প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ ২১:৩৭ পিএম
আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ ২২:২০ পিএম
ইরানে জিনিসপত্রের আকাশচুম্বী দামের প্রতিবাদে তেহরানের রাস্তায় বিক্ষোভকারীরা। ছবি: রয়টার্স
ইরানে জিনিসপত্রের আকাশচুম্বী দামের প্রতিবাদে শুরু হওয়া কয়েকদিনের বিক্ষোভে সরকারি বাহিনীর দমন-পীড়নে ‘শত শত’ বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার দাবি করেছে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি’ (এইচআরএএনএ) তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দাবি করেছে, চলমান বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত অন্তত ১,৮৫০ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি তারা জানিয়েছে, এই সময়ে অন্তত ১৬,৭৮৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সিএনএন জানিয়েছে, তারা স্বাধীনভাবে এই সংখ্যার সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।
তবে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ প্রায় ২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন বলে মঙ্গলবার জানিয়েছেন এক ইরানি কর্মকর্তা। দেশজুড়ে টানা দুই সপ্তাহের অস্থিরতায় কঠোর দমন-পীড়নের ফলে এত বড় প্রাণহানির বিষয়টি এই প্রথমবারের মতো স্বীকার করল কর্তৃপক্ষ।
ওই ইরানি কর্মকর্তা যাদের তিনি ‘সন্ত্রাসী’ বলে আখ্যা দিয়েছেন, তারাই বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মৃত্যুর জন্য দায়ী। তবে নিহতদের সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত কোনো তথ্য দেননি।
ইরানজুড়ে ইন্টারনেট ও টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় নিহতের প্রকৃত সংখ্যা বা গ্রেপ্তারের এই পরিসংখ্যান পুরোপুরি নির্ভুল কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বর্তমানের এই অস্থিরতা ইরানি কর্তৃপক্ষের জন্য সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি দিলে ইরানও পাল্টা যুদ্ধের হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, তারা যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত।
এ পরিস্থিতিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা দলের সঙ্গে বসে পথ খুঁজবেন ট্রাম্প।
এদিকে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ক্ষমতায় থাকা ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্ব বিক্ষোভের বিষয়ে দ্বিমুখী কৌশল নিয়েছে। তারা অর্থনৈতিক সমস্যাজনিত প্রতিবাদকে বৈধ বলে স্বীকার করলেও, একই সঙ্গে কঠোর নিরাপত্তা দমন-পীড়ন চালাচ্ছে।
জাতিসংঘের উদ্বেগ ও নিহতের অমীমাংসিত সংখ্যা
জাতিসংঘের মানবাধিকার
প্রধান ভলকার তুর্ক ইরানে বাড়তে থাকা সহিংসতাকে ‘ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করেছেন।
তার মুখপাত্র জেরেমি লরেন্স জানান, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের কারণে সঠিক সংখ্যা নিশ্চিত
করা কঠিন হলেও বিভিন্ন সূত্র থেকে শত শত মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে।
তুর্ক এক বিবৃতিতে বলেন, “এই সহিংসতা অবশ্যই বন্ধ হতে হবে। ইরানি জনগণের ইনসাফ ও সমঅধিকারের
দাবি সরকারকে শুনতে হবে।”
এছাড়া, বিক্ষোভকারীদের ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দেওয়া এবং দ্রুত বিচারে তাদের মৃত্যুদণ্ড
দেওয়ার পরিকল্পনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে সংস্থাটি।
ওয়াশিংটন-তেহরান বাকযুদ্ধ
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের
নতুন হামলার হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সরাসরি হুঁশিয়ারি
দিয়েছেন।
তিনি বলেন, “ওয়াশিংটন যদি তাদের সামরিক শক্তি আবারও পরখ করতে চায়, তবে আমরা প্রস্তুত।”
এদিকে, হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ইরান গোপনে আলোচনার বার্তা দিলেও প্রকাশ্যে আক্রমণাত্মক
কথা বলছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন, প্রয়োজনে তিনি সামরিক পথ বেছে নিতে দ্বিধা করবেন
না।
বিভক্ত বিশ্ব প্রতিক্রিয়া
ইরান পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বনেতারা দুই ভাগে বিভক্ত।
ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু তাদের সাহসের প্রশংসা করেছেন। জার্মানি ও স্পেনসহ ইইউ দেশগুলো নতুন নিষেধাজ্ঞার কথা ভাবছে।
অন্যদিকে, রাশিয়া, চীন ও তুরস্ক বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছে। তুরস্কের দাবি, এই বিক্ষোভে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের উসকানি রয়েছে।
অভ্যন্তরীণ অবস্থা ও ‘ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট’
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, সরকার অর্থনৈতিক সমস্যা নিয়ে কথা শুনতে
রাজি, কিন্তু দাঙ্গাকারীদের সমাজ ধ্বংস করতে দেওয়া হবে না।
বর্তমানে ইরানে টানা পাঁচ দিন ধরে ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়েছে। এই ব্ল্যাকআউটের মধ্যেই
ইলন মাস্কের ‘স্টারলিঙ্ক’ ইন্টারনেট ব্যবহারের চেষ্টা করা হলে সরকার সেই টার্মিনালগুলো
জব্দ করছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপ ও ট্রাম্পের বৈঠক
ইরান ইস্যুতে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণে মঙ্গলবার নিজের জাতীয় নিরাপত্তা দলের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তাকে এখন কূটনীতি বনাম সামরিক অভিযানের কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
ট্রাম্প সামরিক পথ বেছে নিলে লক্ষ্যবস্তু হতে পারে ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্র বা সরকারি ভবন। তবে বিকল্প হিসেবে সাইবার আক্রমণ বা কঠোর নিষেধাজ্ঞার বিষয়গুলোও টেবিলে রয়েছে।
বিক্ষোভের প্রেক্ষাপট: কেন এই অস্থিরতা?
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মুদ্রাস্ফীতি ও রিয়ালের রেকর্ড দরপতনের জেরে এই বিক্ষোভ শুরু
হয়।
বর্তমানে এক ডলারের দাম ১৪ লাখ রিয়াল ছাড়িয়ে গেছে, ফলে খাবারের দাম বেড়েছে প্রায় ৭২
শতাংশ। বিক্ষোভকারীরা এখন কেবল অর্থনৈতিক দাবি নয়, বরং বর্তমান শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন
ও গণতন্ত্রের দাবি তুলছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিক্ষোভ ‘নেতৃত্বহীন’ হলেও মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকে জন্ম
নেওয়া এই আন্দোলন দমন করা সহজ হবে না।