের ওপর এই আগ্রাসন নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একমাত্র ইইউ সদস্য হিসেবে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সরাসরি ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের এই একতরফা হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তবে ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য সরাসরি হামলায় অংশ না নিলেও ভবিষ্যতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করতে যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। আর বাল্টিক দেশ লাতভিয়া ও লিথুয়ানিয়া খামেনির মৃত্যুকে স্বাগত জানিয়ে একে ‘ইরানিদের জন্য স্বস্তির মুহূর্ত’ বলে অভিহিত করেছে। আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মাইকেল মার্টিন সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনার টেবিলে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন।

তেহরানে শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বর্ষণ দোহা, দুবাই এবং মানামার মতো স্থিতিশীল শহরগুলোর ‘নিরাপদ মরুদ্যান’ ভাবমূর্তি ধূলিসাৎ করে দিয়েছে, যা উপসাগরীয় দেশগুলোকে এক কঠিন ও বিষণ্ণ বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, জিসিসিভুক্ত দেশগুলো এই সংঘাত থামাতে দীর্ঘ প্রচেষ্টা চালালেও এখন তাদের সামনে কেবল দুটি প্রতিকূল পথ খোলা—হয় যুদ্ধে জড়িয়ে ইসরায়েলের মিত্র হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ঝুঁকি নেওয়া, অথবা নিশ্চুপ থেকে নিজেদের সমৃদ্ধ শহর ও অবকাঠামো পুড়তে দেখা। এই পরিস্থিতি কেবল ওই অঞ্চলের পর্যটন ও বিনিয়োগের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, বরং বছরের পর বছর চলা ‘ছায়াযুদ্ধের’ অবসান ঘটিয়ে মধ্যপ্রাচ্যকে সরাসরি ‘রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্র’ যুদ্ধের এক নতুন ও ভয়াবহ যুগে ঠেলে দিয়েছে যেখানে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় দেশগুলোকে এখন অতি দ্রুত নতুন কোনো সামরিক বা কূটনৈতিক কৌশল বেছে নিতে হচ্ছে। 

তবে মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স সোমবার ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন, “ইসরায়েল ও সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ওপর হামলা চালাতে চাপ দিয়েছে। নেতানিয়াহু গাজায় ৭২ হাজার মানুষকে হত্যা করেছেন, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। সৌদি আরব একটি নির্মম একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যেখানে কোনো বিরোধী মতের স্থান নেই। এসব নেতারাই ইরানে ‘স্বাধীনতা’ আনতে চায়? কেউ কি সত্যিই এটা বিশ্বাস করে?” 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা