প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ ১৮:৫৭ পিএম
আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ ১৯:২১ পিএম
বিশ্বে সবচেয়ে বেশি তেল ভেনেজুয়েলার থাকলেও তা উঠালে পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কা করছেন পরিবেশবিদরা। ছবিতে দেখা যাচ্ছে ভেনেজুয়েলার পুয়ের্তো ক্যাবেলোতে এল প্যালিটো শোধনাগার। ছবি: সিএনএন
ভেনেজুয়েলার মাটির নিচে ৩০ হাজার কোটি (৩০০ বিলিয়ন) ব্যারেলের বেশি তেল আছে, যা সারা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন সেই সম্পদের মালিকানা দাবি করে থাবা বসিয়েছে।
কিন্তু বিজ্ঞানীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ কেন? কারণ এই তেল পৃথিবীর জন্য সবচেয়ে ‘নোংরা’ তেলগুলোর একটি।
তারা বলছেন, এই তেল তুলে পরিশোধনে গেলে বড় ধরনের পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দেবে।
এই তেলকে কেন ‘নোংরা’ বলা হচ্ছে?
পরিবেশবিদরা বলছেন, এটি কোনো রাজনৈতিক কথা নয়, এটি বিজ্ঞান। ভেনেজুয়েলার ওরিনোকো বেল্টে যে তেল পাওয়া যায় তাকে বলা হয় 'হেভি সোর ক্রুড'।
"ভেনেজুয়েলার তেলকে নোংরা মনে করা হয় কোনো আদর্শগত কারণে নয়, বরং পদার্থবিজ্ঞান এবং অবকাঠামোগত কারণে," বলেছেন স্বাধীন থিংক ট্যাংক কার্বন ট্র্যাকারের জ্বালানি সরবরাহ গবেষণা প্রধান গাই প্রিন্স।
তিনি বলেন, “এই তেল সাধারণ পানির মতো তরল নয়, বরং অনেকটা চিটাগুড়ের মতো ঘন, আঠালো। হালকা তেলের চেয়ে এতে কার্বন এবং সালফারের পরিমাণ অনেক বেশি, যা পরিবেশের জন্য ভয়াবহ ক্ষতিকর।
“এই তেল তোলাটাই বড় বিপদের কারণ হতে পারে। ভেনেজুয়েলার এই ঘন তেল মাটির নিচ থেকে এমনি এমনি বেরিয়ে আসে না। এটাকে বের করতে হলে খনির ভেতর প্রচণ্ড গরম বাষ্প পাঠাতে হয়।”
পরিবেশ বিষয়ক অলাভজনক সংস্থা 'অয়েল চেঞ্জ ইন্টারন্যাশনাল'-এর গবেষণা সহ-পরিচালক লর্ন স্টকম্যান বলেন, "তেল খনি থেকে তরল হিসেবে নিজে থেকে বেরিয়ে আসে না। সাধারণত খনির ভেতরে বাষ্প পাম্প করার মাধ্যমে একে উত্তপ্ত করতে হয়।"
এই বাষ্প তৈরি করতে প্রচুর প্রাকৃতিক গ্যাস পোড়াতে হয়, যা থেকে প্রচুর পরিমাণে বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয়। অর্থাৎ, তেল ব্যবহারের আগেই তা তোলার সময় পরিবেশের বারোটা বেজে যায়।
ভেনেজুয়েলার তেলের পাইপলাইন আর পরিকাঠামো এতটাই পুরনো যে সেখান থেকে প্রচুর মিথেন গ্যাস লিক হয়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) মতে, ভেনেজুয়েলায় তেল উত্তোলনের সময় যে পরিমাণ মিথেন নির্গত হয়, তা বিশ্বের গড় হারের চেয়ে ৬ গুণ বেশি। মিথেন গ্যাস কার্বন-ডাই-অক্সাইডের চেয়েও ৮০ গুণ বেশি শক্তিশালী হারে পৃথিবীকে উত্তপ্ত করে।

খরচ আর সময়ের হিসাব
ট্রাম্প চাইলেই কাল থেকে লাখ লাখ ব্যারেল তেল আনতে পারবেন না। বিশ্লেষক সংস্থা রিস্টাড এনার্জির তথ্যমতে, শুধু বর্তমান উৎপাদন ঠিক রাখতে আগামী ১৫ বছরে ৫৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করতে হবে।
যদি ট্রাম্প তার স্বপ্ন অনুযায়ী উৎপাদন বাড়াতে চান, তবে ১৮৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ লাগবে, যা কাজ শেষ হতে অন্তত ১০ থেকে ১৫ বছর সময় নেবে।
পরিবেশের ওপর অন্য বিপদ
২০১৬ সাল থেকে ভেনেজুয়েলা তাদের তেল লিক হওয়ার তথ্য গোপন করছে। কিন্তু বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনের মতে, সেখানে পাইপলাইন ফেটে নদী আর সমুদ্রের পানি নষ্ট হওয়া এখন নিত্যদিনের ঘটনা। ২০২৬ সালের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে ট্রাম্প যদি আরও বেশি তেল উত্তোলনের নির্দেশ দেন, তবে এই পরিবেশ দূষণ বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আরও দ্রুত উত্তপ্ত হবে পৃথিবী
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কানাডা হোক বা ভেনেজুয়েলা—এই ধরণের ‘নোংরা তেল’ মাটির নিচেই থাকা ভালো। ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা যদি সফল হয়, তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হয়তো সাময়িকভাবে কমবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে পৃথিবী আরও দ্রুত উত্তপ্ত হবে এবং বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় ডেকে আনবে।