গ্রিনল্যান্ড ইস্যু
ফিলিপ ব্লেনকিনসপ, রয়টার্স
প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:৩৯ পিএম
আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১৩:২৮ পিএম
গ্রিনল্যান্ডের নুকে এর অধিবাসীরা আর্কটিক দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করা হোক, এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে অংশগ্রহণ করছেন। তারা দ্বীপটিকে নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার দেওয়ার দাবি করছেন, ১৭ জানুয়ারি, ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
গ্রিনল্যান্ড দখলের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের হুমকি ঠেকাতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। তবে এই তৎপরতা ব্যর্থ হলে এবং শুল্ক কার্যকর হলে পাল্টা পাল্টা শুল্ক ও অন্যান্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে ইউরোপীয় জোটটি।
ইইউ রাষ্ট্রদূতেরা ১৮ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এসব বিষয়ে একমত হয়েছেন।
ট্রাম্পের শুল্ক হুমকি ও ইউরোপের প্রতিক্রিয়া
এর আগে ১৭ জানুয়ারি ট্রাম্প ঘোষণা দেন, আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ডেনমার্ক, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ডসহ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের পণ্যের ওপর ধাপে ধাপে বাড়তি শুল্ক আরোপ করা হবে। যুক্তরাজ্য ও নরওয়েও এই তালিকায় রয়েছে।
তার শর্ত—গ্রিনল্যান্ড কেনার সুযোগ দিতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে।
ট্রাম্পের এই অবস্থানকে ইউরোপের বড় দেশগুলো ‘চাপ প্রয়োগ’ এবং ‘ব্ল্যাকমেইল’ হিসেবে দেখছে। ইউরোপীয় কূটনীতিকদের মতে, সার্বভৌম ভূখণ্ড নিয়ে এমন শর্ত আরোপ আন্তর্জাতিক আইন ও জোটগত সম্পর্কের পরিপন্থী।
জরুরি বৈঠক ও পাল্টা শুল্কের পরিকল্পনা
পরিস্থিতি মোকাবিলায় বৃহস্পতিবার ব্রাসেলসে ইইউ নেতাদের একটি জরুরি শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সেখানে আলোচ্য বিষয়গুলোর একটি হলো—প্রায় ৯৩ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের মার্কিন পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ।
ইইউ সূত্র জানায়, ছয় মাসের স্থগিতাদেশ শেষে আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে এই শুল্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হতে পারে।
‘অ্যান্টি-কোয়ারশন ইনস্ট্রুমেন্ট’: কঠোর বিকল্প
আরেকটি বিকল্প হিসেবে আলোচনায় রয়েছে যা এর পূর্বে কখনো ব্যবহার করা হয়নি—‘অ্যান্টি-কোয়ারশন ইনস্ট্রুমেন্ট’ (এসিআই)।
এই ব্যবস্থার আওতায় সরকারি দরপত্র, বিনিয়োগ, ব্যাংকিং কার্যক্রম কিংবা সেবা খাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশ সীমিত করা যেতে পারে। ডিজিটাল সেবাসহ এসব খাতে ইইউর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে।
তবে এই কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে ইইউ সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মতভেদ রয়েছে। আপাতত পাল্টা শুল্ক আরোপের বিষয়টি তুলনামূলক বেশি সমর্থন পাচ্ছে।
ডাভোসে সংলাপের আশায় ইউরোপ
ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা—যিনি ইইউ শীর্ষ সম্মেলনগুলোর সভাপতিত্ব করেন—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে জানান, সদস্যদেশগুলোর সঙ্গে তার ধারাবাহিক আলোচনায় ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের প্রতি ইউরোপের দৃঢ় ও ঐক্যবদ্ধ সমর্থন স্পষ্ট হয়েছে।
একই সঙ্গে যেকোনো ধরনের চাপ বা বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রস্তুতিও রয়েছে বলে জানান তিনি।
রাসমুসেন বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র মানে কেবল দেশটির প্রেসিডেন্ট নন। আমি মাত্রই সেখান থেকেই ফিরেছি। মার্কিন সমাজে এখনো ক্ষমতার ভারসাম্য ও জবাবদিহির ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে।”
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলন (ডাভোস) এই সংকটে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ছয় বছর পর সেখানে মূল বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে ট্রাম্পের।
ইউরোপীয় নেতারা আশা করছেন, এই ফোরামে যুক্তরাষ্ট্র–ইইউ সংলাপের সুযোগ তৈরি হবে। এ বিষয়ে ইউরোপীয় জোটটির পরিকল্পনার কথা সংক্ষেপে তুলে ধরেন এক ইইউ কূটনীতিক।
তিনি বলেন, “সব বিকল্প খোলা রাখা হয়েছে। ডাভোসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা হবে, এরপর ইউরোপীয় নেতারা আবার বসবেন।”
উত্তেজনার ছায়া নিরাপত্তা ও বাজারে
এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ১০ ও ১৫ শতাংশ শুল্কের আওতায় থাকা আটটি দেশ গ্রিনল্যান্ডে সীমিতসংখ্যক সামরিক সদস্য মোতায়েন করেছে। ডেনমার্কের এই বিশাল আর্কটিক দ্বীপের ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধ বাড়ার প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এক যৌথ বিবৃতিতে দেশগুলো ১৮ জানুয়ারি জানায়, শুল্কের হুমকি ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং তা বিপজ্জনক উত্তেজনার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তারা সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার নীতির ভিত্তিতে সংলাপে আগ্রহী বলেও জানায়।
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডরিকসেন বলেন, ইউরোপজুড়ে যে ঐক্যবদ্ধ বার্তা মিলছে, তা তাকে উৎসাহিত করেছে। তিনি বলেন, “ইউরোপকে ব্ল্যাকমেইল করা যাবে না।”
ট্রাম্পের শুল্ক হুমকির প্রভাব বৈশ্বিক বাজারেও পড়েছে। ডলারের বিপরীতে ইউরো ও পাউন্ডের দর কমেছে এবং বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তি নিয়েও প্রশ্ন
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, তিনি এসিআই সক্রিয় করার পক্ষে জোর দিচ্ছেন।
তবে আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মাইকেল মার্টিন বলেন, ইইউ পাল্টা ব্যবস্থা নেবে—এতে সন্দেহ নেই, তবে এখনই এই অস্ত্র প্রয়োগ ‘কিছুটা তড়িঘড়ি’ হবে।
তুলনামূলক ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি শুল্ক হুমকিকে ‘ভুল সিদ্ধান্ত’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি জানান, কয়েক ঘণ্টা আগেই ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।
যুক্তরাজ্যের সংস্কৃতিমন্ত্রী লিসা ন্যান্ডি বলেন, এই বিরোধ মেটাতে মিত্রদের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একযোগে কাজ করা উচিত।
স্কাই নিউজকে তিনি বলেন, গ্রিনল্যান্ড বিষয়ে যুক্তরাজ্যের অবস্থান ‘অপরিবর্তনীয়’। এবং সম্মিলিত স্বার্থেই কথার যুদ্ধ নয়, সংলাপ দরকার।
তবে এই শুল্ক হুমকি মে মাসে ব্রিটেনের সঙ্গে এবং জুলাইয়ে ইইউর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের করা বাণিজ্য চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। এসব সীমিত চুক্তি আগেই একতরফা সুবিধার অভিযোগে সমালোচিত—যুক্তরাষ্ট্র যেখানে বিস্তৃত শুল্ক বজায় রেখেছে, সেখানে অংশীদার দেশগুলোকে আমদানি শুল্ক কমাতে হয়েছে।
তবে এই শুল্ক হুমকি মে মাসে যুক্তরাজ্য ও জুলাইয়ে ইইউর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের করা বাণিজ্য চুক্তিগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। এসব সীমিত চুক্তি অসম ভারসাম্যের জন্য এখনই সমালোচিত— যেখানে যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক বহাল রাখলেও অংশীদারদের আমদানি শুল্ক কমাতে হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ইইউ–যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে কাজ স্থগিত রাখতে পারে। শুল্ক প্রত্যাহার নিয়ে ২৬–২৭ জানুয়ারি ভোট হওয়ার কথা থাকলেও ইউরোপিয়ান পিপলস পার্টির নেতা মানফ্রেড ওয়েবার জানিয়েছেন, আপাতত অনুমোদনের (শুল্ক প্রত্যাহার) সুযোগ নেই।
জার্মানির এক আইনপ্রণেতা ইউরগেন হার্ডট বলেন, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্পকে চাপে ফেলতে ‘শেষ উপায়’ হিসেবে চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিতব্য ফুটবল বিশ্বকাপ বর্জনের কথাও বিবেচনায় আনা যেতে পারে।
সব মিলিয়ে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুকে কেন্দ্র করে ট্রাম্পের শুল্ক হুমকি ইউরোপ–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের পাশাপাশি বৈশ্বিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তা রাজনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।