প্রবা ডেস্ক
প্রকাশ : ২২ ডিসেম্বর ২০২২ ১৬:২১ পিএম
আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২৩ ২০:২৩ পিএম
৭৪ বছর পর মিয়ানমার নিয়ে বুধবার প্রথম প্রস্তাব পাস করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। তাতে ভোট দেয়নি ভারত, চীন ও রাশিয়া। ছবি: সংগৃহীত
মিয়ানমারের সর্বশেষ সামরিক অভ্যুত্থানের মেয়াদ দুই বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে। দেশটিতে স্বাভাবিক অবস্থা ফেরাতে আন্তর্জাতিক মহলগুলো ওই অর্থে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এ অবস্থায় বুধবার জাতিসংঘের ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদ মিয়ানমার নিয়ে একটি প্রস্তাব পাস করেছে। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের সদস্য হওয়ার পর মিয়ানমার নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের এটাই প্রথম প্রস্তাব। প্রস্তাবে সব ধরনের সহিংসতা বন্ধ ও রাজনৈতিকবন্দিদের মুক্তি দিতে জান্তা সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রস্তাবটি উত্থাপনের উদ্যোগ নেয় যুক্তরাজ্য।
কিন্তু প্রস্তাবে তিন গুরুত্বপূর্ণ দেশ ভারত, চীন ও রাশিয়া ভোটদান থেকে বিরত থাকে। অর্থাৎ জাতিসংঘের সদস্য হওয়ার পর মিয়ানমার নিয়ে ইতিহাসের প্রথম প্রস্তাবে বিভক্ত হয়ে পড়ে নিরাপত্তা পরিষদ। লক্ষ্যণীয় বিষয়, চলতি মাসে নিরাপত্তা পরিষদের প্রেসিডেন্সি ভারতের হাতে। মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের প্রায় ১৭ শ কিলোমিটারের যৌথ সীমানা রয়েছে।
স্ক্রলডটইনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বুধবারের (২২ ডিসেম্বর) প্রস্তাবের পর জাতিসংঘে নিয়োজিত ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি রুচিরা কাম্বোজ সাংবাদিকদের বলেন, ‘মিয়ানমারের পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল বলে মনে করে নয়াদিল্লি। এ পরিস্থিতিতে দেশটির সমস্য সমাধানের জন্য আমাদের ‘ঠাণ্ডা মাথায় ধৈর্য্য ধরে কূটনীতি’ চালিয়ে যেতে হবে। তা না করে নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব পাস দেশটির পরিস্থিতি আরও জটিলতর করে তোলতে পারে।’
অন্যদিকে আরেক গুরুত্বর্পূর্ণ প্রতিবেশী চীনের সঙ্গে মিয়ানমারের সীমান্তের পরিমিাণ দুই হাজার কিলোমিটারের বেশি। নিরাপত্তা পরিষদের ভোটাভুটি শেষে জাতিসংঘের চীনা প্রতিনিধি জাং জুন বলেন, ‘নিরাপত্তা পরিষদ মিয়ানমার নিয়ে যে প্রস্তাব পাস করেছে, তা নিয়ে বেইজিংয়ের আপত্তি রয়েছে। মিয়ানমার সংকট সমাধানের জন্য শর্টকাট কোনো পথ নেই। প্রস্তাব পাস না করে মিয়ানমার নিয়ে একটি সর্বসম্মত বিবৃতি দেওয়াটাই বেশি কাজের হতো।’
সীমান্ত না থাকলেও মিয়ানমার জান্তা সরকারের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র রাশিয়া। প্রস্তাবে ভোট না দেওয়া প্রসঙ্গে জাতিসংঘের রুশ প্রতিনিধি ভ্যাসিলি নেবেনজিয়া বলেন, ‘মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি কোনো মতেই আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি নয়। এ অবস্থায় নিরাপত্তা পরিষদের মিয়ানমারবিরোধী পদক্ষেপ শুধু অযথার্থই নয়, বরং আগামীতে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার পথে বাধা।’
মিয়ানমারে ভারত ও চীনের বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে। উভয় দেশ মিয়ানমারে নৌবন্দরসহ কৌশলগত নানান অবকাঠামো নির্মাণ করছে। এই দুই দেশের পাশাপাশি জাপানেরও বড় ধরনের বিনিয়োগ রয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশটিতে। আর অভ্যুত্থানের পর থেকে জান্তা সরকারকে বিপুল পরিমাণে অস্ত্র বিক্রি করছে রাশিয়া।
২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি অং সান সু চি ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি উইন মিন্টসহ মিয়ানমারের শীর্ষ রাজনীতিবিদদের গ্রেপ্তার করে দেশটির সেনাবাহিনী। ঘোষণা করে বছরব্যাপী জরুরি অবস্থা। আগের বছরের ডিসেম্বরে সম্পন্ন জাতীয় নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানায় সেনাবাহিনী। কিন্তু নিজেদের দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি তারা। অথচ ওই নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়েছিল সু চির দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি)।
সামরিক অভ্যুত্থানের পরপরই মিয়ানমারের শহরগুলো জান্তাবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভ শহর থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। ক্রমশ কঠোর থেকে কঠোর হাতে বিক্ষোভ দমন শুরু করে সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা।

সামরিক
অভ্যুত্থানের পর থেকে জান্তাবিরোধী বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে মিয়ানমারে। ৫ ডিসেম্বর ইয়াঙ্গুনে।
ছবি: সংগৃহীত
মিয়ানমার বিক্ষোভের তথ্যসংগ্রহকারী প্ল্যাটফর্ম অ্যাসিসট্যান্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনার্স (এএপিপি) গত মাসে জানায়, বিক্ষোভ শুরুর পর জান্তার বিভিন্ন বাহিনীর হাতে অন্তত দুই হাজার ৪৬৫ সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন তার দ্বিগুণ। আটক হয়েছেন ১৬ হাজারের বেশি, যাদের প্রায় তিন হাজারকে সম্প্রতি সাধারণ মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
জান্তাবিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠী ইতোমধ্যে জাতীয় ঐক্য সরকার (নাগ) গঠন করেছে। তৈরি করেছে গণপ্রতিরক্ষা বাহিনী (পিডিএফ)। দেশটির প্রায় ২০টির মতো পুরোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে মিলে জান্তাবিরোধী জনযুদ্ধ করছে পিডিএফ। তাদের মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে জান্তা সরকার।