প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৫:৫২ পিএম
ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং নরেন্দ্র মোদি। ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সোমবার ভারতের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণা দেন, যেখানে ট্রাম্প দাবি করেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রুশ তেল কেনা বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং তার বদলে যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলা থেকে তেল আমদানি করবেন।
এর বিনিময়ে ভারতীয় পণ্যের ওপর আরোপিত মোট ৫০ শতাংশ শুল্ক কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামানো হয়। এই ৫০ শতাংশ শুল্কের অর্ধেকই গত বছর আরোপ করা হয়েছিল রুশ তেল কেনার ‘শাস্তি’ হিসেবে। হোয়াইট হাউসের মতে, এই তেলের অর্থ দিয়েই রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেন যুদ্ধ চালাচ্ছেন।
তবে ভারত সরকার প্রকাশ্যে নিশ্চিত করেনি যে তারা রুশ তেল কেনা পুরোপুরি বন্ধ করবে বা ভেনেজুয়েলার তেল গ্রহণে সম্মত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়াও এ বিষয়ে ভারতের কাছ থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক বার্তা পায়নি। মঙ্গলবার ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ এ কথা জানান।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রুশ তেল ছেড়ে ভেনেজুয়েলার তেলে যাওয়া মোটেও সহজ হবে না। জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, খরচ, ভৌগোলিক দূরত্ব এবং বিভিন্ন ধরনের অপরিশোধিত তেলের বৈশিষ্ট্য- সব মিলিয়ে ভারতের জন্য সিদ্ধান্তটি বেশ জটিল।
তাহলে প্রশ্ন হলো- ভারত কি সত্যিই রুশ তেল ছাড়তে পারবে? আর ভেনেজুয়েলার তেল কি তার বিকল্প হতে পারে?
ট্রাম্পের পরিকল্পনা কী?
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন রুশ তেলের ওপর মূল্যসীমা আরোপ করে। এর ফলে রাশিয়ার তেল তুলনামূলক সস্তা হয়ে যায় এবং ভারতসহ কয়েকটি দেশ ব্যাপক হারে এই তেল কিনতে শুরু করে।
যুদ্ধের আগে ভারত তার মোট তেলের মাত্র ২.৫ শতাংশ রাশিয়া থেকে নিত। এখন সেই হার বেড়ে প্রায় ৩০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। চীনের পর ভারতই রুশ তেলের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রেতা।
এ কারণে ট্রাম্প গত বছর ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করেন। পাশাপাশি রাশিয়ার দুই বৃহৎ তেল কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন এবং সেগুলোর সঙ্গে লেনদেন করলে দ্বিতীয় দফায় নিষেধাজ্ঞার হুমকিও দেন।
এদিকে জানুয়ারিতে মাদুরো অপহরণের পর যুক্তরাষ্ট্র কার্যত ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রির অর্থপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করছে। অথচ ভেনেজুয়েলায় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তেল মজুত (৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল) রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে পাঁচ গুণেরও বেশি।
তাই যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে ভারতকে ভেনেজুয়েলার তেল কিনতে বাধ্য করা যুক্তিসংগত মনে হলেও, বাস্তবে এটি বেশ জটিল বলে বিশ্লেষকদের মত।
রাশিয়া থেকে কত তেল আমদানি করে ভারত?
কেপলার নামের বিশ্লেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, ভারত বর্তমানে দৈনিক প্রায় ১১ লাখ ব্যারেল রুশ তেল আমদানি করে। ট্রাম্পের চাপ বাড়ার ফলে এই পরিমাণ আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে।
এক ব্যারেল তেল মানে প্রায় ১৫৯ লিটার। পরিশোধনের পর এক ব্যারেল তেল থেকে গড়ে ৭৩ লিটার পেট্রোল পাওয়া যায়। তাছাড়া এই তেল থেকেই তৈরি হয় জেট ফুয়েল, প্লাস্টিক, এমনকি বিভিন্ন প্রসাধনী সামগ্রীও।
হঠাৎ রুশ তেল বন্ধ হলে কী হবে?
বিশ্লেষকদের মতে, এতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাবে এবং ভারতের অর্থনীতি চাপে পড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রুশ তেল তখন চীনের দিকে আরও বেশি যাবে অথবা ‘শ্যাডো ট্যাংকার’-এর মাধ্যমে গোপনে পরিবহন হবে, ফলে পরিবহন ব্যয় ও বিমা খরচ বাড়বে।
এ ছাড়া রুশ তেলের বড় ছাড় পেয়ে ভারতীয় রিফাইনারিগুলো গত দুই বছরে ভালো মুনাফা করেছে। সস্তা রুশ তেলের বদলে ব্যয়বহুল যুক্তরাষ্ট্রের বা ভেনেজুয়েলার তেল কিনলে সেই লাভ কমে যাবে, যার প্রভাব পড়বে ভোক্তাদের ওপর।
ভারত কি পুরোপুরি রুশ তেল ছাড়তে পারবে?
সম্ভবত নয়। ভারতের একটি বড় রিফাইনারি নাইয়ারা এনার্জির প্রায় অর্ধেক মালিকানা রাশিয়ার রোসনেফটের হাতে। এই কোম্পানিটি এখনও প্রায় পুরোপুরি রুশ তেলের ওপর নির্ভরশীল।
নিষেধাজ্ঞার কারণে নাইয়ারার ভবিষ্যৎ নিয়েই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ভারতের জন্য বিশেষ ছাড় দেবে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।
ভেনেজুয়েলার তেল কি বিকল্প হতে পারে?
এক সময় ভারত ভেনেজুয়েলার তেলের বড় ক্রেতা ছিল। ২০১৯ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ভারত ৭.২ বিলিয়ন ডলারের ভেনেজুয়েলার তেল আমদানি করেছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার পর তা বন্ধ হয়ে যায়। এখন আবার তেল কিনতে আগ্রহ দেখালেও সমস্যা আছে অনেক।
ভেনেজুয়েলা ভারত থেকে অনেক দূরে, ফলে পরিবহন খরচ অনেক বেশি। তাছাড়া ভেনেজুয়েলার তেল ভারী ও উচ্চ সালফারযুক্ত, যা পরিশোধনের জন্য বিশেষ ধরনের আধুনিক রিফাইনারি দরকার। ভারতের সব রিফাইনারিতে সেই সুবিধা নেই।
সবচেয়ে বড় কথা, ভেনেজুয়েলার মোট উৎপাদনই দিনে প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল, যেখানে ভারত একদিনে ১১ লাখ ব্যারেল রুশ তেল আমদানি করে।
বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, রুশ তেল ছেড়ে দিলে ভারতের বছরে অতিরিক্ত ৯ থেকে ১১ বিলিয়ন ডলার খরচ হতে পারে- যা দেশটির কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য বাজেটের প্রায় সমান।
তাহলে ভারত তেল কিনবে কোথা থেকে?
ভারত এখন প্রায় ৪০টি দেশ থেকে তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছে। রাশিয়া থেকে আমদানি কমিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও ওপেকভুক্ত দেশগুলোর ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র থেকেও তেল কেনা বাড়ছে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নও বিপুল পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ফলে প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে।
অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলার উৎপাদন বাড়াতে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগবান্ধব আইন ও ঋণ পরিশোধ জরুরি- যা সময়সাপেক্ষ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।