প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ ২১:৩৩ পিএম
ভেনেজুয়েলার মারাকাইবো উপসাগরে নোঙর করা তেলবাহী জাহাজ ‘মিনার্ভা অ্যাস্ট্রা’। ছবি: এএফপি
নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ঝেড়ে কেশেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই অভিযানের উদ্দেশ্য যে ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর থাবা বসানো, তা সাফ জানিয়েছে তিনি।
ওয়াশিংটনে তার রিসোর্টে ৩ জানুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, “আমাদের বড় বড় মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো যারা বিশ্বের সেরা, তারা ওখানে (ভেনেজুয়েলায়) যাবে। তারা কোটি কোটি ডলার খরচ করে ওখানকার লক্কড়-ঝক্কড় তেল অবকাঠামো ঠিক করবে এবং দেশের জন্য টাকা আয় করা শুরু করবে।”
তবে মাদুরোকে আটক করা আর ট্রাম্পের এই বড় বড় কথার মাঝেও একটি কঠিন বাস্তবতা রয়ে গেছে। ভেনেজুয়েলা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম তেলের খনি হতে পারে, কিন্তু বর্তমানে যে টালমাটাল অবস্থা, তাতে বড় বড় তেল কোম্পানিগুলো সেখানে বিনিয়োগ করতে কতটা সাহস পাবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
ট্রাম্পের ইচ্ছা পূরণ হওয়া এত সহজ নয়। ভেনেজুয়েলার অতীত ইতিহাস খুবই তেতো, বর্তমান উত্তাল আর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। তাই মার্কিন কোম্পানিগুলো সেখানে বিনিয়োগ করার আগে অন্তত ৫টি শর্ত পূরণ হওয়া খুব জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আইনের শাসন ও নিরাপত্তা
ভেনেজুয়েলার সরকারি তেল কোম্পানি ‘পিডিভিএসএ’ এখন কার্যত সেনাবাহিনীর দখলে। সেখানে চুরি-চামারি আর লুটপাট নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। মার্কিন কোম্পানিগুলো সেখানে যাওয়ার আগে নিশ্চিত হতে চায় যে তাদের কর্মী আর দামী যন্ত্রপাতি সেখানে নিরাপদ থাকবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুরুতে হয়তো মার্কিন সেনাবাহিনীকেই এই নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে হবে। কারণ, পাইপলাইন যদি বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়া হয়, তবে সেখানে তেল তোলা অসম্ভব। কোনো কোম্পানিই ঝুঁকি নিয়ে সেখানে টাকা ঢালতে চাইবে না।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা
ভেনেজুয়েলার ভেঙে পড়া তেল শিল্পকে আগের অবস্থায় ফেরাতে হলে প্রতি বছর প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার খরচ করতে হবে। আর এই বিনিয়োগ তুলে আনতে অন্তত এক দশক সময় লাগবে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে হয়তো ৪৯তম প্রেসিডেন্ট চলে আসবেন। তাই কোম্পানিগুলো নিশ্চিত হতে চায়, কয়েক বছর পর ভেনেজুয়েলা বা যুক্তরাষ্ট্রের সরকার বদলে গেলে যেন নিয়মনীতি আবার বদলে না যায়। শুধু বর্তমান প্রশাসনের মুখের কথায় তারা আশ্বস্ত হতে পারছে না; তাদের চাই শক্ত রাজনৈতিক নিশ্চয়তা।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও নতুন আইন
বর্তমানে ভেনেজুয়েলার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলার আইনও বিদেশি কোম্পানিগুলোর জন্য খুব একটা সুবিধার নয়। সেখানে রয়্যালটি আর করহার অনেক বেশি। কোম্পানিগুলো বিনিয়োগের কথা ভাবার আগে এই সব বাধা দূর হওয়া প্রয়োজন। এখনকার বাজার আগের মতো নেই; গায়ানা বা আর্জেন্টিনার মতো দেশগুলো এখন তেলের বাজারে বড় খেলোয়াড়। তাই ভেনেজুয়েলাকে যদি সেরা কোম্পানিগুলোকে টানতে হয়, তবে তাদের চুক্তির শর্তগুলো অনেক সহজ করতে হবে।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক লুইসা পালাসিওস সিএনএনকে বলেন, “ভেনেজুয়েলার রাজস্ব কাঠামো অত্যন্ত প্রতিকূল, এমন একটি জায়গায় কেউ যেতে চাইবে কেন?”
পুরনো দেনা শোধ
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৭ সালে ভেনেজুয়েলা সরকার এনি, রেপসল, কনোকোফিলিপস ও এক্সন মবিলের মতো বড় বড় কোম্পানির সব সম্পদ জোর করে দখল করে নিয়ে তাদের দেশ থেকে বের করে দিয়েছিল। সেই কোম্পানিগুলো এখন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ পাওনা। কোম্পানিগুলো সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা ভোলেনি।
পিকারিং এনার্জি পার্টনার্সের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ড্যান পিকারিং বলেন, “নতুন করে বিনিয়োগের আগে ভেনেজুয়েলাকে অন্তত কিছু পাওনা মেটাতে হবে। কিন্তু সমস্যা হলো, দেশটির হাতে এখন সেই টাকা নেই।”
আর্থিক গ্যারান্টি
ভেনেজুয়েলার পুরনো তেলের খনিগুলো আবার সচল করতে হলেও বিপুল অর্থের প্রয়োজন। এর জন্য মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক গ্যারান্টি বা কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা করার মতো উৎসাহমূলক পদক্ষেপ কোম্পানিগুলোর জন্য জরুরি হতে পারে। ট্রাম্প হয়তো করদাতার টাকায় কোনো তহবিল তৈরির ইঙ্গিত দিয়েছেন, কিন্তু সেটা আদতে কতটা কার্যকর হবে তা এখনো পরিষ্কার নয়।
এতসব বাধা সত্ত্বেও
একটি সত্য হলো ভেনেজুয়েলায় তেলের মজুদ বিশাল। ঠিক দুই দশক আগে
ইরাকের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল থাকা সত্ত্বেও এই তেলের লোভেই কোম্পানিগুলো সেখানে গিয়েছিল।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যদি ভেনেজুয়েলার কাজের সম্পর্কটা ঠিকঠাক
গড়ে ওঠে, তবে সেখানে তেলের উৎপাদন বাড়ানো অসম্ভব কিছু নয়।