প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৮:০১ পিএম
আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৮:০৮ পিএম
নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাই কমিশনের সামনে মঙ্গলবার হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের বিক্ষোভ ও কুশপুত্তলিকা দাহ করে। ছবি: এএনআই
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির চানক্যপুরীতে অবস্থিত বাংলাদেশের হাইকমিশনের বাইরে, কলকাতার ডেপুটি হাইকমিশনের কাছে, জম্মু ও রাজৌরিতেও মঙ্গলবারও বিক্ষোভ করেছে কয়েকটি উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠী। এ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানাতে দেশটির হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে তলব করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
ভারতের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বলা হয়, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ
তুলে বিচার দাবিতে মঙ্গলবার বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) ও বাজরং দলসহ হিন্দু সংগঠনগুলো
ব্যারিকেড ভেঙে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। হাতে গেরুয়া পতাকা, মুখে ‘বাংলাদেশ মুর্দাবাদ’
স্লোগান দিতে দিতে তারা কুশপুত্তলিকা পোড়ায়।
ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে বলা হয়, ময়মনসিংহে হিন্দু শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা এবং মরদেহ জ্বালিয়ে দেওয়ার ঘটনায় প্রতিবাদ জানায় বিক্ষোভকারীরা। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের বাংলাদেশের হাইকমিশন ভবন থেকে ৫০০ মিটার দূরে আটকে দেয়। ঘটনাস্থলে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী কয়েক স্তরের ব্যারিকেড, পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
একই সঙ্গে মঙ্গলবার কলকাতাতেও উত্তেজনা ছড়ায়। ‘বঙ্গীয় হিন্দু জাগরণ’-এর ব্যানারে আয়োজিত ‘হিন্দু হুঙ্কার পদযাত্রা’ শিলদহ থেকে বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশনের দিকে এগোতে থাকলে বেকবাগান এলাকায় পুলিশ তা আটকে দেয়। বিক্ষোভকারীরা ‘হিন্দু হিন্দু ভাই ভাই’, ‘বাংলাদেশে হিন্দুদের নিরাপত্তা চাই’—এমন নানা স্লোগান দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সেখানে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
এদিকে জম্মু ও রাজৌরিতেও বাংলাদেশবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে। জম্মু ও কাশ্মীর হাইকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের আইনজীবীরা বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর হামলার অভিযোগ তুলে প্রতিবাদ জানান। তারা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর কাছে দাবি জানান- হয় বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক, নতুবা তাদের ভারতে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা হোক। একই সঙ্গে জম্মু থেকে অবৈধ বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদের দাবিও তোলা হয়।
এর আগে গত ২০ ডিসেম্বর রাতে কূটনৈতিক পাড়ার একই জায়গায় বাংলাদেশের হাইকমিশনারের বাসভবনের সামনে হঠাৎ একদল লোক বিক্ষোভ করে। ওই সময় হাইকমিশনারকে ‘প্রাণনাশের হুমকি’ দেওয়া হয় বলে সেদিন অভিযোগ করেছিলেন বাংলাদেশি হাইকমিশনের কর্মকর্তারা।
গত ২২ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়িতে বাংলাদেশের ভিসা আবেদন কেন্দ্রেও ভাঙচুর করে হিন্দু জাগরণ মঞ্চ ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ।
ভারতে বাংলাদেশের
মিশনগুলোতে নিরাপত্তাহীনতার প্রেক্ষাপটে নয়াদিল্লি, আগরতলা ও শিলিগুড়িতে বাংলাদেশের
ভিসা ও কনস্যুলার সেবা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।
ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করে উদ্বেগ জানালো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
ভারতজুড়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও কনস্যুলার এলাকাকে লক্ষ্য করে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানাতে দেশটির হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে তলব করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ভারতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশন প্রাঙ্গন এলাকায় সংঘটিত সহিংস বিক্ষোভের বিষয়ে প্রণয় ভার্মাকে তলব করে ভারত সরকারের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
এছাড়া ২০ ডিসেম্বর নয়াদিল্লিতে কূটনৈতিক এলাকায় বাংলাদেশ হাইকমিশন ও হাইকমিশনারের বাসভবনের বাইরে ঘটে যাওয়া অনাকাঙিক্ষত ঘটনা, সোমবার শিলিগুড়িতে বাংলাদেশ ভিসা কেন্দ্রে বিভিন্ন উগ্রপন্থি গোষ্ঠীর ভাঙচুরের ঘটনায় ভারত সরকারের কাছে উদ্বেগ জানানো হয়েছে বলে ওই বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
বলেছে, কূটনৈতিক স্থাপনায় এরকম ‘পরিকল্পিত সহিংসতা এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো কর্মকাণ্ডের’
তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
এতে বলা হয়, “এ ধরনের ঘটনা কেবল কূটনৈতিক মিশনের কর্মীদের নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলে দেয় না, বরং পারস্পরিক সম্মান, শান্তি ও সহনশীলতার যে নীতি রয়েছে তাকেও ক্ষুণ্ন করে।”
গত ২১ ডিসেম্বর বাংলাদেশের
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন জানিয়েছিলেন, ২০ ডিসেম্বর রাতে কূটনৈতিক এলাকায় নিরাপত্তা
বেস্টনি ভেদ করে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে গিয়ে বিক্ষোভ করেছে ‘হিন্দু চরমপন্থিদের’
একটি দল। এ সময় হাইকমিশনারকে হুমকি দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র
উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন অভিযোগ করেছেন, ভারতের পক্ষ থেকে “যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
হয়নি”।
ভারতের পররাষ্ট্র
মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলেছিল, একদল যুবক বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে বাংলাদেশের
ময়মনসিংহে দীপু চন্দ্র দাসের ঘটনার প্রতিবাদ করে স্লোগান দিয়েছে, কিন্তু বেস্টনি ভেদ
করা বা নিরাপত্তা পরিস্থিতি তৈরির কোনো চেষ্টা ছিল না।
এর আগে গত ১৪ ডিসেম্বর প্রণয় ভার্মাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়েছিল। পরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছিল, ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদির ওপর হামলাকারীদের ভারতে পালিয়ে যাওয়া প্রতিরোধে দেশটির সহযোগিতা কামনা করা হয়।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও কূটনৈতিক চাপ
ভারতে রাজনৈতিক মহলেও বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। পিডিপি সভাপতি মেহবুবা মুফতি বাংলাদেশে হিন্দু নারীদের হয়রানির অভিযোগকে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, সিঁদুর পরে বাইরে চলাচলে ভয় পাওয়ার মতো খবর গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। তবে তিনি এটাও বলেন, ভারতে মুসলিম নারীদের হিজাব জোর করে খুলে দেওয়ার ঘটনাগুলোর কারণে নৈতিকভাবে ভারতের নেতৃত্ব এক ধরনের দ্বন্দ্বে পড়েছে।
দক্ষিণ ভারতের হায়দরাবাদের
কোঠাপেট এলাকাতেও ভিএইচপির নেতৃত্বে একাধিক হিন্দু সংগঠন বিক্ষোভ করেছে। সেখানে সংগঠনটির
নেতারা বলেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা বন্ধ না হলে তারা আন্দোলন আরও জোরদার
করবেন। একই সঙ্গে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও রোহিঙ্গা ইস্যুও সামনে আনা হয়।
সব মিলিয়ে নয়াদিল্লি, কলকাতা, জম্মু থেকে হায়দরাবাদ- একাধিক
শহরে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ ও উত্তেজনা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে
নতুন চাপ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক আইনের আওতায়
নিশ্চিত করা ভারতের দায়িত্ব। এখন পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেয় ভারত সরকার, সেদিকেই তাকিয়ে
ঢাকা।