আল জাজিরা
প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:৪০ পিএম
আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১৬:৫৬ পিএম
ফিলিস্তিনিরা ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে দক্ষিণ গাজা উপত্যকার খান ইউনিসে ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনগুলোর মাঝ দিয়ে হাঁটছেন। ছবি: এএফপি
ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে থাকা সর্বশেষ ইসরায়েলি বন্দির মরদেহ খোঁজার অভিযান শেষ হলে মিশরের সঙ্গে গাজার রাফাহ সীমান্ত ক্রসিং সীমিতভাবে খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েল।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দপ্তর রবিবার জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ২০২৫ সালের অক্টোবরে হওয়া যুদ্ধবিরতির প্রাথমিক ধাপ অনুযায়ী সীমান্তটি খোলা হবে। তবে তা কেবল মানুষের যাতায়াতের জন্য সীমিত থাকবে।
তাদের ভাষ্য, হামাস যদি ইসরায়েলের সব জীবিত ও মৃত বন্দিকে ফেরত দেয়, তখনই এ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
শুধু পুলিশ কর্মকর্তা র্যান গভলির মরদেহ ছাড়া, সব বন্দিকে ফেরত পাওয়ার কথা জানিয়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী রবিবার জানায়, তারা উত্তর গাজার কথিত সীমান্তরেখা ‘ইয়েলো লাইন’-এর কাছাকাছি একটি কবরস্থানে তল্লাশি চালাচ্ছে।
এক ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তা বলেন, গভলির সম্ভাব্য অবস্থান সম্পর্কে “বেশ কয়েকটি গোয়েন্দা সূত্র” রয়েছে।
এর আগে রবিবার হামাস জানায়, তারা ‘সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে’ ইসরায়েলি ওই সৈনিকের মরদেহের অবস্থান হস্তান্তর করেছে এবং যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী ‘সব দায়িত্ব পালন’ করেছে।
হামাসের সশস্ত্র শাখা আল কাসাম ব্রিগেডের মুখপাত্র বলেন, তারা “বিষয়টি স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং সময়ক্ষেপণের কোনো আগ্রহ নেই।”
মধ্যস্থতাকারীদের দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ইসরায়েলকে চুক্তি বাস্তবায়নে বাধ্য করতে হবে।
‘শুধু পথচারী চলাচল’
গাজার ভেতরে বা বাইরে যাতায়াতের ক্ষেত্রে ২০ লাখের বেশি ফিলিস্তিনির একমাত্র পথ রাফাহ ক্রসিং, যা ২০২৪ সাল থেকে ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা শান্তি পরিকল্পনার প্রথম ধাপে রাফাহ পুনরায় খোলার কথা ছিল। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এ বিষয়ে ইসরায়েল ও হামাসের ওপর যুক্তরাষ্ট্র চাপ বাড়াচ্ছিল।
গাজার পুনর্গঠনের আহ্বান জানিয়ে ওয়াশিংটন গত সপ্তাহে যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ কার্যকরের ঘোষণা দেয়, যা এখন চলমান।
তবে ট্রাম্পের পরিকল্পনায় পুরোপুরি খোলার কথা থাকলেও নেতানিয়াহুর দপ্তর জানায়, ইসরায়েলের তদারকিতে প্রবেশাধিকার কেবল পথচারী চলাচলের মধ্যেই সীমিত থাকবে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এ পদক্ষেপ গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের দিকে নিয়ে যেতে পারে, যা ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য।
ইসরায়েলি অস্ত্র ও নজরদারি শিল্প বিষয়ক বই দ্য প্যালেস্টাইন ল্যাবরেটরি এর লেখক অ্যান্থনি লোয়েনস্টেইন বলেন, “গত দুই বছর ধরে মিশরে ইসরায়েলের গণহত্যার কারণে বিপুল সংখ্যক ফিলিস্তিনি অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে আছেন।
“তাদের অনেকেই ফিরতে চান, বা কেউ কেউ হয়তো ফিরে গিয়ে পুনর্গঠনে সাহায্য করতে বা পরিবারকে দেখতে চান। কিন্তু ইসরায়েল যা চায় তা হলো বিপুল সংখ্যক ফিলিস্তিনি যেন চলে যায় এবং আর ফিরে না আসে।”
অ্যান্থনি লোয়েনস্টেইনের আশঙ্কা, কেবল ইসরায়েলের তদারকিতে ক্রসিং খুলে দেওয়ার বিষয়টি ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য।
জরুরি মানবিক সহায়তা প্রবেশের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য বলেন লোয়েনস্টেইন।
তার মতে, কেবল ইসরায়েলের তদারকিতে ক্রসিং খোলা দীর্ঘমেয়াদে উচ্ছেদের লক্ষ্যকে এগিয়ে নিতে পারে। তিনি জরুরি মানবিক সহায়তা প্রবেশে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানান।
বৈরুত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট ফেলো রামি খৌরি একই মত প্রকাশ করে বলেন, ইসরায়েলের এ ঘোষণা ফিলিস্তিনিদের জীবনের প্রতিটি দিক নিয়ন্ত্রণের কৌশলের অংশ।
তিনি বলেন, কেবল পথচারীদের জন্য রাফাহ খোলা হলে মিশরের গুদামগুলোতে আটকে থাকা টনকে টন জরুরি মানবিক সহায়তা গাজায় পৌঁছানোর কোনো সুযোগই তৈরি হবে না।
বৈরুত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট ফেলো রামি খৌরি একই মত প্রকাশ করে বলেন, ইসরায়েলের এই ঘোষণা ফিলিস্তিনিদের প্রতিটি দিক নিয়ন্ত্রণের কৌশল মাত্র।
তার ভাষায়, হামাস প্রতিশ্রুতি রাখলেও ইসরায়েল নিজ প্রতিশ্রুতি পূরণ করছে না।
রামি খৌরি বলেন, “তাই তারা মানবিক সহায়তা, মানুষের চলাচল, এমনকি যারা মারা যাচ্ছে এবং যাদের চিকিৎসা প্রয়োজন- সবকিছু নিয়েই খেলা করে।
“কখনও যেতে দেয়, কখনও দেয় না। পানি, খাবার- ফিলিস্তিনিদের জীবনের প্রতিটি মাত্রা তারা নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।”
হামলা অব্যাহত
এদিকে গাজাজুড়ে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। দুটি পৃথক ঘটনায় রবিবার অন্তত তিন ফিলিস্তিনি নিহত হন এবং ড্রোন হামলায় আরও চারজন আহত হন বলে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানান।
অক্টোবর থেকে যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পরও ইসরায়েলি হামলায় গাজায় ৪৮০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
ইসরায়েলের দুই বছরের গণহত্যামূলক যুদ্ধে মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭১,৬৫৭ জনে, আহত হয়েছেন আরও ১,৭১,৩৯৯ জন।