প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২১:৫৫ পিএম
আপডেট : ০২ মার্চ ২০২৬ ০১:২৪ এএম
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পারমাণবিক বিস্তার নিয়ে আলোচনা উঠলেই সাধারণত ইরান বা উত্তর কোরিয়ার নাম সামনে আসে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আরেকটি সম্ভাব্য ইস্যু নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে—তুরস্ক ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্রের পথে হাঁটতে পারে কি না। এই সম্ভাবনা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করা হলেও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য এবং পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি)-র স্বাক্ষরকারী দেশ। দেশটির ভূখণ্ডে ন্যাটোর পারমাণবিক শেয়ারিং ব্যবস্থার আওতায় মার্কিন কৌশলগত অস্ত্রও সংরক্ষিত রয়েছে। তবু অতীতে প্রেসিডেন্ট রেচেপ তাইয়েপ এরদোয়ান প্রশ্ন তুলেছিলেন—কেন কিছু দেশ পারমাণবিক অস্ত্র রাখতে পারবে, আর অন্যরা পারবে না? এই বক্তব্য এবং সিরিয়া, লিবিয়া ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত তৎপরতা বিশ্লেষকদের মধ্যে নানা জল্পনা তৈরি করেছে।
ইসরায়েলের জন্য প্রভাব
ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে ‘পারমাণবিক অস্পষ্টতা’ নীতি অনুসরণ করে এসেছে—অর্থাৎ আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখা। পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামো অত্যন্ত সংবেদনশীল। সেখানে তুরস্কের মতো প্রভাবশালী একটি দেশের সম্ভাব্য পারমাণবিক সক্ষমতা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
তুরস্কের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক গত এক দশকে ওঠানামার মধ্য দিয়ে গেছে। তুরস্ক লেভান্ত অঞ্চলে সক্রিয় এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন একটি পারমাণবিক শক্তির আবির্ভাব ভুল হিসাব, উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য অস্ত্র প্রতিযোগিতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
ভারতের জন্য উদ্বেগ
ভারত ইতোমধ্যে দুই পারমাণবিক প্রতিবেশী—পাকিস্তান ও চীন—এর সঙ্গে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আঙ্কারা ও ইসলামাবাদের মধ্যে কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নয়াদিল্লির নজর এড়ায়নি। যদি তুরস্ক ভবিষ্যতে পারমাণবিক শক্তিধর দেশে পরিণত হয় এবং পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও গভীর করে, তবে তা ভারতের নিরাপত্তা হিসাবকে জটিল করে তুলতে পারে। পশ্চিম এশিয়া, পূর্ব ভূমধ্যসাগর ও আফ্রিকায় ভারতের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ বাড়ছে—সেসব অঞ্চলে তুরস্কের প্রভাবও দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে।
ভারত নিজে এনপিটির বাইরে থেকেও দায়িত্বশীল পারমাণবিক নীতি অনুসরণের কথা বলে এসেছে। ফলে ন্যাটোর সদস্য কোনও দেশ যদি নতুন করে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করে, তবে তা বৈশ্বিক বিস্তার রোধ ব্যবস্থার জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হবে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিরুদ্ধে যে ‘নিউক্লিয়ার ট্যাবু’ বা অলিখিত নৈতিক বাধা দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর ছিল, তা ধীরে ধীরে দুর্বল হচ্ছে বলে অনেকে মনে করেন। প্রতিটি নতুন পারমাণবিক শক্তিধর দেশ এই মানসিক ও কূটনৈতিক বাধাকে আরও ক্ষয় করে। বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা, আঞ্চলিক সংঘাত ও বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার যুগে এমন প্রবণতা আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
তুরস্ক অবশ্য আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির কোনও ইচ্ছা অস্বীকার করেছে। রাশিয়ার সহযোগিতায় আক্কুইউ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণসহ তাদের কর্মসূচিকে সম্পূর্ণ বেসামরিক বলা হচ্ছে। তবে ইতিহাস দেখায়, বেসামরিক পরিকাঠামো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বদলালে দ্রুত সামরিক সক্ষমতায় রূপ নিতে পারে।
কূটনৈতিক সতর্কতা জরুরি
পরিস্থিতি তাৎক্ষণিক আতঙ্কের নয়, বরং কৌশলগত সতর্কতার দাবি রাখে। ইসরায়েল ও ভারতের উচিত ন্যাটো অংশীদারদের সঙ্গে সংলাপ জোরদার করা, আঞ্চলিক কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানো এবং বৈশ্বিক বিস্তার রোধ কাঠামোকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া।
বিশ্ব যখন ইতোমধ্যেই পারমাণবিক বিস্তারের চাপে রয়েছে, তখন ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের সন্ধিক্ষণে অবস্থিত একটি প্রভাবশালী দেশের সম্ভাব্য পারমাণবিক সক্ষমতা শুধু আঞ্চলিক ভারসাম্যই বদলাবে না—এটি বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভিত্তিকেও নাড়া দিতে পারে।