প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৮:৩৮ পিএম
ডানপন্থি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী লাউরা ফারনান্দেজ ভূমিধস জয় পেয়ে কোস্টারিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। ছবি: এএফপি
কোকেন বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত সহিংসতা কঠোরভাবে দমন করার অঙ্গীকার নিয়ে ডানপন্থি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী লাউরা ফারনান্দেজ ভূমিধস জয় পেয়ে কোস্টারিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন।
বিদায়ী প্রেসিডেন্ট
রদ্রিগো শাভেসের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত লাউরা ৯৪ শতাংশ ভোট গণনা শেষে মোট ভোটের প্রায়
অর্ধেক পেয়ে গেলে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মধ্য-ডানপন্থি অর্থনীতিবিদ আলভারো রামোস পরাজয়
স্বীকার করেন।
প্রাথমিক ফলে লাউরা
৪৮ দশমিক ৩ শতাংশ ভোট পেয়ে যান, যেখানে রান-অফ এড়াতে লাগত ৪০ শতাংশ ভোট।
এই ফল ঘোষণা হওয়ার
সঙ্গে সঙ্গেই রবিবার দেশজুড়ে লাউরার সার্বভৌম জনগণ পার্টির (পিপিএসও) সমর্থকেরা উল্লাসে
ফেটে পড়েন। তারা নীল, লাল ও সাদা ডোরা কাটা কোস্টারিকার জাতীয় পতাকা নেড়ে উদ্যাপন করেন।
লাউরার রাজনৈতিক
পথপ্রদর্শকের প্রতি ইঙ্গিত করে ‘ভিভা রদ্রিগো চাভেস’—এমন স্লোগানও শোনা যায়।
রাজধানী সান হোসেতে
দলের আনুষ্ঠানিক নির্বাচন রাতের অনুষ্ঠানে ভিডিও বার্তায় যুক্ত হয়ে ৩৯ বছর বয়সী লাউরা
তাকে প্রেসিডেন্ট-ইলেক্ট হিসেবে আস্থা রাখার জন্য চাভেসকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন,
তার উত্তরাধিকার “নিরাপদ হাতে” রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কোস্টারিকা
যেন “অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, স্বাধীনতা এবং সর্বোপরি জনগণের অগ্রগতির পথে” এগিয়ে যেতে
পারে, সে জন্য তিনি “অক্লান্তভাবে লড়াই” চালিয়ে যাবেন।
৫২ লাখ জনসংখ্যার
দেশ কোস্টারিকা, যা সাদা বালুর সৈকতের জন্য বিখ্যাত, দীর্ঘদিন ধরে মধ্য আমেরিকায় স্থিতিশীলতা
ও গণতন্ত্রের এক মরুদ্যান হিসেবে পরিচিত ছিল।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে
দেশটি বৈশ্বিক মাদক বাণিজ্যে শুধু যাতায়াতের পথ নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক
কেন্দ্রেও পরিণত হয়েছে।
মেক্সিকান ও কলম্বিয়ান
কার্টেলগুলোর মাদক পাচার স্থানীয় সমাজে ঢুকে পড়ায় দখলযুদ্ধ শুরু হয়। এর ফলে গত ছয় বছরে
হত্যার হার ৫০ শতাংশ বেড়ে প্রতি এক লাখ বাসিন্দায় ১৭ জনে দাঁড়িয়েছে।
অপরাধ দমনে অনুপ্রেরণা
হিসেবে লাউরা ফার্নান্দেজ এল সালভাদরের কঠোরহস্ত প্রেসিডেন্ট নাইব বুকেলেকে উল্লেখ
করেছেন। বুকেলে অভিযোগ ছাড়াই হাজার হাজার সন্দেহভাজন গ্যাং সদস্যকে কারাগারে পাঠিয়েছেন।
বুকেলেই প্রথম বিদেশি
নেতা হিসেবে তাকে অভিনন্দন জানান।
ফার্নান্দেজের বিজয়
লাতিন আমেরিকায় ডানদিকে রাজনৈতিক ঝোঁক আরও জোরালো হওয়ার প্রমাণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
দুর্নীতি ও অপরাধ নিয়ে জনরোষকে পুঁজি করে সাম্প্রতিক সময়ে চিলি, বলিভিয়া, আর্জেন্টিনা
ও হন্ডুরাসেও রক্ষণশীলরা ক্ষমতায় এসেছে।
লাউরা ফার্নান্দেজকে
তুলনামূলক অচেনা অবস্থান থেকে পরিকল্পনামন্ত্রী ও চিফ অব স্টাফ হিসেবে নিয়ে আসেন রদ্রিগো
শাভেস।
রবিবার রাতে তার
সঙ্গে এক আলাপে শাভেস বলেন, লাউরার নেতৃত্বে “স্বৈরতন্ত্রও হবে না, কমিউনিজমও হবে না”
এ বিষয়ে তিনি আশাবাদী।
শাভেসের শাসনামলে
সহিংসতা বাড়লেও তিনি এর দায় এড়িয়ে বিচারব্যবস্থার দিকে আঙুল তুলেছিলেন। তার অভিযোগ
ছিল, আদালত অপরাধের ক্ষেত্রে খুব নরম।
২৭ বছর বয়সী ভোটার
জেসিকা সালগাদো বলেন, সহিংসতা বাড়লেও সরকার সঠিক পথেই আছে মনে করে তিনি ধারাবাহিকতার
প্রার্থী হিসেবে লাউরা ফার্নান্দেজকে ভোট দিয়েছেন।
তিনি এএফপিকে বলেন,
“সহিংসতা বেড়েছে কারণ তারা মূল হোতাদের ধরছে, এটা যেন নর্দমা থেকে ইঁদুর টেনে বের করার
মতো।”
কোস্টারিকানরা রবিবার
৫৭ আসনের আইনসভা পরিষদের সদস্য নির্বাচনেও ভোট দেন। আংশিক ফলাফলে দেখা যায়, লাউরার
দল প্রায় ৩৯ শতাংশ ভোট পেয়েছে।
তার সমালোচকদের আশঙ্কা,
চার বছরের মেয়াদ শেষে চাভেসকে ফের প্রেসিডেন্ট হওয়ার সুযোগ দিতে তিনি সংবিধান পরিবর্তনের
চেষ্টা করতে পারেন।
বর্তমান সংবিধান
অনুযায়ী, আট বছর ক্ষমতার বাইরে না থাকলে চাভেস পুনর্নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।
১৯৭৮ সালের নোবেল
শান্তি পুরস্কার বিজয়ী সাবেক প্রেসিডেন্ট অস্কার আরিয়াস রোববার সতর্ক করে বলেন, “গণতন্ত্রের
টিকে থাকাই এখন প্রশ্নের মুখে।”
তিনি বলেন, “স্বৈরশাসকেরা
প্রথমেই যা করতে চায়, তা হলো ক্ষমতায় থাকতে সংবিধান সংস্কার।”
লাউরা ফার্নান্দেজ
অবশ্য জোর দিয়ে বলেছেন, তিনি কোস্টারিকার গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
মাদক বাণিজ্য রাজধানী
সান হোসেসহ বিভিন্ন শহরের উচ্চ ঘনত্বের ‘প্রেকারিওস’ (অনানুষ্ঠানিক বসতি) এলাকাগুলোকে
গ্রাস করেছে। সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী মাদক চক্রের মধ্যে গোলাগুলি এখন নিত্যদিনের ঘটনা।
লাউরা ফার্নান্দেজ
বুকেলের কুখ্যাত ‘সন্ত্রাসী আটক কেন্দ্র’ (সেকোট) আদলে একটি সর্বোচ্চ নিরাপত্তা কারাগার
নির্মাণ শেষ করার অঙ্গীকার করেছেন।
এছাড়া তিনি কারাদণ্ড
আরও কঠোর করা এবং অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে বুকেলে-ধাঁচের জরুরি অবস্থা জারির প্রতিশ্রুতি
দিয়েছেন।
লাতিন আমেরিকার অনেকের
কাছে বুকেলে একজন নায়ক, যিনি অপরাধে জর্জরিত একটি দেশে নিরাপত্তা ফিরিয়ে এনেছেন বলে
কৃতিত্ব পান।