প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:১৫ এএম
আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:১৭ এএম
সিরিয়ার ইদলিব প্রদেশের মুসিবিন শহরের একটি মাঠ থেকে মাইন পরিষ্কারের কাজ করছেন হ্যালো ট্রাস্ট এনজিওর একজন সদস্য। ছবি: এএফপি
সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ থেমেছে, কিন্তু বিপদ থামেনি। দেশটির বিভিন্ন এলাকায় পুঁতে রাখা ল্যান্ডমাইন ও অবিস্ফোরিত গোলাবারুদের বিস্ফোরণে প্রতিনিয়তই হতাহত হচ্ছে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শিশুরা।
গত বছর উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ায় নিজের বাড়ির কাছে খোলা মাঠে ছোট ভাইদের সঙ্গে খেলছিল ১০ বছরের মোহাম্মদ। হঠাৎ মাটির নিচে আধা-পোঁতা খেলনার মতো কিছু দেখে সে খুঁড়তে শুরু করে।
কিন্তু সেটি ছিল একটি অ্যান্টি-পার্সোনেল মাইন। বিস্ফোরণে মোহাম্মদ গুরুতর আহত হয়; সঙ্গে আহত হয় তার দুই ভাই- আট বছরের আবদুল ও পাঁচ বছরের আজম।
ঘটনাস্থলে পৌঁছে সিরিয়ান সিভিল ডিফেন্স তিন শিশুকে নিকটতম হাসপাতালে যায়। সেখানে সার্জনরা প্রাণ বাঁচাতে প্রাণপণ চেষ্টা করেন। আবদুল ও আজম- দুজনেই ডান পা হারিয়েছে; বাঁ পা ধাতব ফ্রেমে ধরে রাখা। আজম এক চোখের দৃষ্টিশক্তিও হারিয়েছে। কয়েক সপ্তাহ পর মোহাম্মদ তার ক্ষত নিয়ে মারা যায়।
যুদ্ধ বন্ধের পর গত ১৪ মাসে প্রায় ২৬ লাখ সিরীয় তাদের বাড়িতে ফিরেছে। কিন্তু অনেকেই ফিরছে এমন শহর ও গ্রামে, যেগুলো একসময় ছিল যুদ্ধের ফ্রন্টলাইন। যেখানে লুকিয়ে থাকা ল্যান্ডমাইন ও অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ প্রতিনিয়ত প্রাণঘাতী ঝুঁকি তৈরি করছে। সহায়তা সংস্থা হিউম্যানিটি অ্যান্ড ইনক্লুশনের মতে, সিরিয়া জুড়ে প্রায় ৩ লাখ সক্রিয় বিস্ফোরক ছড়িয়ে আছে।
মোহাম্মদের বাবা মুস্তাফা আল-আজরাক বলেন, “আমরা ভেবেছিলাম অবশেষে নিরাপদ হয়েছে। যদি জানতাম চারদিকে মাইন ছড়িয়ে আছে, তাহলে কখনোই ফিরতাম না।”
সিরিয়া জুড়ে প্রায় প্রতিদিনই এমন ঘটনা ঘটছে। ইন্টারন্যাশনাল এনজিও সেফটি অর্গানাইজেশন জানায়, আসাদ সরকারের পতনের পর থেকে এখন পর্যন্ত শিশুসহ ১,৬০০ জনের বেশি মানুষ মাইন ও অবিস্ফোরিত অস্ত্রে নিহত বা পঙ্গু হয়েছে।

মাইন নিষ্ক্রিয়কারী সংস্থা ‘হ্যালো ট্রাস্ট’ ২৫০ জন কর্মী নিয়ে ২০১৭ সাল থেকে সিরিয়ায় মাইন নিষ্ক্রিয় করার কাজ করছে। তাদের সবচেয়ে বেশি পেয়েছে ক্লাস্টার মিউনিশন। পাশাপাশি আর্টিলারি শেল, রকেট ও গ্রেনেডও মিলেছে।
সংস্থাটির কর্মকর্তা পল ম্যাকক্যান বলেন, “আন্তর্জাতিক দাতাদের সহায়তায় আমরা স্থানীয় সিরীয় নারী-পুরুষদের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ বিশেষজ্ঞ হিসেবে প্রশিক্ষণ বাড়াতে পেরেছি। কিন্তু আরও অনেক কিছু করতে হবে। প্রতি সপ্তাহে সিরিয়ায় চার-পাঁচজন মানুষ বিস্ফোরকে নিহত বা আহত হচ্ছে।”
ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থা
যুদ্ধের ধ্বংসে সিরিয়ার স্বাস্থ্যব্যবস্থা জরুরি চিকিৎসা বা মাইন-আহতদের দীর্ঘমেয়াদি বিশেষায়িত সেবা দিতে অক্ষম। এক দশকের বেশি বিমান হামলায় বেশিরভাগ হাসপাতাল ও ক্লিনিক ধ্বংস হয়েছে; বহু চিকিৎসক দেশ ছেড়েছেন- যাদের কেবল অল্প অংশই ফিরে এসেছেন।
ইদলিব সার্জিক্যাল স্পেশালাইজড হাসপাতালে কর্মীরা প্রতিদিনই জরুরি রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খান। ১৪ ঘণ্টার শিফট শেষে নার্সিং প্রধান হামেদ ওসমান বলেন, “প্রতিদিনই সময়ের সঙ্গে আর সম্পদের অভাবের সঙ্গে দৌড়াতে হয়।”
গড়ে প্রতিদিন চারজন রোগী ল্যান্ডমাইন বা অবিস্ফোরিত অস্ত্রের আঘাতে আসে। অধিকাংশেরই জটিল ক্ষত। তাৎক্ষণিক অস্ত্রোপচার, রক্তসঞ্চালন ও বিশেষায়িত যত্ন দরকার।
ওসমান বলেন, “সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ওষুধ আর অস্ত্রোপচারের সরঞ্জামের অভাব।”
যথাযথ যন্ত্রপাতি ও অ্যান্টিবায়োটিক না থাকলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, তখন চিকিৎসকদের বাধ্য হয়ে অঙ্গচ্ছেদ করতে হয়।