× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নেতানিয়াহুর ‘হেক্সাগন’ জোটে সত্যিই কি যোগ দেবে ভারত

প্রবা প্রতিবেদন

প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:০৪ পিএম

আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:০৬ পিএম

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং নরেন্দ্র মোদি। কোলাজ: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং নরেন্দ্র মোদি। কোলাজ: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

মধ্যপ্রাচ্যকে ‘উগ্র’ সুন্নি ও শিয়া অক্ষে বিভক্ত করে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ‘হেক্সাগন অব অ্যালায়েন্সেস’ নামে একটি নতুন আঞ্চলিক জোট গঠনের পরিকল্পনার কথা বলেছেন। ‘উগ্র অক্ষগুলোর’ বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে অবস্থান নেওয়াই এই জোটের উদ্দেশ্য বলে জানান তিনি।

প্রস্তাবিত জোট প্রসঙ্গে রবিবার তিনি জানান, এই জোটে ইসরায়েল, ভারত, গ্রিস ও সাইপ্রাসসহ আরও কিছু আরব, আফ্রিকান ও এশীয় দেশ যুক্ত হতে পারে। 

নেতানিয়াহু বলেন, তিনি এমন একটি জোট কাঠামো গড়ে তুলতে চান যা মধ্যপ্রাচ্যকে ঘিরে একটি শক্তিশালী বলয় তৈরি করবে। তার দাবি, এই জোট একই বাস্তবতা, চ্যালেঞ্জ ও লক্ষ্য সম্পর্কে একমত দেশগুলোর সমন্বয়ে গঠিত হবে, যা তথাকথিত ‘উগ্র শিয়া অক্ষ’ এবং উদীয়মান ‘উগ্র সুন্নি অক্ষ’ এর মোকাবিলা করবে।

তবে এখন পর্যন্ত কোনো দেশ প্রকাশ্যে এই পরিকল্পনার সমর্থন জানায়নি। উপরন্তু, তিনি যেসব দেশের নাম উল্লেখ করেছেন, তার মধ্যে গ্রিস ও সাইপ্রাস আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সদস্য। গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি থাকায় তিনি এসব দেশে গেলে আইনত গ্রেপ্তারের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

লন্ডন কিংস কলেজের নিরাপত্তা অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ আল জাজিরাকে বলেন, নেতানিয়াহু হয়তো এই ধারণাটিকে অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করছেন। তার মতে, কিছু নিরাপত্তা সমন্বয় বা কৌশলগত যোগাযোগ থাকতে পারে, কিন্তু তা ন্যাটো-ধাঁচের আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটে রূপ নেবে- এমনটা বলা কঠিন। বরং এটি বিদ্যমান সম্পর্কগুলোর একটি ‘ব্র্যান্ডিং’ হিসেবেই দেখা যেতে পারে।

নেতানিয়াহু ‘‘উগ্র অক্ষ’’ বলতে কী বোঝাচ্ছেন?

নেতানিয়াহু মূলত ইরানকেন্দ্রিক তথাকথিত প্রতিরোধ অক্ষের কথা বলেছেন। যারা মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও পশ্চিমা প্রভাবের বিরোধিতা করে।

এই জোটের কেন্দ্রে রয়েছে ইরান। ইরান লেবাননের হিজবুল্লাহকে সমর্থন দিয়ে থাকে- যাকে দীর্ঘদিন ধরে তেহরানের ঘনিষ্ঠ এবং অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করা হতো। 

ইরাকে তেহরান বিভিন্ন শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে। এর মধ্যে রয়েছে পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেসের (পিএমএফ) অন্তর্ভুক্ত কিছু অংশ এবং কাতাইব হিজবুল্লাহর মতো সংগঠন।

সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনে জাইদি শিয়া আন্দোলনভিত্তিক হুথিরা প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। তাদেরও ইরান আর্থিক ও সামরিক সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র সরবরাহ করে বলে অভিযোগ রয়েছে।

‘উদীয়মান সুন্নি অক্ষ’ কি বাস্তব?

নেতানিয়াহু যে ‘সুন্নি অক্ষ’ গড়ে উঠছে বলে দাবি করছেন, বাস্তবে চিত্রটা তেমন নয়। ২০২৫ সালে ইসরায়েল অঞ্চলটির অন্তত ছয়টি দেশ- ফিলিস্তিন, ইরান, লেবানন, সিরিয়া ও ইয়েমেনে হামলা চালিয়েছে।

পাশাপাশি তিউনিসিয়া ও গ্রিসের আন্তর্জাতিক জলসীমাতেও অভিযান পরিচালনা করেছে। এ ছাড়া মিসর, তুরস্ক, সৌদি আরব, ইরাক ও জর্ডানকেও হুমকি দিয়েছে ইসরায়েল।

ইসরায়েলের এই আঞ্চলিক আগ্রাসী অবস্থানের প্রেক্ষাপটে বেশ কয়েকটি সুন্নি-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ কূটনৈতিকভাবে সমন্বয় করেছে।

এই সমন্বয়ের অংশ হিসেবে তারা যৌথ বিবৃতিতে সোমালিল্যান্ডকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ইসরায়েলি উদ্যোগের নিন্দা জানিয়েছে, সিরিয়ায় ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদ করেছে এবং গাজায় চলমান গণহত্যারও সমালোচনা করেছে।

ফেব্রুয়ারির শুরুতে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সৌদি আরব ও মিসর সফরেও ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড মোকাবিলার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কে টানাপোড়েন ছিল।

অ্যাটলান্টিক কাউন্সিলের নন-রেসিডেন্ট ফেলো ওমের ওজকিজিলচিক আল-জাজিরাকে বলেন, “আমরা দেখছি, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত প্রচেষ্টা বাড়ছে- যৌথ বিবৃতি, কূটনৈতিক উদ্যোগ, এমনকি সম্ভাব্য যৌথ প্রতিরক্ষা সহযোগিতার অনুসন্ধানও চলছে।”

তিনি আরও বলেন, “এটি কোনো আদর্শিক বা সুন্নিবাদভিত্তিক জোট নয়। বরং এটি ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা আচরণ। এসব দেশ কাকতালীয়ভাবে সুন্নি-সংখ্যাগরিষ্ঠ।”

ভারত কি সত্যিই যোগ দেবে?

নেতানিয়াহুর এই মন্তব্য এমন সময় এসেছে, যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইসরায়েল সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সফরকালে তিনি ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে ভাষণ দেওয়ার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, নিরাপত্তা সমন্বয় ও বাণিজ্য ইস্যুতে আলোচনা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

রবিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে মোদি দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ওপর গুরুত্বারোপ করে লিখেছেন, আস্থা, উদ্ভাবন এবং শান্তি ও অগ্রগতির অভিন্ন অঙ্গীকারের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বকে ভারত গভীরভাবে মূল্যায়ন করে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই নেতা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার করেছেন। তবে ভারত বরাবরই অত্যন্ত বাস্তববাদী কূটনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করে এসেছে।

জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে ভারত ঐতিহাসিকভাবে কঠোর জোট-রাজনীতি এড়িয়ে চলেছে। একই সঙ্গে তারা চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র- সবার সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রাখছে।

এ ছাড়া উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও ভারতের সুসম্পর্ক রয়েছে। ওই অঞ্চলে কর্মরত ভারতীয়রা প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠান।

বিশেষজ্ঞ ক্রিগ বলেন, “ঝুঁকিটা মূলত বার্তা দেওয়ার ধরনে।” নেতানিয়াহুর “অক্ষ বনাম অক্ষ” কাঠামো আঞ্চলিক মেরুকরণকে আরও কঠোর করে তুলতে পারে। এতে ইসরায়েলের প্রতিদ্বন্দ্বীরা- বিশেষ করে ইরান, তুরস্কসহ অন্যরা- ‘ঘেরাওয়ের শিকার’ হওয়ার বয়ান সহজেই দাঁড় করাতে পারবে। 

ক্রিগের মতে, নেতানিয়াহুর এই বক্তব্য ভারতকে মধ্যপ্রাচ্যের এমন বিভাজনরেখায় টেনে নিতে পারে, যেগুলোকে ভারত সাধারণত আদর্শিক নয়, বরং বাস্তববাদী উপায়ে সামাল দিতে চায়। ভারতের প্রধান আগ্রহ প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যে- ইসরায়েলের আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষায় সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ায় নয়।

গ্রিস ও সাইপ্রাসের ভূমিকা

২০১৬ সালে গঠিত ত্রিপক্ষীয় জোটের আওতায় গ্রিস ও সাইপ্রাসকে নিয়ে সর্বশেষ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বৈঠকে বসে ইসরায়েল। শুরুতে এই জোটের মূল লক্ষ্য ছিল জ্বালানি ও যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার দিকেও বিস্তৃত হয়েছে, যার একটি লক্ষ্য তুরস্ককে কৌশলগতভাবে মোকাবিলা করা।

২০২৫ সালে গ্রিস ইসরায়েল থেকে প্রায় ৭৬০ মিলিয়ন ডলারে ৩৬টি পিইউএলএস রকেট সিস্টেম কেনার অনুমোদন দেয়। এছাড়া প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের একটি বড় প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে দুই দেশের আলোচনা চলছে। এতে ইসরায়েল-নির্মিত বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকতে পারে।

সাইপ্রাসও ইসরায়েলের তৈরি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পেয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও সরঞ্জাম পাওয়ার কথা রয়েছে।

তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি একমুখী নয়। তুরস্ক ও গ্রিস সম্প্রতি সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছে। গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিৎসোটাকিস এ মাসের শুরুতে আঙ্কারা সফর করেছেন, সম্পর্ক স্থিতিশীল করা ও বাণিজ্য বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে।

ইসরায়েলি বিশ্লেষক ওরি গোল্ডবার্গের মতে, ইসরায়েলের নানা কৌশলগত অংশীদার থাকলেও এখন অনেক দেশই ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে সতর্ক। তার ভাষায়, ইসরায়েলের ভাবমূর্তি এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে এটি অনেকের কাছে অস্থিরতার কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, গ্রিস ও সাইপ্রাসের মূল আগ্রহ পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও জ্বালানি ইস্যুতে সীমাবদ্ধ। তারা বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কোনো জোটে জড়াতে ততটা আগ্রহী নয়।

এখনই কেন এই উদ্যোগ?

বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর সময়ে এসেছে। ইসরায়েলে বিচারিক সংস্কার, সামরিক নিয়োগ ইস্যু এবং দুর্নীতির মামলাসহ নানা চাপের মুখে আছেন নেতানিয়াহু। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সমালোচনা ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে। ফলে একটি নতুন আঞ্চলিক জোটের ধারণা তুলে ধরে তিনি নিজেকে কূটনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ও বিচ্ছিন্ন নন- এমন বার্তা দিতে চাইতে পারেন।

সব মিলিয়ে, নেতানিয়াহুর “হেক্সাগন” ধারণাটি এখনও বাস্তব কোনো আনুষ্ঠানিক জোটে রূপ নেয়নি। বিশ্লেষকদের বড় অংশের মতে, এটি আপাতত একটি কৌশলগত বার্তা বা রাজনৈতিক অবস্থান প্রদর্শনের প্রচেষ্টা- যার কার্যকারিতা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বাস্তব স্বার্থ ও ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের ওপর।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা