প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৬ জানুয়ারি ২০২৬ ২২:৩৮ পিএম
যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার পর চিলির সান্তিয়াগোতে গত ৩ জানুয়ারি উল্লাস করে ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদোর সমর্থকরা। ছবি: রয়টার্স
ভেনেজুয়েলার দাপুটে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র বন্দি করে নিয়ে যাওয়ার পর দেশটির প্রধান বিরোধী নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদো বেশ চনমনে মেজাজে আছেন। খুব দ্রুত দেশে ফিরছেন জানিয়ে তিনি বলেছেন, নির্বাচন চান। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তিনি ৯০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে জিতবেন।
কিন্তু সমস্যা অন্য
জায়গায়। ট্রাম্প এখন চাচ্ছেন মাদুরোর পুরনো লোকজনের সঙ্গে আপাতত কাজ চালিয়ে নিতে। এতে
কিছুটা দমে গেছে বিরোধীরা।
সব মিলিয়ে ভেনেজুয়েলার
ভবিষ্যৎ নিয়ে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
৫৮ বছর বয়সী মাচাদো একজন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ার। তিনি তিন সন্তানের জননী। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার গহণের জন্য গত অক্টোবরে ছদ্মবেশে দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন তিনি। সেই পুরস্কারও তিনি ট্রাম্পকে উৎসর্গ করেছিলেন।

ফক্স নিউজকে দেওয়া এক
সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমি যত দ্রুত সম্ভব ভেনেজুয়েলায় ফেরার পরিকল্পনা করছি। আমরা
বিশ্বাস করি এই পরিবর্তন এগিয়ে নেওয়া উচিত। ২০২৪ সালের নির্বাচনে জালিয়াতির মধ্যেও
আমরা বিশাল ব্যবধানে জিতেছিলাম। এবার একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে আমরা ৯০ শতাংশের
বেশি ভোট পাব।”
তবে ট্রাম্পের সুর ভিন্ন।
এনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, নির্বাচনের আগে ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ
সমস্যাগুলো সমাধান করা জরুরি। ৩০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করাকে ‘অবাস্তব’ আখ্যা দিয়ে
তিনি বলেন, “আগে আমাদের দেশটিকে ঠিক করতে হবে। এখন নির্বাচন সম্ভব নয়, মানুষ ভোট দেওয়ার
মতো পরিস্থিতিতেই নেই।”
সমাজতন্ত্রীরাই এখনও
ভেনেজুয়েলার নিয়ন্ত্রণে
মার্কিন বাহিনীর হাতে
শনিবার মাদুরো ধরা পড়ার পর সোমবার রাতে দেওয়া প্রথম সাক্ষাৎকারে মাচাদো তার বর্তমান
অবস্থান বা ফেরার দিনক্ষণ নিয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি। কারণ এখনো ভেনেজুয়েলায়
মাদুরোর অনুসারী সমাজতন্ত্রীরাই ক্ষমতায় রয়েছে এবং মাচাদোর বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীতে
বিদ্রোহ উসকানি দেওয়ার অভিযোগে তদন্ত চলছে।
বিদেশে থাকা লাখ লাখ
ভেনেজুয়েলানদের হতাশ করে ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন, মাচাদোর যথেষ্ট জনসমর্থন নেই। যদিও
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এবং মার্কিন মিত্রদের মতে, ২০২৪ সালের নির্বাচনে মাচাদোকে নিষিদ্ধ
করা হয়েছিল এবং তার মনোনীত প্রার্থীকেই জালিয়াতি করে হারানো হয়েছিল।
অন্যদিকে, বর্তমানে
দায়িত্বরত ডেলসি রদ্রিগেজ একজন কট্টর মাদুরো সমর্থক। তিনি মাদুরোর গ্রেপ্তারকে “অপহরণ”
বলে অভিহিত করলেও ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্মানজনক সম্পর্ক বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
মাচাদো রদ্রিগেজের কড়া সমালোচনা করে তাকে “নির্যাতন, দমন-পীড়ন এবং মাদক পাচারের অন্যতম
কারিগর” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
ট্রাম্পের প্রতি
কৃতজ্ঞতা
মাচাদো বলেন, ট্রাম্প
ভেনেজুয়েলার জন্য যা করেছেন তার জন্য তিনি তাকে ব্যক্তিগতভাবে নোবেল পুরস্কার দিতে
চান। গত শনিবারের অভিযান সম্পর্কে তিনি বলেন, “৩ জানুয়ারি ইতিহাসে বিচারিক জয়ের দিন
হিসেবে লেখা থাকবে।” এই “মাদক-সন্ত্রাসী” শাসনের বিরুদ্ধে সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য
তিনি ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান।
মাচাদোর মতে, বিশ্বের
বৃহত্তম তেলের মজুদ থাকা ভেনেজুয়েলা মার্কিন মিত্রতায় আমেরিকার জ্বালানি হাবে পরিণত
হবে এবং দেশে আইনের শাসন ফিরে আসবে। তবে গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ট্রাম্পকে পরামর্শ দিয়েছে,
দেশে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে রদ্রিগেজ ও বর্তমান প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ওপর ভরসা করাই
হবে সবচেয়ে ভালো বাজি।
জেলের ঘানি টানছেন
মাদুরো
এদিকে ৬৩ বছর বয়সী মাদুরো
সোমবার ম্যানহাটন আদালতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। পায়ে শিকল এবং কয়েদির পোশাকে
দাঁড়িয়ে তিনি নিজেকে “ভদ্রলোক” এবং ভেনেজুয়েলার বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে দাবি করেন।
দীর্ঘদিন ধরে তার বিরুদ্ধে চলা মাদক পাচারের অভিযোগকে তিনি “সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত”
বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
ভেনেজুয়েলার তেল সমৃদ্ধি থাকলেও অব্যবস্থাপনা এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে বর্তমানে উৎপাদন তলানিতে ঠেকেছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পর মঙ্গলবার টানা পঞ্চম দিনের মতো ভেনেজুয়েলার বন্দরগুলো থেকে কোনো অপরিশোধিত তেল এশিয়ায় পাঠানো সম্ভব হয়নি।

ভেনেজুয়েলার সাধারণ
মানুষের কী হবে?
দেশটির তেল সম্পদ বিশ্বের
সবচেয়ে বেশি হলেও রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে সাধারণ মানুষের অবস্থা খুবই খারাপ। জিনিসের দাম
আকাশচুম্বী, খাবার নেই, চিকিৎসা নেই। ট্রাম্প বলছেন, এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রই ভেনেজুয়েলার
দেখাশোনা করবে এবং বড় বড় কোম্পানি দিয়ে তাদের তেলের খনিগুলো আবার সচল করবে।
কেন বিশ্বজুড়ে হইচই?
১৯৮৯ সালে পানামা আক্রমণের
পর লাতিন আমেরিকায় মাদুরোকে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় নাক গলানোর
ঘটনা। রাশিয়া আর চীন এই ঘটনার কড়া নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলছে, গায়ের জোরে এভাবে অন্য
দেশের প্রেসিডেন্টকে ধরে নিয়ে যাওয়া ঠিক নয়। জাতিসংঘও বলেছে, যাদের শক্তি আছে তারা
যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারে—এটা তেমনই একটা খারাপ উদাহরণ হয়ে থাকল।
সংবিধানের তোয়াক্কা
নেই ট্রাম্পের
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের
একতরফা সামরিক হামলা আর কংগ্রেসের নীরবতা—এই চেনা চিত্রই আবার দেখা গেল। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট
নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন বাহিনীর হাতে আটকের পর ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের ক্ষমতা সীমিত
করতে উঠেপড়ে লেগেছে। সিনেটর চাক শুমার এক সপ্তাহের মধ্যে ভোটাভুটির ঘোষণা দিলেও এর
সাফল্যের সম্ভাবনা ক্ষীণ।
মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী
কেবল কংগ্রেসের যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা থাকলেও, ট্রাম্প তা তোয়াক্কা করেননি। বিশেষজ্ঞরা
একে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার চরম অপব্যবহার বলছেন। যদিও এর আগে ডেমোক্র্যাটদের আনা একই
ধরনের প্রস্তাবগুলো রিপাবলিকানদের বিরোধিতায় ভেস্তে গেছে। রিপাবলিকানদের বড় অংশ এখনও
ট্রাম্পের পাশেই আছে। এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেস যদি ব্যবস্থা না নেয়, তবে ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্টের
একনায়কতন্ত্র আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।