অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি দমনে ব্যর্থতার অভিযোগে টানা কয়েক সপ্তাহের বিক্ষোভের মুখে বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) পদত্যাগ করেছে বুলগেরিয়ার সরকার।
পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটের ঠিক আগমুহূর্তে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক টেলিভিশন ভাষণে পদত্যাগের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী রোজেন জেলিয়াজকভ।
ক্ষমতা গ্রহণের এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে পতন ঘটল দেশটির সরকারের। আগামী ১ জানুয়ারি ইউরোজোনে যোগ দেওয়ার মাত্র তিন সপ্তাহ আগে দেশটিতে এই রাজনৈতিক পালাবদল ঘটল।
জেলিয়াজকভ টেলিভিশনে দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত ভাষণে বলেন, ‘আমরা সমবেতভাবে বর্তমান পরিস্থিতি, আমাদের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জ এবং দায়িত্বশীলভাবে যে সিদ্ধান্তগুলো নিতে হবে—সেগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি। আমাদের লক্ষ্য হলো সমাজের প্রত্যাশা পূরণ করা। ক্ষমতা জনগণ থেকেই আসে।’
এর আগে, রাজধানী সোফিয়াসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেয়। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, সরকার পদ্ধতিগত দুর্নীতি নির্মূলে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
বিক্ষোভ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বুঝতে পারছি এই প্রতিবাদ সরকারের দাম্ভিকতার বিরুদ্ধে। এটি কেবল সামাজিক প্রতিবাদ নয়, এটি মূল্যবোধ ও মানসিকতার লড়াই; যা বুলগেরিয়ার সমাজের বিভিন্ন অংশকে একত্রিত করেছে।’
বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের বড় একটি অংশই তরুণ ও শহুরে পেশাজীবী। তারা বুলগেরিয়াকে মূলধারার ইউরোপীয় দেশ হিসেবে দেখতে চান এবং ইউরোজোনে যোগদানের পক্ষে। উল্লেখ্য, ২০০৭ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) যোগ দিলেও বুলগেরিয়া এখনো জোটের সবচেয়ে দরিদ্র ও দুর্নীতিগ্রস্ত সদস্য হিসেবে পরিচিত।
এর আগে গত সপ্তাহে জেলিয়াজকভ সরকার ২০২৬ সালের বাজেট পরিকল্পনা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ইউরো মুদ্রায় খসড়া করা ওই বাজেটে রাষ্ট্রীয় ব্যয় মেটাতে সামাজিক নিরাপত্তা ফি ও লভ্যাংশের ওপর কর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছিল, যা নিয়ে জনমনে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়।
দেশটিতে গভীর রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে গত চার বছরে সাতবার জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সর্বশেষ নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয় ২০২৪ সালের অক্টোবরে।
সরকারের পদত্যাগ বা অনাস্থা প্রস্তাবের মূল উদ্যোক্তা ছিলেন বিরোধী দল ‘কন্টিনিউ দ্য চেঞ্জ - ডেমোক্রেটিক বুলগেরিয়া’র (সিসি-ডিবি) নেতা আসেন ভাসিলেভ। তিনি বলেন, ‘এই পদত্যাগ বুলগেরিয়াকে একটি স্বাভাবিক ইউরোপীয় দেশে পরিণত করার প্রথম পদক্ষেপ। পরবর্তী পদক্ষেপ হলো একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন, যেখানে গতবারের মতো কোনো কারচুপি থাকবে না।’
প্রেসিডেন্ট রুমেন রাদেভ পার্লামেন্টের দলগুলোকে নতুন সরকার গঠনের আহ্বান জানাবেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তা সফল হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। সেক্ষেত্রে আগাম নির্বাচনের আগ পর্যন্ত দেশ পরিচালনার জন্য তিনি একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন নিয়োগ করা হবে।
এদিকে, বিদায়ী জোটের নেতৃত্বে থাকা মধ্যডানপন্থী জিইআরবি পার্টির নেতা বয়কো বরিসভ গত ১১ মাসে তাদের কাজের সাফাই গেয়েছেন। বিশেষ করে শেনগেন জোনে প্রবেশ এবং ইউরো মুদ্রা গ্রহণের প্রস্তুতির বিষয়গুলো তিনি তুলে ধরেন। বরিসভ বলেন, ‘গত ১১ মাসের কর্মকাণ্ড নিয়ে আমাদের লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই। আজ থেকে আমরা শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে কাজ করব এবং আগামী নির্বাচনে জয়ের প্রস্তুতি নেব।’
এর আগে, গত সপ্তাহে দেশটির সরকার প্রথমবারের মতো ইউরোতে প্রণীত ২০২৬ সালের বাজেট পরিকল্পনা প্রকাশ করে। বাজেট পরিকল্পনা প্রকাশের পর দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে শেষ পর্যন্ত তা প্রত্যাহার করে নেয় সরকার। দেশটির বিরোধী দল ও বিভিন্ন সংগঠন বলেছে, সামাজিক সুরক্ষা খাতের অবদান এবং লভ্যাংশের ওপর কর বাড়িয়ে ব্যয় মেটানোর পরিকল্পনার বিরোধিতা করতেই লোকজন রাস্তায় নেমেছে।
সরকার বাজেট পরিকল্পনা প্রত্যাহার করলেও বিক্ষোভকারীরা কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। দেশটিতে গত চার বছরে সাতটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা প্রকট আকার ধারণ করায় সর্বশেষ ২০২৪ সালের অক্টোবরে দেশটিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স