প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০১ মার্চ ২০২৬ ১০:১০ এএম
আপডেট : ০১ মার্চ ২০২৬ ১০:৩৪ এএম
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ছবি: সংগৃহীত
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন। তার মৃত্যুতে ইরানজুড়ে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে।
দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ব্রডকাস্টিং (আইআরআইবি) রবিবার সকালে এক ঘোষণায় এ তথ্য জানায়।
ইরানের প্রতিরোধকে ভিন্ন মাত্রাদানকারী কে এই খামেনি
৮৬ বছর বয়সী এই ইসলামি চিন্তাবিদ ১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা রুহল্লাহ খোমেনির উত্তরসূরি। খোমেনি ছিলেন সেই ক্যারিশম্যাটিক নেতা, যিনি ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের নেতৃত্ব দেন, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলাভির শাসনের অবসান ঘটে।
সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে খামেনির হাতে রাষ্ট্রের সব শাখা- সরকার, সামরিক বাহিনী ও বিচার বিভাগের ওপর চূড়ান্ত কর্তৃত্ব রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি দেশের আধ্যাত্মিক নেতাও।
যেখানে খোমেনি পাহলভি রাজতন্ত্রের শাসনের অবসান ঘটানো বিপ্লবের আদর্শিক শক্তি ছিলেন, সেখানে খামেনেই গড়ে তুলেছিলেন সেই সামরিক ও আধাসামরিক কাঠামো, যা ইরানের শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা গড়ে তোলে এবং দেশের সীমানার বাইরেও প্রভাব বিস্তারের ভিত তৈরি করে।
সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার আগে তিনি ১৯৮০’র দশকে ইরাকের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নেতৃত্ব দেন। দীর্ঘস্থায়ী সেই সংঘাত, এবং পশ্চিমা দেশগুলো যখন ইরাকি নেতা সাদ্দাম হোসেনকে সমর্থন দেয়—এতে বহু ইরানির মধ্যে বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি জন্মায়। বিশ্লেষকদের মতে যা খামেনির মধ্যে পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি গভীর অবিশ্বাস তৈরি করে।
এই মনোভাবই তার কয়েক দশকের শাসনের ভিত্তি হয়ে ওঠে এবং এই ধারণাকে দৃঢ় করে যে, ইরানকে বাইরের ও অভ্যন্তরীণ হুমকির বিরুদ্ধে সর্বদা প্রতিরক্ষামূলক অবস্থায় থাকতে হবে।
ইরান বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও ইরান’স গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজি: আ পলিটিকাল হিস্টরি বইয়ের লেখক ভালি নাসর বলেন, “মানুষ [ইরানকে] একটি ধর্মতন্ত্র হিসেবে দেখে, কারণ তিনি (খামেনি) পাগড়ি পরেন এবং রাষ্ট্রের ভাষা ধর্মের ভাষা; কিন্তু বাস্তবে তিনি ছিলেন একজন যুদ্ধকালীন প্রেসিডেন্ট, যিনি যুদ্ধ থেকে এই ধারণা নিয়ে বেরিয়ে আসেন যে ইরান ঝুঁকিপূর্ণ এবং নিরাপত্তার প্রয়োজন।
“যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন; এবং বিপ্লব, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ আলাদা নয়—তাই এগুলোকে রক্ষা করা প্রয়োজন।”
এই দৃষ্টিভঙ্গির অধীনে ইসলামিক বেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) একটি আধাসামরিক বাহিনী থেকে পরিণত হয় শক্তিশালী নিরাপত্তা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে, যা আঞ্চলিক পর্যায়ে ইরানের প্রভাব বিস্তারের কেন্দ্রে পরিণত হয়।
একইসঙ্গে খামেনি ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’ নীতিও এগিয়ে নেন, যাতে কঠোর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে স্বনির্ভরতা গড়ে তোলা যায়। তিনি পশ্চিমের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়ে গভীর সংশয় বজায় রাখেন এবং তার প্রতিরক্ষাকেন্দ্রিক মনোযোগ প্রয়োজনীয় সংস্কারের পথে বাধা সৃষ্টি করছে বলে যারা মনে করতেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন।
তবে তার শাসনামল নানা সময়ে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়ে। ২০০৯ সালে কথিত কারচুপিপূর্ণ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে রাস্তায় নামা বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে এবং ২০২২ সালে নারী অধিকার ইস্যুতে ব্যাপক প্রতিবাদ হলে সেখানে কঠোর দমন-পীড়ন চালানো হয়।
সম্ভবত তার শাসনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আসে জানুয়ারিতে, যখন অর্থনৈতিক সংকটকে ঘিরে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দেশব্যাপী আন্দোলনে রূপ নেয় এবং বহু বিক্ষোভকারী সরাসরি ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পতনের দাবি তোলে। সে সময় ইরানি কর্তৃপক্ষ কঠোরভাবে দমন অভিযান চালায়, যা ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে অন্যতম সহিংস সংঘর্ষে পরিণত হয়।
সমালোচকদের দৃষ্টিতে, তিনি একটি তরুণ জনগোষ্ঠীর চাহিদা—যারা বিচ্ছিন্নতাবাদ ও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে অবিরাম ছায়াযুদ্ধের বদলে সংস্কার ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন চায়—তা বোঝার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন।
নাসর বলেন, “জাতীয় স্বাধীনতার ওপর এই মাত্রার জোর দেওয়ার জন্য ইরানিদের অত্যন্ত উচ্চ মূল্য দিতে হয়েছে—এই প্রক্রিয়ায় তিনি ইরানি জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন, কারণ তারা আর এই স্বাধীনতার প্রজ্ঞায় বিশ্বাস করছিল না।”
তার শাসনামলে ইরান পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক, কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং দেশের ভেতরে অর্থনীতি ও নাগরিক অধিকার ইস্যুতে একাধিক দফা বিক্ষোভের মুখোমুখি হয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ‘এক নম্বর শত্রু’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন; ইসরায়েল তার পরেই রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন।
খামেনি দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, ইরান কখনও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না এবং তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি কেবল বেসামরিক উদ্দেশ্যে। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা কিংবা জাতিসংঘের পারমাণবিক তদারকি সংস্থাও ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে- এমন প্রমাণ পায়নি। তবে ইসরায়েল এবং ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু মহল এই অভিযোগ তুলে আসছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কী বলেছে?
খামেনিকে হত্যার বিষয়টি নিজের ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে নিশ্চিত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্প লিখেন, “খামেনি, ইতিহাসের অন্যতম নিকৃষ্ট ব্যক্তিদের একজন, মারা গেছেন। এটি ইরানের জনগণের জন্য নিজেদের দেশ পুনরুদ্ধারের একমাত্র শ্রেষ্ঠ সুযোগ।”
তিনি বলেন, “ইরানের ভেতরে কিছু মানুষ দায়মুক্তি (ইমিউনিটি) পাওয়ার চেষ্টা করছেন।”
এদিকে তাতক্ষণিকভাবে খামেনির মৃত্যুর বিষয়টি স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করেননি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তবে ঘটনার পর এক সংক্ষিপ্ত টিভি ভাষণে নেতানিয়াহু বলেন, এমন অনেক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি আর নেই।
তিনি আরও বলেছেন, বিপ্লবী গার্ড কমান্ডার ও ঊর্ধ্বতন পারমাণবিক কর্মকর্তাদের হত্যা করা হয়েছে।
একইসঙ্গে তিনি ইরানি নাগরিকদের ‘রাজপথে নেমে কাজ শেষ করার’ আহ্বান জানিয়েছেন।
এর আগে গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের ১২ দিনের হামলা ও তার জবাবে তেহরানের পাল্টা আক্রমণের পর ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেন, খামেনি “আর অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারেন না।”
তিনি বলেন, “খামেনির মতো একজন স্বৈরশাসক, যিনি ইরানের মতো একটি রাষ্ট্রের নেতৃত্বে আছেন এবং যার ভয়াবহ লক্ষ্য ইসরায়েলকে ধ্বংস করা- তার আর টিকে থাকার অধিকার নেই।”
একই মাসে নেতানিয়াহু দাবি করেন, খামেনিকে হত্যার পদক্ষেপ নিলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দীর্ঘদিনের সংঘাতের “সমাপ্তি” ঘটতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বক্তব্যে বলেছিলেন, ইরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন হলে সেটিই হবে “সবচেয়ে ভালো ঘটনা” এবং নেতৃত্ব গ্রহণের জন্য “লোকজন রয়েছে।”
সাম্প্রতিক হামলার লক্ষ্য কী ছিল?
হামলার পর দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প ইরানের নৌবাহিনী ও ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি “ধ্বংস করে দেওয়ার” অঙ্গীকার করেন এবং ইরানের জনগণকে সরকার উৎখাতের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, “আমরা শেষ করলে আপনারাই সরকার গ্রহণ করুন। এটি প্রজন্মের পর প্রজন্মে সম্ভবত আপনাদের একমাত্র সুযোগ।”