বিবিসি
প্রকাশ : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ ১৫:১৮ পিএম
আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ ১৫:৫৩ পিএম
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গ্রিনল্যান্ডকে যুক্ত করে নিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যে অভিলাষ, তার বিরোধিতাকারী দেশগুলোর ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের হুমকি দেওয়া দেওয়া হয়েছে।
তবে কোন কোন দেশ এই শুল্কের আওতায় আসবে কিংবা কোন আইনি ক্ষমতায় তিনি এ ধরনের আমদানি কর আরোপ করবেন—সে বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি।
ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের পাশাপাশি অন্যান্য দেশও তার (ট্রাম্প) পরিকল্পনার বিরুদ্ধে। এমনকি খোদ যুক্তরাষ্ট্রের অনেকেই এই অধিগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রান্তিক পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে শুক্রবার হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, “যারা গ্রিনল্যান্ডের (অধিগ্রহণ) সঙ্গে যারা না যাবে, তাদের ওপর শুল্ক আরোপ হতে পারে।”
তিনি এমন সময় বৈঠকে এই কথাগুলো বলছিলেন, যখন এই ইস্যুতে সমর্থন জানাতে রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক পার্টির কংগ্রেস সদস্যদের একটি প্রতিনিধিদল গ্রিনল্যান্ড সফরে ছিলেন।
এই সফরে উভয় দলের ১১ সদস্য ডেনিশ প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডরিকসেন ও গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স-ফ্রেডরিক নিলসেনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
প্রতিনিধিদলটির নেতা, ডেমোক্র্যাট সেনেটর ক্রিস কুনস বলেন, সফরের মূল উদ্দেশ্যই হলো স্থানীয়দের মতামত শুনে তা ওয়াশিংটনকে জানিয়ে দেশ দুটির মধ্যে উত্তেজনা কমানো।
গ্রিনল্যান্ড কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
ডেনমার্ক নিয়ন্ত্রিত স্ব-শাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বলেন ট্রাম্প।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে গ্রিনল্যান্ডকে ‘সহজভাবে’ বা ‘কঠিনভাবে’ দখল করতে পারে—এ কথা বলে ট্রাম্প খুব সম্ভবত দ্বীপটি কিনে নেওয়া বা জোরপূর্বক দখলের ইঙ্গিত দিচ্ছেন।
হোয়াইট হাউসে গ্রিনল্যান্ড ও গ্রামীণ স্বাস্থ্য বিষয়ে ১৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, “যদি দেশগুলো গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আমাদের সঙ্গে একমত নাহয়, তবে আমি তাদের ওপর শুল্ক আরোপ করতে পারি, কারণ জাতীয় নিরাপত্তার জন্য আমাদের গ্রিনল্যান্ড প্রয়োজন।”
গ্রিনল্যান্ড কম জনবসতিপূর্ণ হলেও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। উত্তর আমেরিকা ও আর্কটিক অঞ্চলের মধ্যে এর অবস্থান হওয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ক্ষেত্রে প্রাথমিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থা স্থাপনে এবং ওই অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের ওপর নজরদারিতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই গ্রিনল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে পিটুফিক ঘাঁটিতের শতাধিক সেনা স্থায়ীভাবে মোতায়েন করেছে।
এই ঘাঁটিটি মূলত ক্ষেপণাস্ত্র নজরদারি স্টেশন হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকেই যুক্তরাষ্ট্র পরিচালনা করছে। ডেনমার্কের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র যে কোনো সময় গ্রিনল্যান্ডে সেনা পাঠানোর অধিকার রাখে।
তবে ট্রাম্প বলেছেন, সম্ভাব্য রাশিয়ান বা চীনা হামলা প্রতিরোধে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা’ নিশ্চিত করতে হবে।
এ বিসয়ে ডেনমার্ক সতর্ক করেছে, যদি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয় তবে তা পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর (ট্রান্স-আটলান্টিক প্রতিরক্ষা জোট) শেষ নিয়ে আসবে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে প্রভাবশালী অংশীদার। ডেনমার্কও এই জোটটির অংশীদার।
নাটোর মূল নীতি হলো— বাহিরের কোনো শক্তি যদি জোটের সদস্যের ওপর হামলা করে তাহলে অন্য সদস্যরা সহায়তা করবে। কিন্তু সম্প্রতি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যার কোনো নজির নেই, যেখানে এক সদস্য অন্য সদস্যের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিচ্ছে।
দুইপক্ষের মতভেদের মধ্যেও আশাবাদ
প্রতিনিধিদলটিতে রিপাবলিকান সিনেটররা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, যারা জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে গ্রিনল্যান্ড দখলের বিষয়ে উদ্বিগ্ন। তবে এই দলের অধিকাংশ ডেমোক্র্যাট ট্রাম্পের নীতি বিরোধী হলেও মধ্যপন্থী রিপাবলিকানও রিপাবলিকান সেনেটর থম টিলিস এবং লিসা মারকোস্কিও রয়েছেন।
গ্রিনল্যান্ডের এমপি আজা কেমনিটজ বলেছেন, প্রতিনিধিদলের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক তাকে ‘আশাবাদী’ করেছে। তিনি বিবিসিকে বলেন, “আমাদের বন্ধু প্রয়োজন। আমাদের মিত্র প্রয়োজন।”
হোয়াইট হাউস এবং গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের অবস্থানের মধ্যে ব্যাপক ফারাকের প্রশ্নে তিনি বলেন, “এটি ছোট একটি স্প্রিন্ট নয়, এটি একটি ম্যারাথন।
“যুক্তরাষ্ট্রের চাপ আমরা ২০১৯ সাল থেকে দেখছি। ভাবা অবাস্তব যে এখন সব শেষ হয়ে গেছে।”
তিনি যোগ করেন, “পরিস্থিতি প্রায় ঘণ্টা ঘণ্টায় পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই যত বেশি সমর্থন পাওয়া যায়, ততই ভালো।”
এ বিষয়ে ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দূত জেফ ল্যান্ড্রি ফক্স নিউজকে বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রকে ডেনমার্কের সঙ্গে নয়, বরং গ্রিনল্যান্ডের নেতাদের সঙ্গে কথা বলা উচিত।
“আমি বিশ্বাস করি, একবার পরিস্থিতি সমাধান হলে একটি চুক্তি হবে এবং হবেই।”
ল্যান্ড্রি আরও বলেন, “প্রেসিডেন্ট সিরিয়াস। তিনি ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশ দিয়েছেন। ডেনমার্ককে জানানো হয়েছে তিনি কী চাইছেন।
“এখন পরবর্তী ধাপ হলো সচিব মার্কো রুবিও এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের মাধ্যমে চুক্তি সম্পন্ন করা।”
তিনি যুক্তি দেন, “যুক্তরাষ্ট্র সর্বদা স্বাগতমূলক ভূমিকা পালন করেছে। আমরা কাউকে দখল করার বা কোনো দেশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করি না।
“আমরা বলি, ‘শুনুন, আমরা স্বাধীনতার প্রতিনিধিত্ব করি। আমরা অর্থনৈতিক শক্তি ও সুরক্ষা নিশ্চিত করি।”
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
ইউরোপীয় দেশগুলো ডেনমার্কের পক্ষে সমর্থন জানিয়ে জানিয়েছে, আর্কটিক অঞ্চল তাদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ এবং এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ন্যাটোর যৌথ দায়িত্ব থাকা উচিত, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রেরও অংশগ্রহণ করা উচিত।
ফ্রান্স, জার্মানি, সুইডেন, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে গ্রিনল্যান্ডে সীমিত সংখ্যক সৈন্য পাঠিয়েছে, যা তাদের একটি নজরদারি মিশন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমম্যানুয়েল ম্যাক্রন জানিয়েছেন, শীঘ্রই স্থল, বায়ু ও নৌ বাহিনীও সেখানে মোতায়েন করা হবে।