প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:০৭ এএম
আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:২২ এএম
‘গাজার লাইফলাইন’ খ্যাত রাফাহ ক্রসিং সোমবার থেকে আংশিক খুলে দেওয়ার কথা জানিয়েছে ইসরায়েল। ছবি: সংগৃহীত
গাজা উপত্যকা ও মিসরের মধ্যবর্তী রাফাহ সীমান্ত ক্রসিং সোমবার থেকে সীমিত পরিসরে চালু হচ্ছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েল। দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর এই পদক্ষেপ এমন এক সময়ে আসছে, যখন হাজারও অসুস্থ ও আহত ফিলিস্তিনি জরুরি চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অপেক্ষায় আছেন।
গাজায় সহায়তা কার্যক্রম তদারককারী ইসরায়েলি সামরিক সংস্থা কোগাত রবিবার জানায়, মিসর ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সমন্বয় করে ক্রসিংটি প্রাথমিকভাবে ‘পাইলট ধাপে’ চালু করা হবে। এ পর্যায়ে গাজার বাসিন্দারা উভয় দিকেই কেবল হেঁটে পারাপার করতে পারবেন।
সংস্থাটি জানায়, রবিবার পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালিয়ে প্রক্রিয়া মূল্যায়ন করা হয়েছে; সোমবার থেকে নিয়মিত সীমিত চলাচল শুরু হওয়ার কথা।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বলেছে, ক্রসিং দিয়ে গাজায় প্রবেশ ও বের হওয়া ব্যক্তিদের জন্য একটি তল্লাশি কমপ্লেক্স নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে, যা নিরাপত্তা যাচাইয়ের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
রাফাহ ক্রসিং গাজার একমাত্র সীমান্তপথ, যা সরাসরি ইসরায়েল ভূখণ্ডের ভেতর দিয়ে যায় না। যুদ্ধের আগে ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় রেখে এটি ফিলিস্তিনি ও মিসরীয় কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে পরিচালনা করত।
তবে ২০২৪ সালের মে মাসে ইসরায়েলি বাহিনী নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে ক্রসিংটি বেশিরভাগ সময় বন্ধ ছিল।
চিকিৎসার তাগিদ, ফেরার শঙ্কা
দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস থেকে আল জাজিরার সংবাদদাতা হানি মাহমুদ জানান, ক্রসিং পুনরায় খোলা স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তির পাশাপাশি অনিশ্চয়তাও তৈরি করেছে। তার ভাষ্য, অনেকে চিকিৎসা বা পড়াশোনার প্রয়োজনে বের হতে চান, কিন্তু পরে গাজায় ফিরতে পারবেন কি না—সে উদ্বেগ রয়ে গেছে।
গাজার সরকারি মিডিয়া দপ্তরের পরিচালক ইসমাইল আল-থাওয়াবতা বলেন, যুদ্ধ চলাকালে গাজা ছেড়ে যাওয়া প্রায় ৮০ হাজার ফিলিস্তিনি ফিরে আসতে চান।
এ ছাড়া আনুমানিক ২২ হাজার আহত ও অসুস্থ ব্যক্তি বিদেশে চিকিৎসার জন্য জরুরি ভিত্তিতে গাজা ছাড়ার প্রয়োজনের মধ্যে আছেন।
রয়টার্সকে মিসরের দুই কর্মকর্তা জানান, অন্তত ৫০ জন ফিলিস্তিনি রোগীকে রবিবার চিকিৎসার জন্য মিসরে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
প্রথম কয়েক দিনে প্রতিদিন গড়ে ২০০ জন—রোগী ও তাদের স্বজন—মিসরে প্রবেশ করবেন এবং প্রতিদিন প্রায় ৫০ জন গাজায় ফিরবেন বলে তারা জানান।
মিসর যাতায়াতকারীদের তালিকা জমা দিয়েছে এবং ইসরায়েল তা অনুমোদন করেছে।
এএফপির ভিডিও ফুটেজে সীমান্তের মিসরীয় পাশে রোগীদের নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্সের সারি দেখা গেছে।
বিদেশে চিকিৎসার অপেক্ষায় থাকা ব্যক্তিদের একজন ৬৫ বছর বয়সী আবেদ এল হালিম আবু আসকার চার বছর ধরে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরে তার অস্ত্রোপচার হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু যুদ্ধ শুরুর কারণে তা স্থগিত হয়।
গাজায় এক বিমান হামলায় যুদ্ধের প্রথম মাসে আবু আসকার ২৮ বছর বয়সি মেয়ে শামিমা, জামাতা ও দুই নাতনি নিহত হন।
তার ছেলে আহমেদ বলেন, আমার বাবা দুই বছরের বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করছেন। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়া যাবে কি না, আমরা জানি না। ওষুধ নেই, পরীক্ষা করার ব্যবস্থাও নেই।
যুদ্ধবিরতির মধ্যেও হামলা
রাফাহ ক্রসিং খোলা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপের একটি শর্ত ছিল বলে আন্তর্জাতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়েও সহিংসতা থামেনি। মেডিক্যাল সূত্রনুসারে, গাজাজুড়ে ইসরায়েলি হামলায় রবিবার অন্তত তিনজন নিহত হন।
খান ইউনিসের নাসের মেডিক্যাল কমপ্লেক্স সূত্র জানায়, রাফাহর উত্তর-পশ্চিমে এক ড্রোন হামলায় একজন নিহত হন।
মধ্য গাজার ওয়াদি গাজা এলাকাতেও আরেক হামলায় প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।
উত্তর ও দক্ষিণ গাজায় একাধিক হামলায় শনিবারও অন্তত ৩১ জন নিহত হন বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।
মানবিক কার্যক্রমে নতুন চাপ
এদিকে ইসরায়েল রবিবার ঘোষণা দিয়েছে, ফিলিস্তিনি কর্মীদের তালিকা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্সের—যার ফরাসি সংক্ষিপ্ত নাম এমএসএফ—গাজায় পরিচালিত মানবিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেবে।
ইসরায়েলের প্রবাসী ও ইহুদি-বিরোধীতা বিষয়ক মন্ত্রণালয় জানায়, স্থানীয় কর্মীদের তথ্য জমা দেওয়া এই অঞ্চলের সব সংস্থার জন্য বাধ্যতামূলক।
এর আগে এমএসএফসহ ৩৭টি সংস্থার কার্যক্রম সীমিত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, যা আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনার জন্ম দেয়।
লন্ডনভিত্তিক জরুরি চিকিৎসক জেমস স্মিথ বলেন, এ সিদ্ধান্ত মানবিক সহায়তা নিয়ন্ত্রণের বৃহত্তর নীতির অংশ বলে মনে হচ্ছে। তার মতে, স্থানীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থা বিপর্যস্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক সংস্থার ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
রাফাহ ক্রসিং আংশিক চালু হওয়া তাই একদিকে চিকিৎসার সম্ভাবনা তৈরি করলেও, নিরাপত্তা, চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও মানবিক সহায়তা নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।