× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্পের শুল্ক যুদ্ধ: ইউরোপের ‘ট্রেড বাজুকা’ কি আসছে?

প্রবা প্রতিবেদন

প্রকাশ : ২১ জানুয়ারি ২০২৬ ২২:৪৪ পিএম

গ্রিনল্যান্ডের নুউক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর গত ১৯ জানুয়ারি ডেনিশ সৈন্যরা হিমায়িত টারমাক পেরিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। ছবি: এএফপি

গ্রিনল্যান্ডের নুউক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর গত ১৯ জানুয়ারি ডেনিশ সৈন্যরা হিমায়িত টারমাক পেরিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড কেনার জেদ আর ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর চড়া শুল্ক আরোপের হুমকি নিয়ে বিশ্বরাজনীতি এখন উত্তাল। ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, গ্রিনল্যান্ড না পাওয়া পর্যন্ত তিনি ইউরোপের দেশগুলোর ওপর বাণিজ্য চাপ অব্যাহত রাখবেন। অন্যদিকে ইউরোপও হাত গুটিয়ে বসে নেই; তারা তাদের অর্থনৈতিক অস্ত্রাগারের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র ‘ট্রেড বাজুকা’ ব্যবহারের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

নোবেল না পাওয়ায় ট্রাম্পের সেই চিঠি

এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ইয়োনাস গাহর স্টোর ট্রাম্পের কাছ থেকে পাওয়া একটি চাঞ্চল্যকর চিঠির কথা প্রকাশ করেছেন। ট্রাম্প সেখানে সরাসরি অভিযোগ করেছেন, তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার না দেওয়াতেই তিনি এখন আর ‘শান্তির কথা’ ভাবতে বাধ্য নন। চিঠিতে তিনি লিখেছেন, তিনি ৮টিরও বেশি যুদ্ধ থামিয়েছেন অথচ তাকে সম্মান দেওয়া হয়নি, তাই এখন থেকে তিনি কেবল সেটাই ভাববেন যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভালো ও সঠিক। ট্রাম্পের দাবি, গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের কাছে নিরাপদ নয় এবং চীন বা রাশিয়া যেকোনো সময় এটি দখল করতে পারে, যা বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য হুমকি।

শুল্ক আরোপের বিষয়টি ন্যায্য: ট্রাম্প 

শুল্ক আরোপ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যেসব দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে, সেসব দেশের ওপরই শুল্ক বসানো হয়েছে। তিনি বলেন, “এতে আপনারা সবাই কোনো না কোনোভাবে জড়িত। কারও কারও জন্য এটা ক্ষতির কারণ হয়েছে। তবু শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তটি ন্যায্য। এ কথা আপনাদের বেশিরভাগই বোঝেন”। সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়ে বুধবার এসব বলেন তিনি।

ট্রাম্প জানান, কিছু ক্ষেত্রে শুল্কের হার কমানো হয়েছে। যেমন, সুইজারল্যান্ডের ওপর শুরুতে ৩০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হলেও পরে তা কমানো হয়। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, তিনি মানুষের ক্ষতি চান না। তিনি আরও বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রই পুরো বিশ্বকে টিকিয়ে রাখছে”। 

দাভোসে ট্রাম্প অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও স্পষ্ট অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। গ্রিনল্যান্ড ইস্যুকে তিনি সরাসরি ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র সঙ্গে যুক্ত করে দাবি করেন, এই বিশাল ও সুরক্ষাবিহীন দ্বীপটি আসলে ভৌগোলিকভাবে উত্তর আমেরিকার অংশ এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রেরই ভূখণ্ড। তবে গ্রিনল্যান্ড দখলে তিনি সামরিক অভিযান চালাবেন বলেও জানিয়েছেন। 

শুল্কের আল্টিমেটাম ও সময়সীমা

গত ১৭ জানুয়ারি নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ড থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক বসানো হবে। তিনি আরও বলেছেন, যদি ১ জুনের মধ্যে গ্রিনল্যান্ড বিক্রির চুক্তি সম্পন্ন না হয়, তবে এই শুল্ক বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হবে। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, গত ১৫০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র এই দ্বীপটি কেনার চেষ্টা করছে এবং ডেনমার্কের বারবার প্রত্যাখ্যান এবার আর সহ্য করা হবে না।

ইউরোপের হাতে শক্তিশালী ‘ট্রেড বাজুকা’

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী আইনি অস্ত্র ‘অ্যান্টি-কোয়ার্সন ইনস্ট্রুমেন্ট’ (এসিআই) বা ট্রেড বাজুকা ব্যবহারের কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবছে। এই আইনটি মূলত অর্থনৈতিক ব্ল্যাকমেইল ঠেকাতে তৈরি করা হয়েছে। এটি কার্যকর হলে ইউরোপে গুগলের মতো মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বা ব্যাংকিং পরিষেবার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে। এমনকি মার্কিন পেটেন্ট বা কপিরাইট রক্ষা করা বন্ধ করে দেওয়ার মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে এতে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটি এমন এক অস্ত্র যা যুক্তরাষ্ট্রের আইটি ও ফার্মাসিউটিক্যালস খাতের মতো লাভজনক জায়গাগুলোতে সরাসরি আঘাত হানতে সক্ষম।

নেতাদের প্রতিক্রিয়া ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন

ইউরোপীয় কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের অগ্রাধিকার হলো আলোচনা করা, তবে হুমকি কার্যকর হলে উপযুক্ত জবাব দেওয়ার সব সরঞ্জাম তাদের হাতে রয়েছে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এই শুল্ক যুদ্ধের বিষয়টিকে সম্পূর্ণ ভুল বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং নেদারল্যান্ডসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরাসরি একে ‘ব্ল্যাকমেইল’ বলে আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ এখনো আলোচনার মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বা খনিজ উত্তোলনের বিশেষ অধিকার দিয়ে একটি রফাসূত্র বের করার চেষ্টা করছেন।

গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত ও খনিজ গুরুত্ব

গ্রিনল্যান্ড ভৌগোলিকভাবে উত্তর আমেরিকায় হলেও রাজনৈতিকভাবে ডেনমার্কের অংশ। উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের মধ্যে এটি সংক্ষিপ্ততম বিমান ও সমুদ্র পথ হওয়ায় রাশিয়ার ওপর নজরদারির জন্য এটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত অপরিহার্য। এছাড়া এখানে প্রচুর পরিমাণে বিরল খনিজ বা রেয়ার-আর্থ মেটাল রয়েছে, যা স্মার্টফোন থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান তৈরির জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এই বিপুল সম্পদের কারণেই গ্রিনল্যান্ড এখন বিশ্ব বাণিজ্য যুদ্ধের মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

ইইউর আইনি প্রক্রিয়া ও চূড়ান্ত পদক্ষেপ

ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই বাজুকা ব্যবহার করতে হলে একটি নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া পার করতে হয়। প্রথমে মার্কিন শুল্কের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হবে, যা সর্বোচ্চ চার মাস চলতে পারে। এরপর যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনার মাধ্যমে শুল্ক প্রত্যাহারের সুযোগ দেওয়া হবে। যদি আলোচনা ব্যর্থ হয়, তবে ইইউর ২৭টি দেশের মধ্যে অন্তত ১৫টি দেশের সম্মতিতে (যা হতে হবে মোট জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশ) চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই প্রক্রিয়ায় মার্কিন টেক জায়ান্টদের ওপর অতিরিক্ত ট্যাক্স বসিয়ে বা শেয়ার বাজারে ধস নামিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে ফেলার পরিকল্পনা করছে ব্রাসেলস।

বিশ্ব পুঁজিবাজারে বড় দরপতন ও টেক জায়ান্টদের অস্থিরতা 

শুল্ক যুদ্ধের আশঙ্কায় বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ঝুঁকি এড়ানোর প্রবণতা বেড়েছে, যার ফলে বুধবার বিশ্ব পুঁজিবাজার ও ক্রিপ্টোকারেন্সি মার্কেটে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা গেছে। অস্থিরতার মধ্যে বিটকয়েন প্রায় ৩.৬ শতাংশ দর হারিয়েছে। মার্কিন প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ কোম্পানিগুলোর মুনাফা কমে যাওয়ার আশঙ্কায় নাসডাক ও এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকে বড় পতন ঘটেছে। একইসঙ্গে জার্মানি ও ফ্রান্সের পুঁজিবাজারেও নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে, বিশেষ করে মার্কিন বাজারের ওপর নির্ভরশীল গাড়ি নির্মাতা ও বিলাসদ্রব্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের দর ২ থেকে ৪ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। তবে এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনা ও রুপার চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম রেকর্ড ভেঙে প্রতি আউন্স ২,৭৫০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা না কমা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। 


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা