প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২৩:৪৩ পিএম
আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২৩:১৫ পিএম
হামাস গাজায় প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী (আইএসএফ)-এ পাকিস্তানের অংশগ্রহণ নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছে। ইসলামাবাদ এ পদক্ষেপকে ফিলিস্তিনিদের কল্যাণে সহায়ক উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেছে। তবে দেশটির ভেতরে তীব্র রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং আঞ্চলিক মহলে প্রশ্নের মুখে পড়েছে পাকিস্তানের অবস্থান।
গাজার জন্য আইএসএফ ধারণাটি উঠে আসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়ায় এ পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরবর্তীতে ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ২৮০৩ নম্বর প্রস্তাব গ্রহণ করে, যেখানে গাজায় অন্তর্বর্তী শাসন সহায়তা, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং নিরস্ত্রীকরণ তদারকির জন্য একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী গঠনের অনুমোদন দেওয়া হয়। ভোটাভুটিতে পাকিস্তান প্রস্তাবের পক্ষে অবস্থান নেয়; রাশিয়া ও চীন বিরত থাকে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রোবিও পাকিস্তানের অংশগ্রহণের আগ্রহকে স্বাগত জানান। কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, ইসলামাবাদ প্রায় ৩,৫০০ সেনা পাঠানোর সম্ভাবনা বিবেচনা করছে। তবে আইএসএফের ম্যান্ডেট এখনো অস্পষ্ট—আইনি কর্তৃত্ব, কমান্ড কাঠামো, অর্থায়ন, মেয়াদ এবং হামাস নিরস্ত্রীকরণে ভূমিকা নিয়ে স্পষ্টতা নেই।
পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার জোর দিয়ে বলেছেন, পাকিস্তান শান্তিরক্ষা ভূমিকা নিতে পারে, কিন্তু শান্তি প্রয়োগ বা হামাসকে নিরস্ত্রীকরণে অংশ নেবে না। নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও নিরস্ত্রীকরণকে ‘রেড লাইন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অপরদিকে হামাস প্রস্তাবটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, নিরস্ত্রীকরণের দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো বাহিনী নিরপেক্ষ হতে পারে না।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারাও পাকিস্তানের অংশগ্রহণ নিয়ে আপত্তি তুলেছেন কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকা এবং গোয়েন্দা সহযোগিতা সংক্রান্ত উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে। ফলে ইসলামাবাদ দুই দিক থেকেই চাপে পড়েছে।
অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ
পাকিস্তানের ভেতরে ইসলামপন্থী দল ও বিরোধীরা এ সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করছে। মাওলানা ফজলুর রহমান প্রশ্ন তুলেছেন, গাজার চলমান সংকটের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান কীভাবে এমন একটি কাঠামোয় যোগ দেয় যেখানে ইসরায়েলি নেতৃত্বও সম্পৃক্ত। ইমরান খান অভিযোগ করেছেন, এটি গাজার ‘প্রতিরোধ শক্তি’ নিরস্ত্রীকরণের পরিকল্পনায় যুক্ত হওয়া। এছাড়া জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্ব ‘বোর্ড অব পিস’ উদ্যোগকে নতুন ধরনের উপনিবেশবাদ বলে আখ্যা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ফিলিস্তিন ইস্যুতে পাকিস্তানি সমাজে গভীর আবেগ ও ঐতিহাসিক সমর্থন রয়েছে। গাজা সংঘাতকালে দেশজুড়ে বড় বড় সমাবেশ হয়েছে এবং মানবিক সহায়তা পাঠানো হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে আইএসএফের যে কোনো ভূমিকা, যা ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে দেখা যেতে পারে, তা রাজনৈতিক অস্থিরতা ডেকে আনতে পারে।
আঞ্চলিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা
পাকিস্তানের অর্থনীতি বর্তমানে আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। সমালোচকদের আশঙ্কা, অর্থনৈতিক চাপে ইসলামাবাদ আইএসএফের বিস্তৃত ম্যান্ডেট মেনে নিতে বাধ্য হতে পারে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।
সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করেছে এবং জর্ডান ও মিসরের সঙ্গে সম্প্রসারিত অংশীদারিত্ব নিয়ে আলোচনা করছে। ফলে গাজা প্রশ্নে যেকোনো সিদ্ধান্ত আঞ্চলিক কূটনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
সামনে কী?
বিশ্লেষকদের ধারণা, পাকিস্তান আপাতত মানবিক স্থিতিশীলতা সহায়তার পক্ষে অবস্থান বজায় রাখবে এবং হামাস নিরস্ত্রীকরণে সরাসরি ভূমিকা এড়ানোর চেষ্টা করবে। তবে আইএসএফের কার্যক্রম যদি সক্রিয় নিরাপত্তা প্রয়োগ বা নিরস্ত্রীকরণে রূপ নেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা ও পাকিস্তানের ঘোষিত সীমারেখার মধ্যে সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।
হামাস ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর কাছে পাকিস্তানের অংশগ্রহণ একটি পরীক্ষার বিষয়—মুসলিম-প্রধান দেশগুলো আদৌ কতটা ‘প্রতিরোধের’ পক্ষে, নাকি আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ভিন্ন অবস্থান নেয়। অন্যদিকে ইসলামাবাদের জন্য এটি পররাষ্ট্রনীতির বিশ্বাসযোগ্যতা, অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ভারসাম্য রক্ষার কঠিন পরীক্ষা।
পরিস্থিতির পরবর্তী বিকাশই নির্ধারণ করবে, পাকিস্তানের ঘোষিত ‘রেড লাইন’ বাস্তব সীমা নাকি কেবল কূটনৈতিক দর-কষাকষির অংশ। আপাতত গাজা প্রশ্নে ইসলামাবাদ এমন এক সঙ্কটময় সমীকরণের মুখোমুখি, যেখানে যেদিকেই পদক্ষেপ নিক, সমালোচনা এড়ানো কঠিন।